, , ।
স্টাফ রিপোর্টার: দেশে গুজব ও সিন্ডিকেটের দখলে এমনিতেই অতিষ্ঠ সাধারণ ভোক্তরা। এবার রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে পেট্রল ও অকটনসহ বিভিন্ন জ্বালানি তেল কিনতে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে ক্রেতাদের। তেল নিতে আসা বাইকারদের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। চাহিদামতো তেল না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন চালকেরা। কোথাও কোথাও তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় কয়েকটি ফিলিং স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধও হয়ে গেছে। যেসব স্টেশনে তেল রয়েছে, সেগুলোতে সীমিত পরিমাণে তেল বিক্রি করা হচ্ছে।
সারা দেশেই এমন পরিস্থিতিতে ফিলিং স্টেশনগুলো কোন পরিবহণের জন্য কতটুকু জ্বালানি সরবরাহ করতে পারবে, সেটি নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। এছাড়া ফিলিং স্টেশনগুলো ডিপো থেকে কী পরিমাণ জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবে সেটিও নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে।
শুক্রবার নওহাটায় রুচিতা ফিলিং স্টেশনে সীমিত আকারে তেল সরবরাহ করা হয়। সেখানে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে প্রতি মোটরসাইকেলে দুইশত টাকার করে তেল দেওয়া হচ্ছিল। পাম্পটিতে প্রায় ৭০০ লিটার তেল মজুত ছিল যা দ্রুত শেষ হয়ে যায়। ফলে অনেক চালক তেল না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
আবার রাজশাহীর সবচেয়ে নির্ভেজাল ও মাপে সঠিক-এমন সুনাম অর্জনকারি পেট্রোল পাম্প শাহ মখদুম এয়াপোর্টের প্রধান গেটের সামনে হাবিব ফিলিং স্টেশন। সেখানে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই তেল নাই বলে মোটরসাইকেল ফিরিয়ে দেয়া হয়। তবে অনেকেই অভিযোগ করেন পাম্পে তেল থাকতেও দেয়া হয়নি।
অন্যদিকে শহরের কয়েকটি ফিলিং স্টেশন থেকে প্রতি মোটরসাইকেলে ২০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছিল। আবার আফরিন নামের এক পেট্রোল পাম্প চাহিদা মোতাবেক তেল দেন। এতে অপ্রয়োজনেও অনেকে তেল কিনেছেন। শহরের আরও কয়েকটি পাম্পে তেল মজুত থাকলেও সেগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন চালকরা।
আবার নগরীর আফরিন পাম্পে তেল নিতে আসা মোটরসাইকেল চালক শরিফুল ইসলাম বলেন, “ইরানের যুদ্ধের কারণে তেলের জাহাজ আটকে গেছে। ফলে হুট করে সংকট শুরু হতে পারে। এ সময় দামও বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা আছে। এসব ভেবেই একটু বেশি করে তেল কিনতে এসেছি।”
রাজশাহী ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মামুন বলেন, কিছু উৎসুক ক্রেতা গুজব ছড়ায়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে। আবার কিছু পেট্রোল পাম্প মালিক এর সাথে জড়িত কিনা-তা খতিয়ে দেখা হবে। তবে বাংলাদেশে কোন ধরণের জ¦ালানী তেলের সংকট নাই।
রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাসুদুর রহমান রিংকু বলেন, ‘আমরা সবসময়ই গুজবে বিশ্বাস করি। আরো একমাসের বিভিন্ন ধরণের জ্বালানী তেল মজুত আছে। সরকার নতুন করে আবারো এলসির (বরাদ্দ) আদেশ দিয়েছেন। এতে করে তেলের ঘাটতি হবে না। তাই চালকদের অনুরোধ করবো, গুজব ছড়াবেন না এবং প্রযোজনের বেশী তেল নিবেন না।
বাড়তি তেল কিনে নেওয়ার ফলে অনেক পাম্পে তেল সংকট দেখা দিয়েছে। এই বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা আব্দুল আওয়াল খান চৌধুরী জ্যোতি বলেন, “ অযথা মানুষ উত্তেজনা দেখিয়ে বাড়তি তেল কিনে সংকট তৈরি করছে। এইভাবে তেল কিনে নিয়ে গেলে যার জন্য তেল কেনা জরুরি ছিল- সে তেল পাবে না। প্রত্যেকটা পাম্পে কর্তমানে পরিস্থিতি বিবেচনা করে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হয়। এখন হুট করে যদি সবাই বাড়তি তেল কিনতে থাকে তাহলে তেল সংকট হওয়া স্বাভাবিক।”
