বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
মেহেদী হাসান, পুঠিয়া: রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়ক সহ পুঠিয়া উপজেলার বিভিন্ন সড়কে দিন দিন বেড়েই চলেছে অবৈধ যানবাহনের দৌরাত্ম্য। নছিমন, করিমন, অবৈধ সিএনজি, তিন চাকার অটোরিকশা ও দশ চাকার বালুবাহী ড্রাম ট্রাক নিয়মিত চলাচল করছে মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে। এসব যানবাহনের অধিকাংশই অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালকদের দ্বারা চালিত হচ্ছে। অনেক যানবাহনে নেই কার্যকর ব্রেক, হর্ন কিংবা সিগন্যাল বাতি। ফলে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, ঘটছে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা।
এরই ধারাবাহিকতায় গত রোববার ২৫ জানুয়ারি বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কের পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর এলাকার পোল্লাপুকুরে বাস ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে একজন রাজশাহীর বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শান্ত ইসলাম (২২)। তিনি বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিপল ইইই (ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং) বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার বাড়ি পুঠিয়া উপজেলার বালাদিয়ার গ্রামে।
অপর দুই নিহত একজন পুরুষ ও একজন নারী হলেও তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। দুর্ঘটনার পর সীমানা জটিলতা ও পুলিশের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তুলে বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা রাজশাহী-নাটোর মহাসড়ক অবরোধ করেন। এ সময় বেলপুকুর থানার ওসি সহ পুলিশ সদস্যদের অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগও ওঠে। ফলে মহাসড়কের দুই পাশে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা।
এর আগে গত ১ জানুয়ারি ২০২৬ সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে পুঠিয়া উপজেলার ঝলমলিয়া বাজারে ঘটে আরেকটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা। একটি অতিরিক্ত মালবোঝাই বালুবাহী ড্রাম ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাজারের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই পাঁচজন নিহত হন। গুরুতর আহত হন আরও কয়েকজন, যাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছিল চিকিৎসা সূত্র।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ট্রাকটি দ্রুতগতিতে চলছিল। চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে মুহূর্তের মধ্যেই ট্রাকটি বাজারে থাকা মানুষ ও দোকানপাটের ওপর উঠে পড়ে, ফলে ঘটে মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনা।
নিহতদের পরিবার ও স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। দুর্ঘটনার পর এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এলেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে প্রশাসনের তৎপরতা দেখা যায়নি।
বর্তমানে পুঠিয়া, বানেশ্বর সহ আশপাশের উপজেলায় তিন চাকার যান, হিউম্যান হলার, মাটি ও বালুবাহী দশ চাকার ড্রাম ট্রাক, মাছবাহী পানিবহন ট্রাক ও অবৈধ অটোরিকশার চলাচল আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এসব যানবাহনের বেশিরভাগই মূলত মাল পরিবহনের জন্য তৈরি হলেও এখন যাত্রী পরিবহনেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কম ভাড়া ও সহজ যাতায়াতের কারণে সাধারণ মানুষ ঝুঁকি নিয়েই এসব বাহনে চলাচল করছে। ফলে যাত্রী সংকটে পড়ছে বৈধ বাস ও মিনিবাস সার্ভিস।
পাশাপাশি কম খরচে মাল পরিবহনের জন্য ট্রাকের পরিবর্তে অবৈধ তিন চাকার যান ব্যবহৃত হওয়ায় বৈধ পরিবহন খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব যানবাহনের চালকদের বেশিরভাগই অদক্ষ, লাইসেন্সবিহীন এবং যানবাহনে নেই কোনো ফিটনেস সনদ বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল বহনের ফলে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। এতে প্রাণ হারাচ্ছে নিরীহ পথচারী ও যাত্রী।
এ বিষয়ে পবা হাইওয়ে থানার ওসি মোজাম্মেল কাজী জানান, ‘দুর্ঘটনাগুলোর পর থেকে সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে নিয়মিত চেকপোস্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রতিদিন ৮ থেকে ১০টি করে মামলা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে থানায় অনেক অবৈধ যানবাহন আটক রয়েছে। আমাদের অভিযান জোরালোভাবে চলছে এবং চলবে।’
বিশেষজ্ঞ ও সচেতন নাগরিকরা বলছেন, প্রশাসনের নিষ্ক্রিক্রয়তা, নিয়মিত অভিযান না থাকা এবং কিছু অসাধু ব্যক্তির চাঁদাবাজির কারণে অবৈধ যানবাহন দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। সময়মতো কঠোর ব্যবস্থা না নিলে দুর্ঘটনার হার আরও বাড়বে এবং বৈধ পরিবহন খাত চরম সংকটে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে অবৈধ যান চলাচল বন্ধে জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। না হলে রাজপথে নৈরাজ্য আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, এমন আশঙ্কাই এখন সবার।
পুঠিয়ায় অবৈধ যানবাহনের