সর্বশেষ সংবাদ :

প্রাণিসম্পদ হাসপাতাল জরুরি সেবার আওতায় আনার দাবি খামারী ও কৃষকদের

স্টাফ রিপোর্টার: এবারে প্রাণিসম্পদ হাসপাতাল জরুরি সেবার আওতায় আনার দাবি খামারী ও কৃষকদের। খামারীরা বলেন, প্রাণি জগতের জীবগুলোর রোগ ও দুর্ঘটনায় পতিত হওয়ার কোন নির্দিষ্ট সময় নেই। আবার ছুটির দিনেও রোগ বা দুর্ঘটনা ঘটবে না এরকমও কোন বিষয় না। সে হিসেবে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির রোগ বা দুর্ঘটনা যেকোনো মুহূর্তে, যেকোনো দিনেই ঘটতে পারে। জীবগুলোকে সুস্থ ও নিরাপদ এবং টিকিয়ে রাখতে স্বাস্থ্য সচেতনতা, নিরাপত্তা এবং জরুরি চিকিৎসার প্রস্তুতি সবসময় থাকা জরুরি বলে তারা মনে করেন।
প্রান্তিক পর্যায়ে এইসব গবাদি পশু (গরু, ছাগল, ভেড়া) এবং হাঁস-মুরগির রোগ নির্ণয় ও আধুনিক চিকিৎসা সেবা, টিকাদান, উন্নত জাতের গবাদি পশু উৎপাদনে প্রজনন সেবা, স্থানীয় খামারিদের সঠিক পশুপালন ও খামার ব্যবস্থাপনায় পরামর্শ প্রদান ও পশু স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতসহ পশুর সার্জারি, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ও জরুরি চিকিৎসা প্রদান করে আসছে পবা উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতাল যা প্রসংসার দাবিদার।
তবে এই সেবাসমূহু প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এছাড়াও জনবল সংকটতো রয়েছে। যার কারণে পশুদের সময়মতো চিকিৎসা সেবাও ব্যাহত হয়। আবার শুক্রবার ও শনিবার বা সরকারি ছুটির দিনে জরুরি পশু চিকিৎসার জন্য হাসপাতালগুলো বন্ধ থাকে। জনবল সংকট কাটিয়ে সাধারণ কার্যদিবসের বাইরে ছুটির দিনেও প্রান্তিক কৃষক ও খামারিদের দোরগোড়ায় পশুর আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিধি বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। তাহলে গবাদিপশু সঠিক সময়ে চিকিৎসা সেবা পাবে, রোগবালাই কমবে ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি খামারিরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। সেইজন্য পবা উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতাল জরুরি চিকিৎসা সেবার আওতায় আনার দাবি স্থানীয় কৃষকসহ খামারিদের।
হরিপুর ইউনিয়নের কসবা এলাকার কৃষাণি সোনাভান বেগম বলেন, ‘সরকারী পশু হাসপাতালে পশুর উন্নত চিকিৎসা সেবা ও বিন্যমূল্যে ঔষধ পাওয়া যায়। কিন্তু ছুটির দিনে পশুর চিকিৎসার জন্য পল্লী পশু ডাক্তারের কাছে গেলে অনেক টাকা খরচ হয়। আবার সময়মতো ডাক্তার পাওয়া যায় না। ফলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়।’
হরিয়ান ইউনিয়নের কুখন্ডি এলাকার ‘সিফা পোল্টি ফার্ম’র মুরগী খামারি সেলিম হোসেন বলেন, ‘খামারে প্রায় দশ হাজার মুরগী আছে। এদের সার্বক্ষনিক দেখাশোনা করতে হয়। সঠিক সময়ে কাঙ্খিত চিকিৎসা সেবা না পেলে মুরগী ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। আবার শুক্রবার ও শনিবার সরকারি ছুটি থাকায় এইদিনগুলোতে গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগীর অসুখ হলে সমস্যায় পড়তে হয়। অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে বাইরের পল্লী চিকিৎসকের পরামর্শ ও সহযোগিতা নিতে হয়। প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক ও খামারীদের জন্য প্রাণিসম্পদ হাসপাতাল জরুরি চিকিৎসা সেবার আওতায় আনার দাবী করেন তিনি।’
