বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
স্টাফ রিপোর্টার: ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনায় রাজশাহীতে বরণ করা হলো পহেলা বৈশাখ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ। সোমবার সকালে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ও বর্ণিল আয়োজনে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনটিকে স্বাগত জানায় রাজশাহীবাসী।
দিবসটি উপলক্ষে সকাল সাতটায় নগরীর সিএন্ডবি মোড় থেকে শিশু একাডেমি পর্যন্ত ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ বের করে রাজশাহী জেলা প্রশাসন। বর্ণিল সাজে সে শোভাযাত্রায় অংশ নেয় সর্বস্তরের মানুষ। শোভাযাত্রা শেষে শিশু একাডেমিতে পরিবেশন করা হয় জাতীয় সংগীত ও বর্ষবরণের গান ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’।
সকাল পৌঁনে আটটায় একই স্থানে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসময় বিভাগীয় কমিশনার খোন্দকার আজিম আহমেদ, সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের মহাপরিচালক মো. আ. রাজ্জাক সরকারসহ জেলা প্রশাসন ও পুলিশের ঊর্ধŸতন কর্মকর্তাবৃন্দ অনুষ্ঠানে আগত সর্বসাধারণকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানান।
আলোচনা শেষে বর্ষবরণ উপলক্ষ্যে জেলা শিল্পকলা একাডেমি এবং শিশু একাডেমি আয়োজিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। পরে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়। সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় শিশু একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীরা ছাড়াও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিল্পী এবং নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিল্পীরা অংশগ্রহণ করে।
গ্রামবাংলা ও বাঙ্গালীদের ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরতে শিশু একাডেমি চত্বরে দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। মেলার স্টলগুলোতে মৃৎশিল্প, কুটির শিল্প, পাটজাত পণ্য, পোশাক ও ঐতিহ্যবাহী খাবার প্রদর্শন ও বিক্রিয় করা হয়।
রাবি: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) নানা আয়োজন-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হয়। এদিন সকাল ৯টায় চারুকলা চত্বরে মুক্তমঞ্চে বর্ষবরণের কর্মসূচি উদ্বোধন করেন উপাচার্য প্রফেসর সালেহ্ হাসান নকীব। সেখানে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) প্রফেসর মোহা. ফরিদ উদ্দীন খান, কোষাধ্যক্ষ প্রফেসর মো. মতিয়ার রহমান, চারুকলা অনুষদের অধিকর্তা প্রফেসর মোহাম্মদ আলী, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার প্রফেসর ইফতিখারুল আলম মাসউদ, প্রক্টর প্রফেসর মো. মাহবুবর রহমান, জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক প্রফেসর মো. আখতার হোসেন মজুমদার, লিগ্যাল সেলের প্রশাসক প্রফেসর মো. আব্দুর রহিম মিয়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বেলা ১০টায় অনুষ্ঠিত হয় বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা। এটি চারুকলা চত্বর থেকে শুরু হয়ে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে। শোভাযাত্রায় উপাচার্য, উপ-উপাচার্যদ্বয়সহ বিপুল সংখ্যক শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অংশ নেন। বর্ষবরণের কর্মসূচিতে আরো আছে দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বৈশাখী মেলার আয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনও নিজ নিজ কর্মসূচির মাধ্যমে বর্ষবরণ উদযাপন করে।
রুয়েট: রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) প্রশাসনিক ভবনের সামনে ছাত্র-ছাত্রী এবং শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ছেলে মেয়েদের অংশগ্রহণে চিত্রাংকন প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুর রাজ্জাক। এরপর সকাল সাড়ে ১০ টায় প্রশাসনিক ভবনের সামনে থেকে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষ্যে বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা বের করা হয়। আনন্দ শোভাযাত্রাটি রুয়েট ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে এসে শেষ হয়। আনন্দ শোভাযাত্রা শেষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন করা হয়। খেলাধুলার উদ্বোধন করেন উপাচার্য। পরে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুর রাজ্জাক।
দুপুরে ছাত্র কল্যাণ দপ্তরের পরিচালক ও বাংলা নববর্ষ- ১৪৩২ উদযাপন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. রবিউল ইসলাম সরকারের সভাপতিত্বে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষ্যে বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুর রাজ্জাক।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ভারপ্রাপ্ত রেজিষ্ট্রার আরিফ আহম্মদ চৌধুরী সহ বিভিন্ন অনুষদের ডীন, সকল পরিচালক, বিভিন্ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, দপ্তর ও শাখা প্রধানগন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এদিকে বর্ষবরণ উপলক্ষে বর্ণিল সাজে সাজানো হয়েছিল রুয়েট ক্যাম্পাস। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষ্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুর রাজ্জাক রুয়েট পরিবারের পক্ষ থেকে সকলকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানান।
