বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
মতলুব হোসেন, জয়পুরহাট: জয়পুরহাটের আক্কেলপুর পৌর এলাকার চক্রপাড়ার বাসিন্দা পারভীন আক্তার। স্বামী নেই। বর্তমানে তিন সন্তান নিয়ে তার অবর্ণনীয় কষ্টের জীবন। এখন খেয়ে না খেয়ে কোনোমতে দিন পার করছেন সে। অথচ এক সময় তার সবই ছিল। স্বামী সন্তান নিয়ে ছিল সুখের সংসার। কিন্তু তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। একটু বেশি উপার্জনের জন্য জীবিকা হিসেবে স্বামী গ্রামের অন্য দশজনের মতো জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়েছিল শীল-পাটায় নকশার কাজ। ফলে পাটার কাজ করে এক পর্যায়ে অসুস্থ হয়ে তার স্বামী মারা যায়। ভাগ্যলক্ষ্মী এরপর আর বেশিদিন সহায় হয়নি।
তিনি বলেন, ‘পাটার কাজ করে প্রথম স্বামী দুই সন্তান রেখে মারা গেল। পরে পরিবারের লোকজন দেবরের সঙ্গে বিয়ে দিল। তিনিও একই কাজ করে অসুস্থ হলেন এবং বিয়ের ৯ বছরের মাথায় তিনিও মারা গেলেন। এই পক্ষেরও একটি সন্তন রয়েছে। আমি এখন খুবই অসহায়।’
চক্রপাড়ার বীথি আক্তারের স্বামী এখনো বেঁচে আছেন। তবে সুস্থ নন। পাটার কাজ করে এখন তিনি শয্যাশায়ী। তার শ্বশুর ও দুই দেবর একই কাজ করে দুজনেই মারা গেছেন। পুরো পরিবারের দায়িত্ব এখন তার কাঁধে।
বীথি বলেন, ‘অনেক কষ্টে সংসার চলে। দেবরের ছোট তিনটি বাচ্চা আমাকেই লালন-পালন করতে হয়।’ পারভীন ও বীথি আক্তারের মতো এমন অনেক নারী চক্রপাড়ায় আছেন যারা অকালে স্বামী-স্বজনদের হারিয়েছেন। এই সংখ্যাও কম নয়, প্রায় অর্ধশত। তারা সবাই পাটায় ধার কাটার কাজ করতেন। দীর্ঘ সময় ধরে এ কাজ করায় তারা ফুসফুসের বিভিন্ন জটিলতায় ভুগে মাসের পর মাস হাসপাতালের বিছানায় থেকে এক সময় নীরবেই চলে গেছেন না ফেরার দেশে। পুরো আক্কেলপুর উপজেলায় এই সংখ্যা অন্তত শতাধিক।
কিছুদিন পুর্বে স্থানীয় প্রশাসন এ পেশার উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে এ পেশা অতীতের মতো সাময়িক বন্ধ রয়েছে। তবে এখন বন্ধ হলেও বিগত সময়ে কাজ করা অনেক শ্রমিকই এখন মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। ফুসফুসে জটিলতা দেখা দেওয়ার পাশাপাশি তাদের শরীরে নানা রোগ বাসা বেঁধেছে। অনেকেই কাজ ও চিকিৎসা করাতে না পেরে পরিবার নিয়ে দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছেন।
জানা গেছে, বিগত ১৯৯৫ সালে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর পৌর এলাকার চক্রপাড়া গ্রাম সহ উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামে স্থানীয় কিছু মহাজন ভারত থেকে পাথরের কাঁচামাল আমদানি করে পাটা-পুতা তৈরি শুরু করেন। যা সারা দেশে সরবরাহ করা হতো। বেশি মজুরির আশায় এ কাজে দরিদ্র শত শত মানুষ যুক্ত হন। তাদের ধরে রাখতে মহাজনরা কৌশল হিসেবে অগ্রিম মোটা অঙ্কের টাকাও দিতেন।
চক্রপাড়া এলাকার সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘তিন বছরের বেশি সময় হাতুড়ি-ছেনি দিয়ে পাটার কাজ করেছিলাম। নাক-মুখ দিয়ে পাথরের কণা ঢুকে এখন আমার ফুসফুস নষ্ট হয়ে গেছে। কিডনির সমস্যাতেও ভুগছি। এখন পেট ফুলে উঠেছে। গত ২০০৯ সাল থেকে অসুস্থ হয়ে বিছানায় শুয়ে আছি। উঠতে পারি না। আগে মানুষের কাছে হাত পেতে কিছু চিকিৎসা করেছি। গত চার বছর ধরে টাকার অভাবে কোন প্রকার চিকিৎসাও করাতে পারছি না।’