হরিয়ান ইউনিয়নের হাজরাপুকুর (কালিয়াপাড়া) এলাকার ‘অফা এগ্রো ফার্ম’র ম্যানেজার সাজেদুল ইসলাম সজিব বলেন, ‘খামারে ‘ব্লাক বেঙ্গল’ জাতের ৪০০টি ছাগল আছে। প্রাথমিক চিকিৎসা নিজেরা দিয়ে থাকি। তবে জটিল সমস্যা হলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের পশু চিকিৎসকগন কখনও খামারে এসে আবার মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পরামর্শ ও সার্বিকভাবে সহযোগিতা করে থাকেন। এছাড়াও ছুটির দিনেও তাঁরা এই সেবা দিয়ে থাকেন।’
কাটাখালী পৌরসভার মাসকাটাদিঘী এলাকার ‘গ্রামীন বাড়ী ডেইরী ফার্ম’র গরু খামারি তারেক হোসেন বলেন, ‘খামারে ৩০টি ফ্রিজিয়ান জাতের গরু আছে। প্রতিদিন গড়ে ২০০ লিটার দুধ হয়। বাবা-মা, ভাই-বোন মিলে নিজেরাই গরুর দেখাশোনা করি। সমস্যা হলে উপজেলা ও জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন। তবে সরকারি পশু হাসপাতাল সার্বক্ষনিক খোলা থাকলে সাধারণ কৃষক ও খামারি সকলের উপকার হবে।’
‘পাওয়ারফুল এগ্রোভেট’ এর পরিচালক, নারী উদ্যোক্তা ও পল্লী পশু চিকিৎসক মোসা. সেলিনা বেগম বলেন, ‘যার প্রাণ আছে তার যেকোন সময় অসুখ বা দূর্ঘটনা হতে পারে। এটার কোন নির্ধারিত সময় নাই। সচেতনতার অভাবে ছোট ছোট স্বপ্নগুলো ভেঙ্গে যায়। তাই প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজে সচেতন হই। তরুনরা বেকার না থেকে উদ্যোগ নিয়ে উন্নত প্রশিক্ষণ গ্রহন করে পশু খামারি হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাতে যেমন নিজের কর্মসংস্থান হবে তেমনি সামাজিক উন্নয়নেও ভুমিকা রাখবে, দেশ এগিয়ে যাবে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় হবে উন্নত বাংলাদেশ।’
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. আ. লতিফ বলেন, ‘সীমিত জনবল দিয়ে পবা উপজেলার খামারিদের উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতাল সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। মানুষের সুস্বাস্থ্য এখন অনেকাংশে প্রাণিস্বাস্থ্যের উপর নির্ভরশীল। এছাড়া নিরাপদ দুধ, ডিম, মাংস উৎপাদনের জন্য আরোও ভেটেরিনারি ডাক্তারের প্রয়োজন। দুই বা তিন ইউনিয়নের জন্য মিনিমাম একজন ভেটেরিনারি সার্জন নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। যেখানে এখন বর্তমান আছে প্রতি উপজেলায় একজন করে ভেটেরিনারি সার্জন। একজন ডাক্তার দিয়ে পুরো উপজেলার চিকিৎসা বা পরামর্শ দেওয়া প্রায় অসম্ভব। এছাড়া সেবাটি জরুরী না হওয়ায় ছুটির দিনগুলোতে বন্ধ থাকে এতে খামারিরা বিপাকে পড়েন। তাই অধিক ডাক্তার নিয়োগ এবং সেবাটি-কে জরুরি সেবার আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করি।’
উল্লেখ্য পবা উপজেলায় বৃহৎ ও ক্ষুদ্র পরিসরে পশু লালন-পালনের জন্য গরুর (গাভী ও গরু মোটাতাজাকরণ) খামার ৩৯৪টি, ছাগলের খামার ৩০৮টি, ভেড়ার খামার ১১টি, হাঁসের (ডিম ও মাংস) খামার ১৮টি, মুরগীর (ডিম ও মাংস) খামার ৪৭৩টি, কোয়েল পাখির খামার ০৬টি, হরিণের খামার ২টি, কবুতর খামার ৮টি রয়েছে। স্থানীয় কৃষকরা পারিবারিকভাবে সমন্বিত খামার বা বাড়ীতে হাঁস, দেশি ও ব্রয়লার মুরগি, গরু, ছাগল, ভেড়া, গাড়ল একসাথে পালন করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। এছাড়াও চরাঞ্চলের কৃষকরাও পশু-পাখি লালন-পালন করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। এই প্রাণিসম্পদ খাতে সরাসরি জড়িত থেকে ৬২ হাজার ৮’শ জন কৃষক ও খামারির কর্মসংস্থান হয়েছে। এটি একটি সম্ভাবনাময় খাত যেখানে হাজারো স্বপ্ন লুকিয়ে আছে। এর প্রসার ঘটালে হাজার হাজার প্রান্তিক পর্যায়ে তরুণ-তরুণিদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। দেশকে এগিয়ে নিতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় হবে উন্নত বাংলাদেশ এই প্রত্যাশা।


প্রকাশিত: March 11, 2026 | সময়: 4:04 am | সুমন শেখ