বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
সবুজ ইসলাম: রাজশাহীতে ২ হাজার ৪ শো বর্গকিলোমিটার এলাকায় বসবাস করে ২৯ লাখ মানুষ। বিশাল এই জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা যোগান দিয়ে এই অঞ্চলের কৃষি পণ্য যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে। কৃষি খাতে তাই রাজশাহীর সুখ্যাতি রয়েছে পূর্ব থেকেই।
কিন্তু দিন দিন এই অঞ্চলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং বসতবাড়ি নির্মাণ ও ফসলি জমিতে অপরিকল্পিত পুকুর খননের কারণে চাষযোগ্য জমির ওপর চাপ বাড়ছে। ফলে প্রতিবছরই কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জেলা পরিসংখ্যান অফিসের তথ্যমতে, রাজশাহীতে গত ছয় বছরে কৃষিজমির পরিমাণ ক্রমশই কমছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে রাজশাহীতে কৃষিজমি কমেছে প্রায় ৫ হাজার ২ শো ৮৯ একরের মতো। কৃষি উৎপাদন নির্ভর এই অঞ্চলে জমি কমে যাওয়াকে কৃষিবিদরা ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে রাজশাহীতে মোট কৃষিজমির পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৭০৫ একর। পরের বছর ২০২১-এ তা কমে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৯১০ একর। ২০২২ সালে এই পরিমাণ আরও কমে হয় ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৭৬১ একর। ২০২৩ সালে নেমে আসে ৪ লাখ ৩৫ হাজার ২৯৮ একরে এবং ২০২৪ সালে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৩৫ হাজার ১৯১ একর। চলতি বছর ২০২৫ সালে কৃষিজমির পরিমাণ আরও কমে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪১৬ একরে।
পাওয়া তথ্যনুযায়ী প্রতিবছরই কমেছে কৃষি জমি। আর বিশেষজ্ঞরা মনে করছে এভাবে কৃষি জমি কমতে থাকলে হুমকির মুখে পড়তে পারে রাজশাহীর কৃষি ও অর্থনীতি। বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন,“গত কয়েক বছরে রাজশাহীর বিলগুলোতে যে পরিমাণ পুকুর হয়েছে তা সবগুলোই তিন ফসলি জমিতে। কৃষি জমি রক্ষায় ধৈতব্য আইন বলে একটি আইন আছে, যেটিতে পুলিশ কোন ওয়ারেন্ট ছাড়াই খননকারীদের গ্রেফতার করতে পারে। কিন্তু পুলিশ সেটি করে না,তারা ইউএনওদের অপেক্ষায় থাকে। বর্তমানে আমাদের জনসংখ্যা বাড়ছে তাই মানুষ শহর থেকে গিয়ে গ্রামে ফসলি জমি নষ্ট করে বসতবাড়ি নির্মাণ করছে। আমাদের সকলকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে একটি বাড়িতেই বহুতল ভবন নিমার্ণ করার। এছাড়াও ইট ভাটায় বিলের জমি (টপ সয়েল) নষ্ট না করে আমাদের পাশ্ববর্তী নদী থেকে বালু উত্তোলন করে তা দিয়ে ইট বানানো যেতে পারে। এভাবে সমুন্নত উদ্যোগ গ্রহণেই কৃষি জমি রক্ষা পাবে বলে মনে করি।”
এ বিষয়ে স্থানীয় কৃষকরা জানান, আবাসিক প্রকল্প, রাস্তা নির্মাণ এবং কাঠামোগত উন্নয়নের কারণে ফসলি জমি ধীরে ধীরে কমছে। কৃষকদের আক্ষেপ জমি কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, পাশাপাশি ফসল ফলানোর উপযোগী জমিও সংকুচিত হচ্ছে। রাজশাহীর কয়েকটি উপজেলার প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকের সাথে কথা বললে তারা কৃষি জমি কমে আসায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার কৃষক মমিনুল ইসলাম বলেন, “১৫-২০ বছর আগেও এ এলাকায় কৃষিজমির পরিমাণ ছিল চোখে পড়ার মতো। সেই সময় দিগন্তজোড়া কৃষিজমি চোখে পড়ত। এখন সে অবস্থা নেই। রাস্তাঘাট, আবাসন, বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে প্রতিনিয়ত। এছাড়াও পবাতে কৃষি জমি নষ্ট করে যে পরিমাণ পুকুর খনন করা হয়েছে তাতেও প্রচুর পরিমাণ আবাদি জমি নষ্ট হয়েছে।”
দূর্গাপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের বাসিন্দা বাবলুর রহমান বলেন,“আগে সড়কের দুদিকে শুধু কৃষিজমি দেখা যেত। জমি অধিগ্রহণ করে রাস্তা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এছাড়া সড়কের পাশে গড়ে উঠেছে সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ছোট ছোট শিল্প প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি। এরমধ্যে তিন-চার ফসলি জমিও রয়েছে।”
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহমুদুর রহমান বলেন,“কৃষি জমি কমে যাওয়া এটি আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি। কৃষি জমি রক্ষায় সারাদেশে জোন করে দিতে হবে। যেমন অর্থনৈতিক জোনের ভিতরে কোন কৃষি কাজ হবে না, আবার একইভাবে কৃষি জোনের ভিতরে কোন অর্থনৈতিক জোন বা আবাসিক ভবন হবে না। এইরকম ভাবে জোন ভিত্তিক স্থাপনা রয়েছে ইংল্যান্ডে, বাংলাদেশেও আছে কিন্তু কেউ মানে না। কৃষি জমি রক্ষায় বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। গ্রামঞ্চলে সাধারণত আমরা দেখি পাঁচ ভাইয়ের জন্য পাঁচটি বাড়ি নির্মাণ করা হয়। কিন্তু সেখানেই যদি একটিমাত্র বহুতল ভবন নিমার্ণ করা হয় তাহলে কিন্তু জমি গুলো রক্ষা পায়। সরকারি যেসকল সংস্থা রয়েছে তারা যদি ঠিকমত কাজ করে তাহলে এগুলো অব্যবস্থাপনা হয় না। ঠিক একইভাবে কৃষি জমি রক্ষায় আমাদের দেশে যে আইন আছে সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ করতে হবে। শুধু জরিমানার উপরে নির্ভরশীল হলে হবে না, পাশাপাশি সর্বস্তরে সচেতনতা বাড়াতে হবে। কৃষি জমি রক্ষায় এখনই আমাদের আরো সর্তক হতে হবে।”
কৃষি জমি রক্ষায় আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই জানিয়ে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, “আবাসন-নির্মাণ, পুকুর খনন ও ইটভাটা স্থাপনের কারণে রাজশাহীতে আবাদি জমি কমছে। এছাড়াও অপরিকল্পিত নগরায়নেও এই সমস্যা বাড়ছে। আইনের প্রয়োগ ও প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া এই প্রবণতা থামানো কঠিন হবে। কৃষি জমি কমতে থাকলে ভবিষ্যতে বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা পূরণ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষিজমি রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে রাজশাহীর কৃষি খাত বড় ধরনের সংকট আসবে। বিপর্যয়ে পড়তে পারে এই অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি।