সর্বশেষ সংবাদ :

সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক শিক্ষা বাড়াতে হবে : রাজশাহী বিভাগে বাড়ছে এইচআইভি সংক্রমণ

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী বিভাগে এইচআইভি (মানবদেহে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংসকারী ভাইরাস) সংক্রমণ ক্রমেই বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জে নতুনভাবে শনাক্ত হয়েছেন অন্তত ৮০ জন এইচআইভি-পজিটিভ রোগি। এর মধ্যে শুধু রাজশাহী জেলায় নতুন শনাক্ত ২৮ জন, আর সিরাজগঞ্জে সর্বমোট আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫৫ জনে। পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিরাজগঞ্জ জেলাকে “রেড জোন” ঘোষণা করেছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের এইচআইভি টেস্টিং অ্যান্ড কাউন্সেলিং (এইচটিসি) সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মোট ১২,৪৬৪ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৩ জনের দেহে এইচআইভি ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। চলতি বছরের (২০২৫) প্রথম ১০ মাসেই নতুন ২৮ জন আক্রান্ত, যার মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
২০১৯ সালে পরীক্ষায় কেউ পজিটিভ না হলেও, ২০২০ সালে ২ জন, ২০২১ সালে ৮ জন, ২০২২ সালে ৮ জন, ২০২৩ সালে ২৪ জন, ২০২৪ সালে ২৭ জন এবং ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ২৮ জনের শরীরে ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে সমকামী সম্পর্কের মাধ্যমে সংক্রমণের হার সর্বাধিক। ২০২৪ সালে শনাক্ত ২৭ জনের মধ্যে ১৬ জন এবং ২০২৫ সালে শনাক্ত ২৮ জনের মধ্যে ১৭ জন এইচআইভি সংক্রমিত হয়েছেন সমকামী সম্পর্কে। যৌনকর্মীর মাধ্যমে সংক্রমণ হয়েছে যথাক্রমে ১০ ও ১০ জনের, এবং রক্তের মাধ্যমে একজন করে সংক্রমিত হয়েছেন।
রামেকের কাউন্সেলর রেজাউল করিম জানান, আক্রান্তরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। অনেকে আত্মহত্যার কথাও ভাবেন বা অন্যের শরীরে ভাইরাস ছড়িয়ে দেওয়ার চিন্তা করেন। তাই নিয়মিত কাউন্সেলিং ও মানসিক সহায়তা খুব জরুরি। বর্তমানে রাজশাহীতে শুধুমাত্র এইচআইভি টেস্ট ও কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ রয়েছে। তবে ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা নেই, এজন্য আক্রান্তদের যেতে হয় বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পরিস্থিতি বিবেচনায় রামেকে ট্রিটমেন্ট সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, সিরাজগঞ্জ জেলায় এইচআইভি সংক্রমণের হার গত কয়েক বছরে ভয়াবহভাবে বেড়েছে।
অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি সেন্টার, সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, জেলায় এখন পর্যন্ত ২৫৫ জন এইচআইভি-পজিটিভ রোগী শনাক্ত, যাদের মধ্যে ৭৩ শতাংশ ইনজেকটিং ড্রাগ ব্যবহারকারী।
অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি সেন্টারের প্রশাসক মাসুদ রানা বলেন, ২৫৫ জন আক্রান্তের মধ্যে ১৮৭ জন ইনজেকশন দ্বারা মাদক গ্রহণকারী। বাকি ২৯ জন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ৩৫ জন সাধারণ নাগরিক এবং ৪ জন যৌনকর্মী। এইচআইভি পরীক্ষার কার্যক্রম সিরাজগঞ্জে শুরু হয় ২০২০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি।
এরপর ২০২০ সালে ৪ জন, ২০২১ সালে ৮ জন, ২০২২ সালে ৬৯ জন, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে মোট ১৩৬ জন এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৮ জন নতুন রোগি শনাক্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত জেলার ২৬ জন আক্রান্ত মারা গেছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিস্থিতিকে “উদ্বেগজনক” হিসেবে উল্লেখ করে সিরাজগঞ্জকে এইচআইভি সংক্রমণের ‘রেড জোন’ ঘোষণা করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজশাহী বিভাগে এইচআইভি সংক্রমণের ধরণ বদলে যাচ্ছে। আগে যৌনকর্মীদের মাধ্যমে সংক্রমণ বেশি দেখা গেলেও বর্তমানে সমকামী সম্পর্ক এবং ইনজেকটিং ড্রাগ ব্যবহারকারীদের মধ্যে সংক্রমণের হার দ্রুত বাড়ছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. ফারহানা ইসলাম বলেন, এইচআইভি শুধুমাত্র যৌন রোগ নয় এটি সামাজিক, মানসিক ও জনস্বাস্থ্য সংকট। তরুণদের মধ্যে সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক শিক্ষা না বাড়ালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জে এইচআইভি সংক্রমণের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপদ যৌন আচরণ, নিয়মিত পরীক্ষা এবং সহজ চিকিৎসা-প্রাপ্তি নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।


প্রকাশিত: November 15, 2025 | সময়: 6:51 am | সুমন শেখ