বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
আসাদুজ্জামান মিঠু, মণ্ডুমালা: বরেন্দ্র অঞ্চলে এবারে আমন ধানক্ষেতে ব্যাপকভাবে ইঁদুরের আক্রমণ দেখা দিয়েছে। ক্ষেতের কাঁচা ধান কেটে সাবাড় করে ফেলছে ইঁদুরের দল। আমনের মাঝামাঝি সময়ে ইঁদুরের আক্রমনে দিশেহারা হয়ে পড়েছে কৃষক।
চলছে ভাদ্র মাস। বৃষ্টির পানি নির্ভর বরেন্দ্র এখন সবুজে সবুজে ভরে উঠছে পুরো মাঠ। সেই সঙ্গে রঙিন হয়ে উঠছে প্রান্তিক কৃষকের স্বপ্ন। মাঠজুড়ে এখন সবুজ স্বপ্নের ছড়াছড়ি। এমন সময় আমনের মাঝামাঝির মুহুর্তে ক্ষেতের কাঁচা ধান কেটে সাবাড় করে ফেলছে ঈঁদুরের দল। ইঁদুরের আক্রমণে ব্যাপক ক্ষতির মধ্যে পড়েছে কৃষকেরা।
বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকেরা জানান, ক্ষেতে পোকা আক্রমণ করলে কীটনাশক প্রয়োগ করে পোকা দমন করা যাচ্ছে। কিন্তু ঈঁদুর দমন করা যাচ্ছে না। তাই সরকারকে ঈদুর দমনে নতুন প্রদ্ধতি আবিস্কার করতে হবে, যাতে কৃষক ঈঁদুর থেকে রক্ষা পায়। নাহলে ক্ষেতের অর্ধেক ফসল ঈঁদুরের পেটে যাবে। ইঁদুরের কবল থেকে রক্ষা পেতে সব ধরনের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছেন তারা। ক্ষেতে বিষ টোপ, আতব চালের টোপ কিংবা ফাঁদ পেতেও কোন প্রতিকার পাচ্ছে না।
রাজশাহী অঞ্চলের জেলা উপজেলা ও মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা জানান, শুধু বিষ টোপ নয়, কলাগাছ, লাঠি কিংবা বাঁশের কঞ্চিতে পলিথিন বেঁধে দিলে ও রাতে ফসলের ক্ষেতে টায়ার পোড়ানোর পদ্ধতি ব্যবহার করলে ইঁদুর কিছুটা ভয়ে ক্ষেত ছেড়ে চলে যাবে। কৃষকদের দেয়া হচ্ছে পরামর্শ।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় আমনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮৩ হাজার ৩৮৭ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে পোকা দমনের পদ্ধতিতে পার্চিং-লগ, লাইন এবং ধোঁনছা গাছ লাগানো হয়েছে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে। এছাড়াও রাজশাহী অঞ্চলের রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় আমন চাষাবাদ হচ্ছে ৩ লাখ ৫০ হাজার হেক্টরের উপরে।
ইঁদুরের দ্বারা দেশে বছরে ক্ষতি হয় ৭০০ কোটি টাকারও বেশি ফসল। ২০১৪-১৫ সালে ইঁদুর দ্বারা মোট ৭২৩ কোটি ৭২ লাখ ৭ হাজার ৩৫৫ টাকার শুধু ধান, চাল ও গম ফসলের ক্ষতি হয়েছে। রাজশাহী ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান কর্মকর্তা কৃষি বিশেষজ্ঞ ড. রফিকুল ইসলাম এ তথ্য জানান।
আন্তজার্তিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০১৩ সালের এক গবেষণার উদাহরণ দিয়ে ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে ইঁদুর ৫০ থেকে ৫৪ লাখ লোকের এক বছরের খাবার নষ্ট করে। তাই ইঁদুর প্রতিহত করতে সরকারসহ কৃষকদের সচেতন হবে।
রাজশাহীর তানোর উপজেলার বাধাইড় ইউপির পরানপুর গ্রামে কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান বাবু জানান, চলতি আমন মৌসুমে ৪ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন তিনি। অনুকুল আবহাওয়া থাকায় তার ক্ষেতে ধান অন্য সব বছরের চেয়ে ভালই ছিল। কিন্ত তার ৪ বিঘা ধানের মধ্যে প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতক মত কাঁচা ধান কেটে সাবাড় করে ফেলেছে ইঁদুর।
গোদাগাড়ীর উপজেলার পাকড়ি ইউপির সগুণা গ্রামের কৃষক লুৎফর রহমান জানান, চলতি মৌসুমে তার ৮ থেকে ১০ শতক ক্ষেতের কাচা ধান কেটে ফেলেছে ঈদুর। কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুয়াযী রাতে ক্ষেতের পাশে পুরনো টায়ার পুড়ানো, পটকা ফোঁটানো, বিষ টোপ ব্যবহার করা করেও ইঁদুর দমন করা যাচ্ছেনা। ধান ঘরে তুলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
ইঁদুরে এমন সমস্যা শুধু কৃষক মেস্তাফিজুর রহমান ও লুৎফর রহমান একাই নয়, রাজশাহী সহ বরেন্দ্র অঞ্চলে চলতি আমন মৌসুমে অন্যসব বছরের চেয়ে এবার ইঁদুরের আক্রমণে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যা হাজার হাজার কৃষকের কাঁচা-আধাপাকা ধান কেটে সাবাড় করে ফেলছে।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ উপ-পরিচালক উম্মে সালমা বলেন, ইুঁদর একটি জাতীয় সমস্যা। এটি দমন করতে সবাইকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। এ জন্য মাঠ পর্যায়ে আমাদের উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা প্রতিদিনই কোন কোন এলাকাই ইঁদুর দমনে করণীয় লিফলেট বিতরণ করছেন। কৃষক সমাবেশ হচ্ছে। ইঁদুর দমনে সবচেয়ে বেশি কৃষক সহ সবাইকে সচেতন করা প্রয়োজন।