সর্বশেষ সংবাদ :

দুর্গাপুর থানা পুলিশের কাণ্ড! সেই শিশু ধর্ষণের ঘটনা : মামলা নিলেও এজাহারে অসঙ্গতি আলামত নষ্ট করতে কালক্ষেপণ

স্টাফ রিপোর্টার, দুর্গাপুর: রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার দাওকান্দি গ্রামে সাড়ে চার বছরের সেই শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় অবশেষে মামলা নিয়েছে পুলিশ। ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও এক সপ্তাহ বাদে নানা নাটকীয়তার পর পুলিশ ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ এনে মামলা রজ্জু করেছে। প্রভাবশালী মহলের চাপে পুলিশ মামলা না নিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করলে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। বিষয়টি নজরে আসে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ইউনিট ও গোয়েন্দা সংস্থার।
এরপর বাদীকে ডেকে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। মামলার এজাহারও লিখে দিয়েছে পুলিশ। নামকাওয়াস্তে এজাহার লেখা শেষে স্বাক্ষর নিয়ে বাদীকে থানা থেকে বিদায় করা হয়। তবে মজার বিষয় হলো, বাদী নিজেই জানেন না তার দায়ের করা মামলায় সাক্ষী কারা!
শিশু ধর্ষণের মতো চাঞ্চল্যকর ও স্পর্শকাতর ঘটনা ধামাচাপা দিতে রাজশাহীর দুর্গাপুর থানা পুলিশের এমন কান্ডজ্ঞানহীন কর্মকান্ডে জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
দুর্গাপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, শনিবার সন্ধ্যায় ভিকটিম শিশুর পিতা বাদী হয়ে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ এনে একটি লিখিত এজাহার দিলে সেটি মামলা হিসেবে রজ্জু করা হয়েছে।
এর আগেও ৭ জুন বাদী থানায় গেলে মামলা না নিয়ে থানায় বসিয়ে রেখে বের করে দেয়ার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রসঙ্গটি কৌশলে এড়িয়ে গিয়ে ঘটনার সামগ্রিক বিষয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) পঞ্চনন্দ সরকারের সাথে কথা বলতে বলেন পরিদর্শক (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম।
এদিকে, থানায় রজ্জু করা মামলার এজহারে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত শনিবার (৬ জুন) বিকেলে পানবরজ ও পাটক্ষেতের মাঝে ভিকটিম শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। কিন্তু এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে ওইদিন সকালে বাড়ির পশ্চিম পাশে বাঁশঝাড়ে ভিকটিম শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়।
আসামির নামের জায়গায় অভিযুক্ত কিশোরের নাম দুই জায়গায় দুই রকম ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ নামের বানান ভুল করা হয়েছে অথবা ইচ্ছে করেই ভুল নাম উপস্থাপন করতে গিয়ে এমন করা হয়েছে।
অভিযুক্ত কিশোরের বয়স এক জায়গায় ৭ বছর, অন্য জায়গায় ১৪ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাস্থল ও সময় এজাহারে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রতিবেশীদের কাছে ভিকটিম শিশুর বড় বোন ও মায়ের পূর্বে বর্ণণা করা বক্তব্যের সাথে এজাহারে উল্লেখিত বর্ণণার বিস্তর ফারাক রয়েছে। ১৯ লাইনের এজাহারে এই ভুলগুলো কি নিছক ভুল নাকি প্রভাবশালীদের চাপে আসামীদের আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। আর কেনই বা ঘটনার পরদিন মামলা না নিয়ে এক সপ্তাহ পর মামলা নিলো পুলিশ। ঘটনার আলামত নষ্ট করতেই পুলিশ ইচ্ছে কালক্ষেপণ করেছেন! এমন প্রশ্ন দাওকান্দি গ্রামবাসী সহ সচেতন মহলের।
