, , ।
স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীর পবা উপজেলার তোকিপুর গ্রামের খামারি আব্দুস সালাম (৪৫) তার একটি গাভী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। তিনি জরুরী চিকিৎসার জন্য প্রাণিসম্পদ দপ্তরে নিয়ে আসেন। এসে অফিসের পরিবর্তন দেখে অবাক হয়ে যান। একসময় এই গাভীকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসতে হলে তাকে রোদ–বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো প্রাণিসম্পদ দপ্তরের সামনে। চিকিৎসা নেওয়ার মতো কোনো সঠিক জায়গা ছিল না। তিনি গর্ব করে বলেন,“আগে আমাদের গবাদিপশু রোদে-বৃষ্টিতে কষ্ট পেতো। এখন এনিম্যাল সেডে নিয়ে আসলে ভালো পরিবেশে চিকিৎসা করানো যায়। আমাদের মতো খামারিদের জন্য এটা অনেক বড় উপকার।”
এ অভিজ্ঞতা শুধু আব্দুস সালামের নয়, উপজেলার অনেক খামারির। পবা উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর এখন খামারিদের কাছে এক আশ্রয়স্থল। অথচ কয়েক বছর আগেও এটি ছিল জরাজীর্ণ ও অবহেলিত একটি প্রতিষ্ঠান।
২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর দায়িত্ব নেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সুব্রত কুমার সরকার। যোগদানের সময় অফিসের চারপাশে ছিল আগাছায় ভরা, ডোবা আর প্রতিকূল খালাখন্দ। এই খালাখন্দের পঁচা আবর্জনার স্তূপের দুর্গন্ধে পার্শবর্তী এলাকার মানুষ ও সেবা নিতে আসা মানুষ বিরক্ত হতো। অফিস ভবনও ছিল জরাজীর্ণ পুরাতন ভগ্নদশায়। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে তার উদ্যোগে এ দপ্তর রূপ নিয়েছে রাজশাহীর মডেল প্রাণিসম্পদ দপ্তরে।
দপ্তরের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাফল্য হরিয়ান ইউনিয়নের একটি পরিত্যক্ত প্রাণিসম্পদ কল্যাণ কেন্দ্রকে উপজেলা পরিষদের এডিবি এর আর্থিক সহযোগীতায় নতুনভাবে সংস্কার ও চালু করা। প্রায় ৬.৬ শতাংশ জমিতে অবস্থিত কল্যান কেন্দ্রটি একেবারে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলো। দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশের মতো অবস্থা ছিল না। এটি ছিল মানুষের প্রাকৃতিক কাজ করার স্থান। তন্মধ্যে প্রায় ২.৬ শতাংশ জায়গা এলাকার প্রভাবশালীরা দখল করে রেখেছিল বহু বছর যাবৎ। সেটি দখল মুক্ত করে বাউন্ডারি ঘেরা হয়েছে এবং অফিসের নামে খারিজও করা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা, কৃত্রিম প্রজনন, টিকা প্রদানের মতো সেবা দেওয়া হচ্ছে। খামারিরা কোনো খরচ ছাড়াই এসব সেবা পাচ্ছেন। হরিয়ানের খামারী জোছনা বেগম (৪৭) বলেন এই কল্যান কেন্দ্র চালু হওয়ায় আমরা গাভীর কৃত্রিম প্রজনন সহ প্রাথমিক চিকিৎসা পাচ্ছি। পূর্বে এর জন্য প্রায় ১৫ কিলোমিটার দুরে পবাতে যেতে হতো। এজন্য আমরা ডা. সুব্রত স্যারের প্রতি কৃতজ্ঞ। এছাড়া জটিল সমস্যায় পবা হাসপাতালে গেলেও তিনি বিনামূল্যে অনেক ওষুধ দেন। উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর পবা অফিস ক্যাম্পাসে তিন বছর পূর্বেও যেখানে আবর্জনা, ডোবা, প্রতিকূল খালা-খন্দে জমা পানির দুর্গন্ধে টিকে থাকা দায় ছিল, উপজেলা পরিষদের আর্থিক সহযোগীতায় বালি ও মাটি ভরাটের মাধ্যমে সেখানে এখন চাষ হচ্ছে পাকচং সবুজ ও বেগুনি ঘাসের। খামারিরা এখান থেকে বিনা মূল্যে ঘাসের কাটিং পাচ্ছেন। এর পাশাপাশি নানা প্রজাতির গাছ লাগিয়ে সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়েছে।
খামারিদের বসার জায়গা এবং অসুস্থ প্রাণির চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত স্থান না থাকায় আগে সবাইকে দুর্ভোগ পোহাতে হতো। এখন উপজেলা পরিষদের জাইকা প্রকল্পের অর্থায়নে নির্মিত এনিম্যাল সেডে খামারিরা আরামে বসে থাকতে পারছেন। অসুস্থ গবাদিপশুরাও পাচ্ছে ছায়াযুক্ত নিরাপদ পরিবেশ।
রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়ক থেকে অফিসে প্রবেশের ভাঙা রাস্তা উপজেলা পরিষদের অর্থায়নে আর সিসি ঢালাই করে নতুনভাবে নির্মিত হয়েছে। নষ্ট হওয়া বাউন্ডারি মেরামত করা হয়েছে এবং স্থাপন করা হয়েছে আধুনিক গেট। রাতে অফিস চত্বর আলোকিত থাকে বিভিন্ন রঙিন লাইটে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে চিকিৎসা সেবায়। এলডিডিপি প্রকল্পের সহযোগীতায় উপজেলায় স্থাপিত হয়েছে রাজশাহীর একমাত্র আধুনিক ডায়াগনস্টিক ল্যাব। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে এখানে গবাদিপশুর রোগ দ্রুত শনাক্ত করা যাচ্ছে। এনিম্যাল সেড এবং ল্যাবে যাওয়ার জন্য সংযোগ সড়ক নির্মান করা হয়েছে।
