বড় বোনের অপরাধের সাজা চারবছর ধরে ভোগ করছিলেন ছোট বোন

মতলুব হোসেন, জয়পুরহাট: চার বছর আগে ঘর ছেড়ে পালিয়ে বিয়ে করেছিল বড় বোন লিমা। আর সেই অপরাধের সাজা গত চার বছর ধরে ভোগ করছে তারই ছোট বোন লিজা। চার বছর ধরে বদ্ধ ঘরে আটকে রেখে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা সহ তার উপর চলতো মানসিক ও শারিরীক নির্যাতন। শুধু তাই নয়, চার বছর ধরে সে দেখেনি সূর্যের আলো, পায়নি নির্মল সুপ্ত বাতাস।
এমন নির্মম ও মধ্যযুগীয় শাস্তির অভিযোগ উঠেছে আক্কেলপুর উপজেলা হাসপাতালের পিছনের বাড়ীর এনামুলের বিরুদ্ধে। আর এই এনামুলই হতভাগ্য লিজার পিতা। এমন নির্মমতার খবর পেয়ে গত শনিবার সন্ধ্যার পর আক্কেলপুর পৌর এলাকার হাসপাতালের পিছনে এনামুলের বাড়ি থেকে স্থানীয়দের সহযোগিতায় মানসিক ভাবে অসুস্থ অবস্থায় মেয়েটিকে উদ্ধার করে আক্কেলপুর থানা পুলিশ।
সরেজমিনে জানা যায়, বাড়ির প্রধান ফটকে ঝুলছিল তালা। বাবা ছিল গ্রামের বাড়িতে। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে দেখে এলাকাবাসী তার বাড়ির সামনে হইচই করছিল। বাবা ফিরে এসে এলাকাবাসীর তোপের মুখে বাড়িতে তালা খুলে প্রবেশ করেন।
গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির সকল জানালা দরজা বন্ধ এমনকি জানালা দরজা যেন খুলতে না পারে সেজন্য জানালা দরজাতে টিন ও কাঠ দিয়ে ঘেরা। মেয়ের ঘরে একটি ছোট ফ্যান আর একটি বাতি। এছাড়াও বাড়ির ভিতরে নেই কোন তেমন বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা। বাড়ির প্রতিটি আসবাব পত্রে লেখা আছে ‘ডা. এনামুল’। বাড়িতে আলো বাতাস না আসায় মনে হয় এ যেন একটা ভুতুড়ে বাড়ি। সারা ঘর এলোমেলো। সেই বাড়িতে দীর্ঘ চার বছর ধরে বন্দী করে রেখেছে এসএসসি পাশ মেয়েকে। মেয়ে যেন কারো সাথে কথা না বলে এজন্য মেয়েকে ঘরবন্দী করে রেখে চেতনা নাশক ইনজেকশন করতে নিয়মিত। চালানো হতো নির্যাতন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রায় ৫ বছর আগে অবসরপ্রাপ্ত মেডিকেল এ্যাসিট্যান্ট এনামুল হকের বড় মেয়ে লিমা আক্তার ভালবেসে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে। এরপর গত চার বছর আগে ২০২১ সালে ছোট মেয়ে সুরজিনা আক্তার জাহান হক লিজাকে এসএসসি পাশের পর থেকেই পড়াশুনা বন্ধ করে দিয়ে নিজ বাড়িতে একটি ঘরে আবদ্ধ করে রাখে বাবা এনামুল হক।
এরপর মেয়েটিকে বেশির ভাগ সময় ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে রাখা হতো। কখনো মেয়ে প্রতিবাদ করলেই বাবা এনামুল ও সৎ মা দুজনে মিলে শারিরিক নির্যাতন চালাতো। এক পর্যায়ে বাবা তার মাথা ন্যাড়াও করে দেয়। ওই বাড়িতে প্রতিবেশিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে এনামুল হক। কোন প্রতিবেশি সহ কাউকে প্রবেশ করতে দিতেন না তিনি। বাহির থেকে সব সময় বাড়ির প্রাধান গেটে ঝুলতো তালা। এর ফলে আস্তে আস্তে মানসিক রোগিতে পরিণত হয়েছে লিজা।
তবে প্রতিবেশিরা মাঝে মাঝে লিজার কান্নার শব্দ পেলেও এনামুলের ভয়ে কেউ কথা বলতে সাহস পেত না। মেয়েটির ওপর এমন নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে এক পর্যায়ে পুলিশকে খবর দেয় স্থানীয়রা। পরে খবর পেয়ে পুলিশ এসে বাড়িতে প্রবেশ করে মেয়েটিকে উদ্ধার করে। এরপর আপাতত মেয়েটিকে মুক্ত করে দ্রুত চিকিৎসার জন্য বাবাকে নির্দেশ দেয় পুলিশ।