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, এভাবে হঠাৎ করে কোনো পাম্প বন্ধ রাখা যায় না। ভোক্তাদের সুবিধার্থে যতক্ষণ পর্যন্ত তেল মজুত থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তা সরবরাহ করতে হবে। পাশাপাশি সরকার নির্ধারিত দামেই তেল বিক্রি করতে হবে। বিষয়টি জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর্স, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় মোট ২৭৯টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। গত তিন দিন ধরে এসব স্টেশনে পেট্রল ও অকটেন সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
উত্তরের জেলা রাজশাহীতে তেল সংকটের বিষয়টি সামনে আসে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই। ওই দিন নগরীর বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশন বাইকারদের চাহিদামতো তেল দেওয়া বন্ধ করে দেয়। কোনো কোনো স্টেশনে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা এবং কোথাও ৫০০ টাকার তেল দেয়া শুরু হয়। শুক্রবারও একই চিত্র দেখা গেছে। সকাল থেকেই রাজশাহী নগরের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে বাইকারদের দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করা যায়।
রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা এলাকার হুমায়ন কবির জানান, শুক্রবার তিনটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে তিনি মাত্র ৩০০ পেট্রল নিতে পেরেছেন। একটি স্টেশন থেকে ১০০ টাকার বেশি তেল মিলছে না। কোথাও চাহিদামতো তেল পাননি বলেও জানান তিনি।
শুক্রবার সকালে রাজশাহী মহানগরীর নওদাপাড়া নতুন বাস টার্মিনালে লতা ফিলিং স্টেশনে কথা হয় বাইকার সোহেল রানার সাথে তিনি জানান, প্রতিদিনই তার বাইক ব্যবহার করতে হয়। তাই বিভিন্ন পাম্পে ঘুরে তিনি বাইকের ট্যাংকিতে তেল ভরার চেষ্টা করছেন।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর্স, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের রাজশাহী বিভাগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল বলেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাবের কারণে সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে। গত তিন দিন ধরে ফিলিং স্টেশনগুলো চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছে না। ফলে পাম্পগুলো চাহিদামতো তেল বিক্রি করতে পারছে না। ইতোমধ্যে কয়েকটি ফিলিং স্টেশন তেল না থাকায় বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলোতে তেল রয়েছে, সেগুলোতে অল্প অল্প করে দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হওয়ায় তেল কেনার হিড়িক পড়ে গেছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, কেউ বাইক খুব একটা ব্যবহার না করলেও এসে এক হাজার টাকার তেল চাইছে। আবার যারা বেশি বাইক চালায় তারা একাধিক পাম্পে ঘুরে ট্যাংকি পূর্ণ করে বাড়িতে সংরক্ষণ করছে। এতে সংকটের বিষয়টি আরও তীব্রভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে ফিলিং স্টেশনগুলো কোন পরিবহণের জন্য কতটুকু জ্বালানি সরবরাহ করতে পারবে, সেটি নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। এছাড়া ফিলিং স্টেশনগুলো ডিপো থেকে কী পরিমাণ জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবে সেটিও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার (৬ মার্চ) জ্বালানি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
নির্দেশনায় জ্বালানি তেল সরবরাহ গ্রহণ/প্রদানের ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে, ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি তেল গ্রহণের সময় ভোক্তাকে আবশ্যিকভাবে তেলের ধরন, পরিমাণ ও মূল্য উল্লেখ করে ক্রয় রশিদ প্রদান করতে হবে। ফিলিং স্টেশন থেকে প্রতিবার জ্বালানি তেল গ্রহণের সময় পূর্ববর্তী ক্রয় রশিদ/বিল প্রদর্শন করতে হবে। ডিলাররা বরাদ্দ ও নির্দেশনা অনুযায়ী ক্রয় রশিদ গ্রহণ করে ভোক্তা প্রান্তে জ্বালানি তেল সরবরাহ করবে। ফিলিং স্টেশনগুলো জ্বালানি তেলের মজুত ও বিক্রয় সংক্রান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ডিপোতে প্রদান করে জ্বালানি তেল উত্তোলন করবে। তেল বিপণন কোম্পানিগুলো ডিলারদের জ্বালানি তেল সরবরাহ দেওয়ার পূর্বে বর্তমান বরাদ্দের আলোকে মজুত ও বিক্রয় সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করবে, কোনোভাবেই বরাদ্দের বেশি দেওয়া যাবে না।