বিলীনের পথে প্রাচীন শিবমন্দিরটি

মতলুব হোসেন, জয়পুরহাট: জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার পাঁচ শতাব্দী প্রাচীন চারটি শিবমন্দির এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সাক্ষী এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন একসময় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতীক ছিল। এখন সেগুলো কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে। অযত্ন, অবহেলা ও অবৈধ দখলের কারণে মন্দিরগুলোর অস্তিত্ব হুমকির মুখে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, তালোড়া-বাইগুনী শিবমন্দির, কালাই হাট এলাকার শিবমন্দির এবং জামুরা-বাসুরা গ্রামের দুটি শিবমন্দিরের দেয়ালে শ্যাওলা জমেছে, লতাপাতার আচ্ছাদনে ঢাকা পড়েছে স্থাপত্যশৈলী। বহু জায়গায় পলেস্তারা খসে পড়েছে, ইট গুলো ধসে যাচ্ছে। একসময়কার কারুকাজ খচিত পোড়ামাটির ফলক, জ্যামিতিক নকশা ও টেরাকোটা শিল্পকর্মের অনেক কিছুই এখন আর নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, মন্দিরগুলোর মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ইতোমধ্যে লুট হয়ে গেছে। শিবলিঙ্গ, কষ্টিপাথরের মূর্তি, টেরাকোটা সমৃদ্ধ ইট, এমনকি উপাসনার বিভিন্ন উপকরণও আর নেই। মুক্তিযোদ্ধা মুনীষ চৌধুরী বলেন, মন্দিরের এই দুর্দশা শুধু ধর্মীয় নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্যের অপূরণীয় ক্ষতি। আমরা চাই, সরকার দ্রুত এগুলোর সংরক্ষণে ব্যবস্থা নিক। শুধু চুরি নয়, অবৈধ দখলও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা জানিয়েছেন, মন্দিরগুলোর আশপাশের জমি দখল হয়ে গেছে। কোথাও গড়ে উঠেছে দোকানপাট, কোথাও বাড়িঘর। কালাই উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সমীর কুন্ডু বলেন, প্রশাসন যদি এখনই ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন কয়েক বছরের মধ্যেই পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে। স্থানীয়দের দাবি, শুধুমাত্র এই চারটি মন্দিরই নয়, উপজেলার আরও কয়েকটি শিবমন্দির ইতোমধ্যেই ধ্বংস হয়ে গেছে। দেওগ্রাম, জগডুম্বর, বলিগ্রাম এবং শিমরাইল গ্রামের শিবমন্দিরের অস্তিত্ব এখন শুধুই ইতিহাসের পাতায়। এসব মন্দির সংরক্ষণের উদ্যোগ না নেওয়ায় এগুলো আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ বিষয়ে কালাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি মন্দিরগুলোর সংস্কার বা পুনঃনির্মাণের জন্য পর্যটন মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানো হবে। তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধু সুপারিশ পাঠালেই হবে না, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। গবেষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আব্দুল মজিদ বলেন, সরকার যদি এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো সংরক্ষণে এখনই ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে হয়তো একসময় বইয়ের পাতায় লেখা থাকবে—কালাইয়ে একসময় ৫০০ বছরের পুরনো শিবমন্দির ছিল, কিন্তু সেগুলো আর নেই। সংরক্ষণ না হলে হয়তো আর কিছুদিন পর এই শিবমন্দিরগুলোর নামই শুধু থেকে যাবে, আর অস্তিত্ব থাকবে না।


প্রকাশিত: মার্চ ২৬, ২০২৫ | সময়: ৩:২৬ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ

আরও খবর