রাজশাহী শিক্ষাবোর্ড: রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ‘জাতীয় সংগীত’ ও ‘এসো হে বৈশাখ’ গান পরিবেশনের মাধ্যমে আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের সূচনা হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক ও নববর্ষ উদ্যাপন কমিটির আহবায়ক মহা. জিয়াউল হক। আরও বক্তব্য দেন রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর ড. শামীম আরা চৌধুরী।
এরপর মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের উপ-সচিব(প্রশাসন) ওয়ালিদ হোসেন, উপ-কলেজ পরিদর্শক লটন সরকার, উপ-সচিব(ভান্ডার) মোহা. দুরুল হোদা, উপ-বিদ্যালয় পরিদর্শক ফরিদ হাসান, সহকারী সচিব আওলাদ হোসেন খান এবং স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা জনাব সুলতানা শামীমা আক্তার। বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোর্ডের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারী স্বতঃস্ফুর্তভাবে অংশগ্রহণ করায় চেয়ারম্যান মহোদয় আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। অনুষ্ঠানের সঞ্চালনের দায়িত্ব পালন করেন রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের প্রধান মূল্যায়ন অফিসার জনাব এস. এম. গোলাম আজম।
রাজশাহী কলেজ: রাজশাহী কলেজের প্রাঙ্গন সেজেছে বশাখী সাজে। লাল-সাদায় সজ্জিত প্রাঙ্গণজুড়ে বাংলার প্রকৃতির রঙিন আঁচলে আজ বাঙালিয়ানার তপ্ত আনন্দের আবাহন।মাছে-ভাতে বাঙালির নববর্ষের এতিহ্যের ধারায় পান্তা-ইলিশ উদযাপন আয়োজনও হয়ছে এই প্রাঙ্গণে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মু. যহুর আলী, উপাধ্যক্ষ ইব্রাহিম আলী সহ বিভিন্ন বিভাগের অন্যান্য শিক্ষকবৃন্দ ও শিক্ষার্থীরা। শোভাযাত্রা শেষে অধ্যক্ষ প্রফেসর মু. যহুর আলী মেলার উদ্বোধন করেন। মেলা উপলক্ষে পান্তাভাত থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাবারের দোকানের পসরা বসেছে প্রাঙ্গণের নানা জায়গা জুড়ে।এছাড়াও বর্ণাঢ্য বইমেলার আয়োজন। সবশেষে আয়োজিত হয় সাংস্কৃতিক পর্ব। ছন্দে-সুরে-নৃত্যে ক্যাম্পাসের প্রাঙ্গন আজ মুখরিত হয় শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বসিত পদচারণায়।
বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়: বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. খাদেমুল ইসলাম মোল্যার নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্লাজা চত্বর থেকে সকাল ১০টায় শুরু হয় আনন্দ শোভাযাত্রা। ঢাক-ঢোল, পটচিত্র, ফেস্টুন, হাতপাখা, প্ল্যাকার্ডসহ শোভাযাত্রাটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রধান ফটক হয়ে খেলার মাঠের পূর্বকোণের আমবাগানে গিয়ে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. আনন্দ কুমার সাহা, কোষাধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মো. ফয়জার রহমান, প্রক্টর ডা. মো. আব্দুল আউয়াল, রেজিস্ট্রার সুরঞ্জিত মন্ডলসহ বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় প্রধান, কো-অর্ডিনেটর, শিক্ষক, কর্মকর্তা এবং নানান রঙের পোশাকে সজ্জিত শিক্ষার্থীরা।
শোভাযাত্রা শেষে আয়োজন করা হয় বর্ষবরণ উৎসব। বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী বক্তব্যে উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. খাদেমুল ইসলাম মোল্যা বলেন, ‘বাংলা নববর্ষ আমাদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকার এক প্রাণবন্ত উপলক্ষ। এ উৎসবের মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।’ উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. খাদেমুল ইসলাম মোল্যার গান পরিবেশন অনুষ্ঠানে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
এনবিআইইউ: নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বাংলা বিভাগ বাঙালি ঐতিহ্যের আবহে দিনব্যাপী বাংলা নববর্ষ ১৪৩২ বরণ করেছে। এনবিআইইউ ক্যাম্পাসে সকাল ১০ টায় কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘এসো হে বৈশাখ’ গানের মাধ্যমে নববর্ষকে বরণ করে নেয়া হয়। বৈশাখ উপলক্ষ্যে প্রকাশিত পত্রিকা ‘বৈশাখী বাউ’ এর মোড়ক ও পাঠ উন্মোচন করা হয়। এসময় ছিলেন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. বিধান চন্দ্র দাস, ট্রেজারার প্রফেসর আনসার উদ্দিন, ছাত্র উপদেষ্টা ড. নূরে এলিস আকতার জাহান, প্রক্টর এজেএম নূর-ই-আলম, বাংলা বিভাগের প্রধান হাসান ঈমাম সুইট এবং বাংলা বিভাগের দুইজন প্রভাষক গামিউল্লা খান ও শামীমা নাজনীন তনিমা। হাসান ঈমাম সুইট সম্পাদিত ‘বৈশাখী বাউ’ মূলক বৈশাখ নিয়ে শিক্ষার্থীদের অনুভূতির অভিব্যক্তি। এ কারণে স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে বৈশাখী মনের হালচাল। সবাই মিলে গরুর গাড়িতে চড়ে রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কে আনন্দ র্যালিতে অংশ নেয়। র্যালি শেষ হয় ক্যাম্পাস প্রাঙ্গনে এসে। সময় তখন প্রায় বেলা দুইটা। পান্তা, ইলিশ, মসুর ডাল ভর্তা, মিস্টি কুমড়া ভর্তা, আলু ভর্তা, কাঁচামরিচ, শুকনা মরিচ ও পেয়াজে দিয়ে জমজমাট বাঙালি ভোজের আয়োজন করা হয়। ক্যাম্পাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এক আনন্দঘন মুহূর্তের ভেতর দিয়ে পহেলা বৈশাখ ১৪৩২ অতিবাহিত করে।