একই এলাকার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘পাটার কাজ করে গত ১২ বছর ধরে আমি অসুস্থ। চলাফেরা করতে পারি না। লাঠিতে ভর দিয়ে বাড়ির আঙিনা পর্যন্ত বের হই।’ একই এলাকার আকরাম হোসেন নামে একজন বলেন, ‘একটু হাঁটলেই শ্বাসকষ্ট হয়, অস্থির লাগে। সরকার যদি আমাদের সাহায্য করত তাহলে খুবই উপকার হতো।’
অনুসন্ধানে উঠে আসে গা শিউরে উঠার মতো চাঞ্চল্যকর তথ্য। এলাকার বেশ কয়েকজনের সাথে আলাপকালে তারা জানায়, শ্রমিকদের কোন প্রকারের সুরক্ষা না রেখেই এই চক্রপাড়া গ্রাম সহ এলাকার গোপীনাথপুর, পুর্ন গোপীনাথপুর ও কাশিড়া সহ উপজেলার কয়েকটি গ্রামে এক সময় এই পাটা-পুতা তৈরীর প্রচুর কাজ হতো। আর এই কাজের বেশির ভাগ মহাজনরা ছিলেন ক্ষমতাসীন দলের লোক। আর যেসব মহাজনরা কেবল বেশি লাভের আশায় এসব পাটা-পুতার ব্যবসা করতেন তারা ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই এসব করতেন।
এলাকায় বছরের পর বছর ধরে নির্বিঘ্নে চলেছে এই কাজ। এতে করে মহাজনদের বাড়ীতে পাকা দালান উঠলেও কবরস্থানে আশংকাজনক ভাবে বেড়েছে এই পেশার শ্রমিকদের কবরের সংখ্যা। আর যারা এখনো বেঁচে আছেন তারা ফুসফুস সহ বিভিন্ন জটিল রোগে রয়েছেন হাসপাতালের বেডে কিংবা দীর্ঘদিন ধরে রোগাক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা করাতে না পেরে বাড়ীতেই খেয়ে না খেয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন।
পাটা-পুতা কাজের টুক-টাক শব্দে ধীরে ধীরে মহাজনদের ব্যাংক ব্যালেন্স স্ফীত হলেও বছরের পর বছর ধরে এই কাজ করায় অসচেতন শ্রমিক ও তার উপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের ভাগ্যে নেমে এসেছে অমানিসার গাড়ো অন্ধকার।
আক্কেলপুর পৌরসভার সাবেক প্যানেল মেয়র আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘পুরো উপজেলায় পাটা-পুতার কাজ করে বিভিন্ন রোগে অসুস্থ হয়ে শতাধিক মানুষ মারা গেছেন। প্রশাসন সহ আমরাও বিভিন্ন ভাবে মানুষদের সচেতন করায় এই পেশা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। তবে যারা বিগত সময়ে কাজ করেছিলেন তারা এখন অসুস্থ ও বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছেন।’
আক্কেলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আসিফ আদনান বলেন, ‘পাটা-পুতার কাজ করে ফুসফুসের সমস্যা নিয়ে অনেকেই আমার এখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর আগে অনেকে মারাও গেছেন।’ তিনি বলেন, ‘পাথরের কণা দীর্ঘ সময় আটকে থাকলে ফুসফুসের ক্ষতি হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় আমরা এটাকে সিলিকোসিস বলি। এটার কারণে ফুসফুস নষ্ট হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। যারা বেঁচে থাকেন তারা সারাজীবনই শ্বাসকষ্টে ভোগেন। একটু চলাফেরা করলেই হাপিয়ে ওঠেন।’
জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সরদার রাশেদ মোবারক জুয়েল বলেন, ‘নাক-মুখ দিয়ে পাথরের কণা ফুসফুসে গেলে মরণব্যাধি ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত।’
আক্কেলপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুরুল আলম বলেন, ‘পুরো উপজেলার ৩৫টির মতো পরিবার পাটা-পুতা তৈরির কাজ করত। এ কাজে স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকায় ও পরিবেশ দূষণ হওয়ায় আমরা অনেক বুঝিয়ে কাজটি বন্ধ করেছি। তাদের কৃষি প্রণোদনা সহ বিভিন্ন সহযোগিতা করা হয়। ভবিষ্যতে যদি কেউ এমন কাজ করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।