সর্বশেষ সংবাদ :

রাণীনগরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাড়ি বেঁচা-কেনার অভিযোগ

রাণীনগর প্রতিনিধি: নওগাঁর রাণীনগরে ভূমিহীন দরিদ্রদের দেওয়া হয়েছিল জমিসহ বাড়ি, আর সেই বাড়িগুলোই এখন হাতবদল হচ্ছে অর্থের বিনিময়ে। এমনকি একই বাড়ি একাধিকবার বিক্রি করা হচ্ছে। আবার কেউ কেউ সরকারি আশ্রয়ণের ঘরকে বানিয়ে তুলছেন বিলাসবহুল বাসস্থান।
উপজেলার মালিপুকুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, প্রবাসী সিদ্দিকের স্ত্রী মর্জিনা বিবির কেনা বাড়িতে মেঝেজুড়ে বিছানো আছে দামি কার্পেট, ফ্রিজ আর ঘরের দেয়ালে লাগানো ৪৩ ইঞ্চি স্মার্ট কালার টেলিভিশন। খাট থেকে শুরু করে নানান রকমারি আসবাবপত্রে ঘরটি সাজানো-গোছানো এক বৃত্তবান পরিবারের বাসস্থান। দেখলে কেউ বিশ্বাসই করবে না যে এটি একটি সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাড়ি।
আর তাদের মাধ্যমেই জানা গেল আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাড়ি বেঁচা-কেনার সার্বিক তথ্য, দলিল অনুযায়ী ‘সৌখিন’ মর্জিনার ৫নং বাড়িটির মালিক মল্লিকা নামের একজন। এই বাড়িটি দুইবার বিক্রি হয়েছে। প্রথমবার নিয়েছিলেন মকবুল নামের এক ব্যক্তি। তিনি আবার ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন মর্জিনা বিবির কাছে। ৬নং ঘরের মালিক রুবেল হলেও এই ঘরটিও মর্জিনা বিবির দখলে। তৃতীয় দফায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকায় কিনে নেন তিনি।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৭নং বাড়ির মালিক আরব। ৭০ হাজার টাকায় কিনে বসবাস করছেন আমিন নামের এক ব্যক্তি। ৯নং বাড়ি ১ লাখ ১০ হাজার টাকায় কিনে বসবাস করছেন আসাদুল নামের এক ব্যক্তি। ১০নং বাড়ি ৮০ হাজার টাকায় কিনে বসবাস করছেন সফেটা নামের এক নারী।
একইভাবে ১৪ নং বাড়ির মালিক সিরাজুল ইসলাম হলেও সেটি ৭০ হাজার টাকায় কিনে নিয়ে বসবাস করছেন শরিফ নামের একজন। আর পাশের ১৩নং বাড়িটি বিক্রির জন্য চলছে আলোচনা।
১৫নং বাড়ির মালিক জবুআরা। তবে বসবাস করছেন মিনা নামের এক নারী। এবং ১৬নং বাড়ির মালিক শরিফ। এই বাড়িটিও আছে মিনা নামের ওই নারীর দখলে। এই দুটি বাড়িই টাকার বিনিময়ে কিনে নিয়ে বসবাস করছেন তিনি।
১৮নং বাড়ির মালিক মজনু হলেও ৬০ হাজার টাকায় কিনে সেখানে বসবাস করছেন শাহীন নামের এক ব্যক্তি। এবং ১৯নং বাড়িটি ১ লাখ ১০ হাজার টাকায় কিনে নিয়ে বসবাস করছেন খাদিজা নামের এক নারী। প্রকল্পের ২২নং বাড়ির মালিক সাদ্দাম হোসেন। কিন্তু ৮০ হাজার টাকায় কিনে নিয়ে সেখানে বসবাস করছেন সাইদুর নামের এক ব্যক্তি।
এভাবেই গৃহহীনদের জন্য দেওয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাড়িগুলো বিক্রির মহোৎসব চলছে। আর এই বাড়িগুলো বেঁচা-কেনাতে সহযোগিতা করে থাকেন প্রকল্পের বাড়ি পাওয়া হাফিজুলের স্ত্রী নাজমা বেগম নামের এক নারী।
তিনি জানালেন, আমিই বাড়ি বেঁচা কেনায় সহযোগিতা করেছি। কারণ এখানে যাদেরকে বাড়ি দেওয়া হয়েছে, তারা অধিকাংশই অন্য এলাকার। তাদের থাকার জায়গাও আছে। তারা এখানে থাকতে চায় না। তাই স্থানীয় যারা কিনতে চায় একটু সহযোগিতা করি।
মকবুল জানালেন, আমার বাড়ি নওগাঁ জেলা সদরের সুলতানপুরে। এখানে ছেলে ও জামাই থাকে। আমি প্রতিবন্ধী হওয়ায় মল্লিকার বাড়ি নিয়েছিলাম। ছেলের বউয়ের অসুখের সময় সেই বাড়ি মর্জিনার কাছে ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়েছে।
