, , ।
আল্লাহর অপার রহমতে এখন আমরা মাহে রমজানের মাঝামাঝি অবস্থায়। নিখিল মাখলুকাত আল্লাহর পরিবার। আর মানব জাতি এর কল্যাণকামী ও পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত প্রতিনিধি। মহান স্রষ্টা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দাসত্ব ও প্রতিনিধিত্ব করাই মানব জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। এ লক্ষ্যে পথ চলার জন্য সে নিঃসঙ্গ ও সহায় সম্বলহীন নয়।
এ জীবন পদ্ধতির মৌলিক ও নৈতিক ভিত্তি আর বুনিয়াদি আকিদা বিশ্বাস হচ্ছে কালিমায়ে তাইয়্যেবা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।’ কালিমায়ে তাইয়্যেবা নির্ভেজাল তাওহীদ ও আল্লাহর একত্ববাদের সবক দান করে। কালিমায়ে তাইয়্যেবার শাব্দিক অর্থ হলো ‘পবিত্র বাক্য’। এ বাক্যের মর্মার্থ, গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। প্রাক ইসলামি যুগে বিশ্বের সর্বত্র শিরক ও অংশীবাদিতার সয়লাবে একত্ববাদের শিক্ষা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে তৎকালীন আরব জাতির অবস্থা ছিল এদিক দিয়ে সবচেয়ে শোচনীয়। ধর্মীয় আকিদা-বিশ্বাসে তারা চরম মুশরিকিপনায় ছিল আকণ্ঠ নিমজ্জিত।
এমনি এক যুগ সন্ধিক্ষণে বিশ্বনবী কালিমায়ে তাইয়্যেবার বারতা নিয়ে হাজির হলেন। একদিন মক্কাবাসীদের একটি পাহাড়ের পাদদেশে সমাবেশ ঘটিয়ে তিনি জানালেন : ‘আইয়্যুহান্্নাস! কুলু লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু তুফলিহু-ন।’-হে সমাবেশ! আপনারা স্বীকার করুন এক আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ বা উপাস্য নেই (তাহলে) আপনারা কল্যাণপ্রাপ্ত হবেন।’ আল্লাহর পবিত্র বাক্য কালিমার বরকত দুনিয়া ও আখিরাতে পরিব্যাপ্ত।
বুখারী-মুসলিমে সাহাবা আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাদি.) বরাতে উদ্ধৃত হয়েছে : ‘আ-হযরত (স.) বলেছেন, আমি মানুষের সাথে যুদ্ধে আদিষ্ট হয়েছি যে পর্যন্ত তারা ঘোষণা করে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ (স.) আল্লাহর রাসুল আর নামাজ কায়েম করে ও জাকাত দেয়। যখন তারা এরূপ করবে আমার পক্ষ থেকে তাদের জানমাল নিরাপদ থাকবে-।’
সাহাবী উবাদাতা ইবনে ছামিত (রাদি.) বলেন : ‘আমি হযরতকে (স.) বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি এ সাক্ষ্য দেবে যে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ তার জন্য আল্লাহ দোযখের আগুন হারাম করে দিয়েছেন।-(মুসলিম)। মা’আজ (রাদি.) তথ্য প্রকাশ করেন যে, হুজুর (স.) আমাকে জানিয়েছেন : বেহেস্তের কুঞ্জি হলো এ সত্য সাক্ষ্য-‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ’।-(আহমদ)। ইসলাম ধর্মের গোটা সুরম্য সৌধই কালিমায়ে তাইয়্যেবার মর্মবাণীর ওপর দাঁড়িয়ে। ‘এ’লায়ে কালিমাতুল্লাহ’ বা আল্লাহতায়ালার কালিমার আওয়াজ বুলুন্দ করাই ছিল দ্বীন ও নবীর আসল মিশন। তিনি তো সে মহান সত্তা, যিনি তার নবীকে হিদায়াত এবং সত্য দ্বীনসহকারে পাঠিয়েছেন, যাতে তাকে সমস্ত ধর্মের ওপর বিজয়ী করতে পারে। যদিও মুশরিকরা অপছন্দ করে।-(সুরা সফ)।
মাত্র ২৪টি অক্ষরের তৈরি ও ৭টি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত এ পূত বাক্যটি এমনি এক ব্যাপক তাৎপর্যবহ যে, বহু ৭ এর জবাব বহু ৭ এর সমান এবং বহু ৭ এর আনাগোনা রয়েছে এ ৭ শব্দের কালিমার ব্যাখ্যার মধ্যে। মানুষের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অর্জনের পয়গাম নিহিত এতে। এ কালিমার শুরু হয় এক বিশাল প্রশ্ন নিয়ে। কে তার স্রষ্টা ও অভিভাবক এবং মানুষের কি-বা দায়িত্ব। এতে বলা হয়েছে- উপাস্য, পালনকর্তা এবং বিধানদাতা আর কেউ নন, একমাত্র আল্লাহই। আর সার্বক্ষণিক আনুগত্য প্রদর্শন করাই একজন বান্দার কাজ। ‘ওয়ামা খালাকতুল জিন্না ওয়াল ইনসা ইল্লা লিয়া-বুদুন- আমি জিন ও মানব জাতিকে একমাত্র আমার ইবাদত করা বৈ অন্য কোনো কারণে সৃষ্টি করিনি।’ এ হিসেবে মানুষ খোদার বান্দা এবং প্রতিনিধি দুটোই।
অনুরূপভাবে এ কালিমা তাইয়্যেবার শপথ বাণীতে রয়েছে বিশ্বভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও অর্থনৈতিক সাম্যের আহ্বান এবং মানুষে মানুষে প্রভুত্ব খতম করে আল্লাহ তায়ালার শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করার প্রতিজ্ঞা। এ কালিমার দুটো অংশ। প্রথমে বলা হয়েছে ‘লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ (অর্থ) আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। অর্থাৎ শুধু আল্লাহরই সার্বভৌমত্ব স্বীকার করা, অন্য কারও নয়। হুকুমকর্তা, মালিক এবং বিধানদাতা হিসেবে একমাত্র তাকেই স্বীকার করা।