বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
মতলুব হোসেন, জয়পুরহাট: ডুগডুগির বাজনা কানে পড়লেই মনে হতো বানর খেলা এসেছে, খেলা দেখতে ভোঁ-দৌড় পাড়ার বড় আঙ্গিনায়। দলবেঁধে গোল জটলা পাকিয়ে বানরের নানা রকমের খেলা দেখা। খেলা শেষে আবার দৌড়ে গিয়ে মা’র কাছ থেকে কাঁছায় কিংবা ছোট বাটিতে করে কিছু চাল এনে খেলোয়ারের পাতা কাপড়ে ঢেলে দেওয়া। আধুনিক বিনোদনের ছোঁয়ায় এসব যেন এখন শুধু স্বপ্ন। কালের বিবর্তনে থেমে গেছে ডুগডুডির বাজনা, বিলুপ্ত প্রায় বানর খেলা। বানরের প্রতি এখন মানুষের আগ্রহও কমে গেছে। মানুষ এখন মোবাইলের মাধ্যমে ইউটিউবে টিকটক, গানবাজনা, নাটক, সিনেমা সহ নানা রকম বিনোদন দেখে। ফলে খুব দ্রুতই হারিয়ে যাচ্ছে এক কালের ঐতিহ্যবাহী বানর খেলা।
এখন থেকে মাত্র ১৫-১৬ বছর আগেও গ্রামের পাড়া-মহল্লায়, গ্রামীণ হাটবাজার বা গ্রামীণ মেলায় জমে উঠতো বানরের নানা রকমের খেলা। শিশু, কিশোর, বয়স্করা সহ সবাই ভিড় জমাত এই খেলাকে ঘিরে। এক হাতে ডুগডুগি আর অপর হাতে বানরের গলায় লাগানো রশি। আর সেই ডুগডুগি বাজিয়ে প্রবীণ-খেলোয়াড় যখন বানরের নানা রকমের খেলা দেখাত তখন চারপাশে হাসি-আনন্দে মুখর হয়ে উঠত জনতা। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ও কালের বিবর্তনে সেই দৃশ্য এখন প্রায় বিলীন। হারিয়ে যাচ্ছে বানরের খেলা, ফলে কালের বিবর্তনে নিরবেই হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির এই অমূল্য ঐতিহ্য।
জয়পুরহাটের বিভিন্ন গ্রামগঞ্জ, পাড়া মহল্লা, হাটবাজার সহ বিভিন্ন গ্রামীণ মেলায় আগেও নিয়মিত দেখা যেত প্রবীণদের (বানর খেলোয়ার) দল। তাদের এক হাতে থাকত ডুগডুগি, আর অন্য হাতে দড়ি দিয়ে বাঁধা একটি প্রশিক্ষিত বানর আর বাঁশের কঞ্চি। বানর খেলোয়াদের এই এলাকায় প্রবীণ নামে ডাকা হতো। খেলার সময় সেই প্রবীণের নির্দেশে বানর কখনো সালাম দিত, কখনো গাছে উঠত, আবার কখনো দর্শকের টুপি খুলে কিংবা ছোট বাচ্চার পরনের প্যান্ট টেনে দিয়ে দৌড়ে পালাত, তখন সবাই হাসিতে ফেটে পড়ত।
বিশেষ করে বছরের শরৎকাল থেকে শীতকাল পর্যন্ত গ্রামীণ মেলা বা নববর্ষের সময় এই বানর খেলা ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় বিনোদনগুলোর একটি। প্রবীণরা গ্রামের পাড়া মহল্লা, হাট বাজারে, স্কুলের মাঠে ঘুরে ঘুড়ে খেলা দেখাতো। খেলা শেষে দর্শকরা আনন্দের সঙ্গে কিছু চাল, কিংবা খুচরা কয়েক টাকা করে বখশিস দিত।
আক্কেলপুর উপজেলার সাখিদার পাড়া বাঁধ এলাকার ৬৫ বছর বয়সী আবেদ আলী জানান, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই বানর খেলা দেখায়। আগে এক মেলায় খেলা দেখিয়ে একদিনে ৫-৬শ টাকা কামায় হতো। এখন মানুষ আর বানর দেখে দাঁড়ায় না, খেলা দেখে না, কিছু দেয়ও না। আগে গ্রামের মানুষ ছিল সহজ-সরল, আনন্দ পেত ছোটখাটো জিনিসে।’ এখন ডুগডুগি বাজালে মানুষ হাসে, ভাবে এটা একটা পুরোনো কৌতুক। কিন্তু এক সময় এটাই আমাদের জীবনের অংশ ছিল।
জানা যায়, বানর খেলা শুধু বিনোদনই নয়, অনেক দরিদ্র পরিবারের জীবিকারও মাধ্যমও ছিল। প্রবীণরা সাধারণত গ্রামের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ, শিক্ষাহীন কিন্তু শিল্পীসত্তায় ভরপুর। তারা একেকজন জীবন্ত গল্পকথক, যাদের হাতে গড়া বানর দেখায় মানুষের হাসি, আনন্দ আর ছিল শিক্ষা। বর্তমানে প্রবীণদের জীবন জিবীকা টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া বানর পালনের খরচ বেড়ে গেছে এবং এখন বানর পুষতে বন বিভাগ থেকে অনুমতি নিতে হয়। আর খেলায় দর্শক কমে যাওয়ায় প্রবীনদের আয় এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়।
যত দিন যাচ্ছে, গ্রামীণ সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে লোকজ বিনোদনের উপকরণগুলো। হারিয়ে যাচ্ছে হাসি, গল্প, সুর, তাল ও ঐতিহ্যের রঙ। সময় এসেছে এই ঐতিহ্যগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার। কারণ একটি জাতির সংস্কৃতি তার শিকড়ের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে আর বানরের খেলা সেই শেকড়ের অংশ।
জেলা তথ্য অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) ইব্রাহিম মোল্লা সুমন বলেন, বানরের খেলা আমাদের লোকজ ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু সংরক্ষণের উদ্যোগ না থাকায় এটি হারিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে সাংস্কৃতিক উৎসব বা লোকজ মেলা আয়োজনের মাধ্যমে এই শিল্পটিকে যেমন ফিরিয়ে আনা সম্ভব তেমনি এর সাথে বানর খেলার মতো লোকজ শিল্পকেও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
লোকসংস্কৃতি গবেষক চন্দন কুমার দাস বলেন, বানরের খেলা ছিল এক ধরনের নাট্য বিনোদন, যেখানে মানুষের আচরণ, নৈতিকতা, হাস্যরস সবকিছু প্রতিফলিত হতো। এটি কেবল খেলা নয়, ছিল শিক্ষণীয় সামাজিক বার্তা বহনকারী লোকশিল্প। তিনি মনে করেন, ‘এই ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে স্থানীয় সরকার ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে এগিয়ে আসতে হবে। স্কুল-কলেজে লোকজ সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী আয়োজন করলে নতুন প্রজন্মের কাছে এসব ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।