বাড়ির ক্রেতা প্রবাসীর স্ত্রী মর্জিনা বলেন, গোনা এলাকার মল্লিকার নামে ছিল বাড়িটি। আমি মকবুলের কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকায় কিনে নিয়েছি। তবে সরকার আমাদের নামে এখনও কাগজ করে দেয়নি, কিন্তু দলিল রেখে দিয়েছি এবং মল্লিকা না দাবি করে স্ট্যাম্পে সই দিয়ে গেছে।
তিনি একসময় জোর দিয়ে জানালেন, শুধু আমি একাই কিনিনি। এখানে বেশিরভাগ বাড়ি বিক্রি হয়েছে। তার ভাষায় ৩০টির মধ্যে ২০ টা বিক্রি। এবং প্রকল্পের সেক্রেটারি মীমও তার বাড়ি ৩ লাখ টাকায় বিক্রি করতে চায়।
৯নং বাড়িটি ১ লাখ ১০ হাজার টাকায় কিনে নিয়েছে বলে জানালেন রেহেনা নামের এক নারী। তিনিও দলিল রেখে দিয়েছে এবং স্ট্যাম্পে সই নিয়েছে বলে জানালেন।
বাড়ির ক্রেতা মিনা বলেন, গোনার শরিফ নামের একজনের কাছ থেকে কেনা হয়েছে। আর আমার ছেলে একটা কিনেছে। আমার মা প্রতিবন্ধী, এক ঘরে হয়না, তাই এটাও নেওয়া হয়েছে।
তবে স্থানীয় জামাল খন্দকার, আব্দুল খালেক সহ একাধিক নারী-পুরুষ ক্ষোভ নিয়ে জানালেন, স্থানীয়দের বাড়ি না দিয়ে অন্য এলাকার লোকদের বাড়ি দেওয়ায় তারা বিক্রি করে চলে যাচ্ছেন। তাই ৩২টি ঘরের মধ্যে ইতোমধ্যে ১২টি ঘরই বিক্রয় করা হয়েছে। আর বর্তমানে যে বাড়ি বিক্রয় হচ্ছে সেগুলো সর্বনিম্ন ৭০ থেকে ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকায়।
এদিকে সাইদ নামের একজনকে বাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়। যার বাড়ি উপজেলার নারায়নপাড়ায় হলেও আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকার পাশে কয়াপাড়া গ্রামের জামাই হওয়ার সুবাদে তিনিও গৃহহীনদের জন্য প্রাপ্য একটা বাড়ি ভাগিয়ে নিয়েছে। অথচ এই সাইদ ও তার ছেলে বিদেশে থেকে লাখ লাখ টাকা ইনকাম করছে। এছাড়া তার গ্রামের বাড়ি নারায়নপাড়ায় আছে বাড়িভিটাসহ জমিজমা।
অপরদিকে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাড়ি পেয়েছে নারী গ্রাম পুলিশ ছাবিনা ইয়াসমিন মীম ও তার আরেক বোন বানিছা ওরফে পরী বানু। তবে বানিছা এখন ঢাকায় একটা গার্মেন্টসে চাকরি করে। তিনিও তার পাওয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাড়িটি বিক্রি করতে চান। আর ছাবিনা ইয়াসমিন মীম প্রাচীর দিয়ে তার বাড়িটি বানিয়েছে দেখার মতো। প্রকল্পের সাধারণ সম্পাদক এই মীমও তার বাড়িটি ৩লাখ টাকায় বিক্রি করতে চায়।
প্রকল্পের সাধারণ সম্পাদক ও নারী গ্রাম পুলিশ ছাবিনা ইয়াসমিন মীম ফোনে বলেন, আমি শুনতে পাই টাকার বিনিময়ে ঘর বিক্রি হচ্ছে। এরপর এই বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। ইউএনও স্যারসহ ঢাকা থেকেও স্যারেরা এসেছিল। আর চাকরির সুবাদে আমি ভাড়া বাসায় থাকার কারণে অনেকে ফোন করে বাড়ি বিক্রির কথা বলে, তাই আমি রাগ করে তিন লাখ টাকা দাম চেয়েছি। তবে আমি বাড়ি বিক্রি করতে চাই না। কারণ আমার কোনো বাড়ি নেই। বরং মর্জিনার বাড়ি কেনার খবরে আমি অনেক দৌড়াদৌড়ি করেছি, এমনকি সাংবাদিককেও বলেছি।
প্রকল্পের সভাপতি ফরিদ আলী ফোনে বলেন, এখানে ৩২টি ঘর আছে। প্রায় ১০-১২টা ঘর অর্থের বিনিময়ে বেঁচা-কেনা হয়েছে। এমনকি একই ঘর একাধিকবার বিক্রির ঘটনাও ঘটেছে। আমি সভাপতি হিসেবে শুধুমাত্র ইউএনও স্যারকে জানিয়েছি।
এ ব্যাপারে রাণীনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাকিবুল হাসান বলেন, বিষয়টি জানার পর ইতোমধ্যে খোঁজ খবর নেওয়া শুরু করেছি। বেঁচা-কেনার প্রমাণ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


প্রকাশিত: May 13, 2026 | সময়: 4:14 am | সুমন শেখ

আরও খবর