ঘটনার টুইস্ট এখানেই শেষ নয়, প্রভাবশালীদের চাপে পড়ে যেই ঘটনা ধামাচাপা দিতে চেয়েছিলো পুলিশ, সেই ঘটনার এক সপ্তাহ পর বাধ্য হয়ে পুলিশ মামলা নিয়েছে। এজাহারও লিখে দিয়েছে পুলিশ। সাক্ষীও জোগাড় করেছে পুলিশ। বাদী জানেন না মামলায় সাক্ষী কাদের করা হয়েছে। কিংবা এজাহারে কি লেখা রয়েছে। বাদীকে পড়ার সুযোগ দেয়া হয়নি, এমনকি বাদীকে এজাহারে কি লেখা আছে তা পড়ে শোনানোও হয়নি। থানার ওয়্যারলেস অপারেটরের কক্ষের ভেতরের আরেকটি কক্ষে থানার প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত কম্পিউটারে কম্পোজ করে ওই এজাহার প্রিন্ট করা হয়েছে।
মামলার বাদী ও ভিকটিম শিশুর পিতা মনজুর রহমানের সাথে কথা হলে তিনি জানান, আমি থানায় যেতে না চাইলেও বাধ্য হয়ে গেছি। তবে মামলা করিনি, ভবিষ্যতের জন্য জিডি (সাধারণ ডায়েরি) করেছি।
মনজুর রহমানকে ফের প্রশ্ন করা হয়, আপনি যে জিডি করেছেন সেটা কে লিখে দিয়েছে? আপনি লিখে থানায় নিয়ে গেছেন নাকি থানার পুলিশ লিখে দিয়েছে? জবাবে কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর না দিয়ে ব্যস্ততার অজুহাত দিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। তাকে ফের ফোন করা হলে মোবাইল নম্বরটি বন্ধ পাওয়া গেছে।
এর আগে মনজুর রহমানের ভাই হাফিজুর রহমানের (অভিযুক্ত কিশোরের পিতা) সাথে কথা বলা হলে তিনি প্রথমে পুরো ঘটনার কথা অস্বীকার করলেও পরে স্বীকার করে বলেন, ছোট বাচ্চাদের বিষয়। তাই এক দুইজন মাথা মুরুব্বি সাথে নিয়ে পারিবারিকভাবে বসে মিটমাট করে নিয়েছেন।
দুর্গাপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) পঞ্চনন্দ সরকার বলেন, যে সময় ঘটনা ঘটেছে ওই সময় তিনি ছুটিতে ছিলেন। বিধায় আগে কি ঘটেছে তা তিনি বলতে পারবেন না। থানায় যোগদান করার পর ঘটনা শুনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে বাদীকে ডেকে মামলা নিয়েছেন।
অসঙ্গতি ও ভুলে ভরা এজাহার সম্পর্কে জানতে চাইলে ওসি বলেন, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্তের সময় এজাহারে কোনো কিছু ভুল থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করে সংশোধন করবেন।
আসামীকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব কিনা জানতে চাইলে ওসি বলেন, অভিযান অব্যাহত আছে। বিভিন্ন জায়গায় সোর্স লাগানো আছে। আশাকরি দ্রুত গ্রেফতার করা সম্ভব হবে।
প্রসঙ্গত; গত ৬ জুন রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার দাওকান্দি গ্রামে সাড়ে চার বছরের শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। পরদিন ৭ জুন থানায় মামলা দায়ের করতে গেলেও মামলা না নিয়ে ভিকটিম শিশুর পিতাকে থানায় কিছু সময় বসিয়ে রেখে বের করে দেয় পুলিশ। এমনকি প্রভাবশালীদের যোগসাজশ করে ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার পাঁয়তারা করে পুলিশ। এই ঘটনায় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে টনক নড়ে পুলিশের।
শিশু ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ধামাচাপা দিতে পুলিশের এমন লুকোচুরির কারণে পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের মনে হীনমন্যতার সৃষ্টি হয়। অপরাধী যেই হোক না কেন, অপরাধ বিবেচনায় অপরাধীর বিরুদ্ধে সঠিক সময়ে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হলে পুলিশ বাহিনী ফিরে পাবে আত্মমর্যাদা। সমাজ থেকে কিছুটা হলেও লাঘব হবে আইন-শৃঙ্খলা পরিপন্থী অপরাধমূলক কর্মকান্ডের। এমনটিই প্রত্যাশা অভিভাবক ও সচেতন মহলের।


প্রকাশিত: জুন ১৭, ২০২৬ | সময়: ৩:৫৯ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ

আরও খবর