স্থানীয় গরুর খামারি সাইফুল ইসলাম বলেন,“আগে এই হাসপাতালে গরু-ছাগলের চিকিৎসা নিতে অনেক কষ্ট হতো। একসময় হাসপাতালের পরিবেশ ছিল দুর্গন্ধময় ও অস্বাস্থ্যকর কিন্তু বর্তমানে অবকাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি চিকিৎসা সেবায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তন আমাদের মত খামাড়িদের জন্য আশীর্বাদ।”
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পাশেই বাড়ি বীর মুক্তিযোদ্ধা রকিবুল ইসলামের। তিনি দীর্ঘদিন ধরে অফিসটির উত্থান-পতনের স্বাক্ষী। তিনি বলেন,“আমি এই অফিসকে জরাজীর্ণ, দুর্গন্ধময় অবস্থায় দেখেছি। এখানে গবাদিপশুর চিকিৎসা নিতে এসে লোকজন বিরক্ত হয়ে ফিরত। কিন্তু এখনকার চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। আধুনিক অবকাঠামো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ আর মানসম্পন্ন চিকিৎসা সেবার জন্য এটি এখন সত্যিই একটি মডেল অফিসে পরিণত হয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এমন পরিবর্তন দেখে আমি গর্ব অনুভব করি।”
প্রাণিসম্পদ হাসপাতালের সামনেই দীর্ঘ ১০ বছর ধরে ভেটেরিনারি ওষুধের দোকান পরিচালনা করছেন ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন,“আগে মানুষ এখানে চিকিৎসা নিতে আসতে অনীহা প্রকাশ করত। এখন ভেটেরিনারি হাসপাতালে যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তাতে খামারিরা সহজে আসে, চিকিৎসা নেয় এবং আমরাও ব্যবসায়ীরা উপকৃত হচ্ছি। প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সুব্রত স্যার যোগদানের পর হতে অফিসের পরিবেশ উন্নয়ন এর পাশাপাশি চিকিৎসা সেবার মানোন্নয়ন করায় এলাকায় প্রাণিসম্পদ খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ও আগ্রহ বেড়েছে।”
দপ্তরের উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম (কৃত্রিম প্রজনন) বলেন যে,“আমি অনেক দিন যাবৎ এই দপ্তরে কর্মরত আছি। এছাড়া অফিসের পাশেই আমার বাড়ি হওয়ায় আমি দীর্ঘদিন যাবৎ এই অফিসটাকে জরাজীর্ন অবস্থাতেই দেখে আসছি। কিন্তু এই ইউএলও (ডা. সুব্রত) স্যার আসার পরে মাত্র দুই বছর আট মাসে অফিসের যে পরিবর্তন এবং চিকিৎসা সেবার মান উন্নয়ন করেছেন তা এক কথায় অবিশ্বাস্য। এর সুফল পবা উপজেলার খামারীগণ পাচ্ছেন।”
এবিষয়ে জানতে চাইলে পবার উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরাফাত আমান আজিজ বলেন,“উপজেলার প্রাণিসম্পদ দপ্তরের এ পরিবর্তন সত্যিই অনুকরণীয়। সদ্য বিদায়ী ডা. সুব্রত কুমার সরকার আন্তরিকতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে একটি দপ্তরকে আধুনিক রূপ দিয়েছেন। এতে খামারীরা যেমন উপকৃত হচ্ছেন, তেমনি সরকারের সেবার মানও বেড়েছে। আমরা চাই ভবিষ্যতেও এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকুক।”
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী মকবুল হোসেন বলেন,“সরকারি চাকরি অনেকেই করেন। কিন্তু তিনি সেটিকে ভিতরে ধারন করেন ও পালন করেন। তাই অনেক প্রতিকুলতার মধ্যেও তিনি নিজ দপ্তরে সেবা, সৌন্দর্য ও উৎকর্ষতার মান বাড়িয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।”
সদ্য বিদায়ী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সুব্রত কুমার সরকার বলেন “এই দপ্তরের সংস্কার, ও সেবার মান উন্নয়ন আমার একার পক্ষে সম্ভব ছিল না। উপজেলা পরিষদ যেভাবে আর্থিক বরাদ্ধ ও সহযোগীতা দিয়ে আমার পাশে দাড়িয়েছেন তা অতুলনীয়। আমি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই সন্মানিত উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা প্রকৌশলী সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে। পাশাপাশি সব সময় আমাকে অনুপ্রেরনা ও কাজের উৎসাহ প্রদানের জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আতোয়ার রহমান স্যার এবং বিভাগীয় পরিচালক ডা. আনন্দ কুমার অধিকারী স্যারকে।খামারীদের আস্থা অর্জন করা এবং তাদের সেবার মান উন্নয়নই আমার প্রাপ্তি।”
উল্লেখ্য যে বিদায়ী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সুব্রত কুমার সরকার পদোন্নতি পেয়ে তিনি বর্তমানে উপপরিচালক (ডিডি), দুগ্ধ উন্নয়ন খামার, বগুড়াতে কর্মরত আছেন।