এনামুলের প্রতিবেশি তুহিন বলেন, লিজা নামে মেয়েটি আগে সুস্থ ও স্বাভাবিক ছিল। লেখাপড়াও ভাল করতো। প্রায় চার বছর আগে লিজার বোড় বোন লিমা ভালবেসে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে। ছোট মেয়ে যেন এমন কাজ না করতে পারে এজন্য কয়েক বছর ধরে নিজ বাড়িতে আবদ্ধ করে রাখে তার বাবা। গত চার বছর ধরে বাড়ির বাহির হতে দেয়নি মেয়েটাকে। চালানো হতো শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন। এক পর্যায়ে মেয়েটি মানসিক রোগিতে পরিণত হয়েছে। শনিবার সন্ধ্যার পর পুলিশের সহযোগিতায় স্থানীয়রা বাড়িতে প্রবেশ করে মেয়েটির করুণ দৃশ্য দেখে আমরা কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি।
অপর প্রতিবেশী জনি বলেন, মেয়েটিকে তার বাবা এনামুল বদ্ধ ঘরের মধ্যে আটকে রেখে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে ঘুমিয়ে রাখতো। কোন এক সময় মাথার চুলও কেটে দিয়েছে। মাঝে মধ্যে মেয়েটি ঘরের ভিতর আর্তনাত করে চিৎকার করতো। বিষয়টি খারাপ লাগলেও এনামুলের দাপটে কথা বলার সাহস হয়নি। মেয়েটিকে এখন চিকিৎসা করলেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে। আর সেই সাথে আমরা এনামুলের বিচারও দাবি করছি।
লিজার সৎ মা ফেরজা ওরফে ফেতু জানান, তার স্বামী এনামুলের প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তাকে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। তবে স্বামীর ইচ্ছের বিরুদ্ধে কখনো কথা বলার সাহস হয়নি। বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় গেটে তালা দিয়ে বের হয়। আবার ফিরে এসে তালা খুলে দেয়। এজন্য প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথাবার্তা বলার সুযোগ নাই। স্বামীর ইচ্ছেই সবকিছু চলে। মেয়েটি এখন অসুস্থ।
এ ব্যাপারে লিজার বাবা এনামুল হক বলেন, বড় মেয়ে লিমা আক্তার পড়াশোনা করতে গিয়ে পালিয়ে বিয়ে করেছে। এতে আমার মান সম্মানের অনেক বড় ক্ষতি হয়েছে। ছোট মেয়ে লিজা ২০২১ সালে এসএসসি পাশ করেছে। লেখা পড়াতে ভাল ছিল। মেয়েটি সুন্দর হওয়ায় ছেলেরা বিরক্ত করতো। এ কারণে তার লেখা পড়া বন্ধ করে বাড়িতে রেখে বাড়ির বাহিরে বের হতে দেয়নি। আমি সকালে তালা দিয়ে বাহিরে যাই আবার সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে তালা খুলে দেয়। বর্তমানে মেয়েটি অসুস্থ।
পুলিশ ও স্থানীয়রা এসে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে মেয়েটিকে দেখেছে। সবার সামনে মেয়েটি কথাবার্তা স্বাভাবিক বলেনি। তবে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য না। পুলিশ মেয়েটিকে অবমুক্ত করে দ্রুত চিকিৎসা করার কথা বলে গেছেন।
আক্কেলপুর থানার উপ-পরিদর্শক গনেশ চন্দ্র বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয়দের সহযোগিতায় ওই বাড়িতে আমরা প্রবেশ করি। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে একটি আবদ্ধ ঘরে মেয়েটিকে দীর্ঘদিন আবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। দির্ঘদিন আবদ্ধ থাকায় মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাকে অবমুক্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য তার বাবাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


প্রকাশিত: জুলাই ৩১, ২০২৫ | সময়: ২:৪২ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