বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
স্টাফ রিপোর্টার: রিকশাচালককে জুতাপেটা করে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া সমাজসেবা কর্মকর্তা জাহিদ হাসান রাসেলের কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ ছিলেন রাজশাহীর পবা উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাঁর বিরুদ্ধে ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে দুটি লিখিত অভিযোগও হয়েছিল। কিন্তু ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তারা ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা; অভিযোগের কোনো তদন্তই করেননি। ফলে বার বার পার পেয়ে গেছেন জাহিদ হাসান রাসেল। সবাইকে দেখিয়েছেন নিজের দাপট। বিতর্কিত এই কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পরেও সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক সৈয়দ মোস্তাক হাসান ও জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মনিরা খাতুন তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। যদিও তারা বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
জাহিদ হাসান আসার পর তার দুর্ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন পবার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। গত বছরের ৩১ মার্চ উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শিমুল বিল্লাহ সুলতানা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে জাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের কপি সমাজসেবার বিভাগীয় পরিচালককেও দেওয়া হয়।
অভিযোগে তিনি লেখেন, সমাজসেবা কর্মকর্তা জাহদি হাসান তার দাপ্তরিক বিভিন্ন কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন সভার নোটিশ না দিয়েই সভায় উপস্থিতির স্বাক্ষর নেওয়ার জন্য পাঠাতেন। তাতে সভার কোনো তারিখ কিংবা আলোচ্যসূচি উল্লেখ থাকত না। উপস্থিতি রেজিস্ট্রারে স্বাক্ষর না করলে তিনি প্রায়ই অশোভন আচরণ করে থাকেন। গত বছরের ৬ মার্চ উপজেলা পরিষদ চত্বরে তিনি সবার সামনে ক্ষুব্ধ হয়ে অকথ্য ও অশ্রাব্য ভাষায় অশালীন আচরণ করেন। তিনি লেখেন, ‘দপ্তরের নারী সহকর্মী হিসেবে তাঁর এমন আচরণে আমি বিষ্মিত ও হতবাক হয়ে যাই। এমন আচরণ সরকারী কর্মচারী বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ও দাপ্তরিক শিষ্টাচার বহির্ভুত।’ এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি অনুরোধ জানান। তবে কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থায় নেয়নি।
এর আগে ২০২৩ সালের ১৬ মে পবা উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী সমাজসেবা কর্মকর্তা শারমিন আফরোজ জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের তৎকালীন উপপরিচালক হাসিনা মমতাজের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, ১৪ মে তিনি অফিসে এলে সমাজসেবা কর্মকর্তা তাকে ডাকেন এবং জোর করে তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেন। তিনি ম্যাসেঞ্জারের কথোপকথন চেক করেন এবং অধঃস্তন কর্মচারীদের সামনে তাকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত ও মন্তব্য করেন। তিনি বিকেল ৪টার কথোকপথনকে ভোর ৪টা এবং দুপুর ১২টার কথোপকথনকে রাত ১২টা বলে উপস্থাপন করেন। তিনি অনুমতি ছাড়াই এই কথোপকথনের ছবি তুলে নেন নিজের মোবাইলে।
ওই নারী কর্মকর্তা অভিযোগে আরও উল্লেখ করেন, জরুরি প্রয়োজনে ছুটির দরকার হলে জাহিদ হাসান তা দেন না। জাহিদ তাকে দাপ্তরিক সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার হুমকি দেন। কোনো কাজের বিষয়ে নির্দেশনা চাইতে গেলে যে ধরনের আচরণ করেন তা শোভনীয় নয়। অফিসে সেবাগ্রহীতাদের সামনেও তিনি অধঃস্তন কর্মচারীদের সঙ্গে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করেন। তার অধীনে কাজ করতে নিরাপদ বোধ করছেন না উল্লেখ করে ওই নারী কর্মকর্তা লেখেন, তিনি অফিসে এক ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। এ বিষয়ে তিনি উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুরোধ করেন। তবে এ অভিযোগের কোনো তদন্ত হয়নি। উল্টো ওই নারী কর্মকর্তাকে পবা থেকে পুঠিয়া উপজেলায় বদলি করে দেওয়া হয়।
জাহিদের আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন কর্মচারীরা। সমাজসেবা কার্যালয়ের অফিস সহকারী ইদ্রিস আলী কম্পিউটারের টুকটাক কাজ জানেন। তবে তিনি কম্পিউটারে কাজ জানেন না বলে অভিযোগ তোলেন জাহিদ হাসান। তিনি বাইরে থেকে এক কম্পিউটার অপারেটরকে আনেন। প্রতিমাসে ইদ্রিসের বেতন থেকে পাঁচ হাজার টাকা ওই কম্পিউটার অপারেটরকে দেয়া হয়। যদিও বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাননি অফিস সহকারী ইদ্রিস আলী।
জাহিদের দুর্ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে রবিউল ইসলাম নামের এক ইউনিয়ন সমাজকর্মী জেলা কার্যালয়ে চলে এসেছেন। নুরুজ্জামান নামের আরেক সমাজকর্মীও আছেন জেলা কার্যালয়ে। উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি করেছেন জাহিদ হাসান। তিনি দায়িত্বে থাকাকালে পবার দামকুড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পড়েছিল ইউএনও’র কাছে। ওই অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব পান সমাজসেবা কর্মকর্তা জাহিদ। তিনি চেয়ারম্যানের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে তার পক্ষে প্রতিবেদন দেন। চেয়ারম্যান রফিকুল আত্মগোপনে থাকায় এ নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলা যায়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাহিদ কট্টর আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তা। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজশাহী-৩ আসনের তৎকালীন এমপি আয়েন উদ্দিনের কথায় তিনি সরকারি বিভিন্ন উপকারভোগীদের নিয়ে ইউনিয়নে ইউনিয়নে সমাবেশের আয়োজন করেন। ওই সমাবেশে আয়েন উপস্থিত থাকতেন এবং সবাইকে নৌকায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাতেন। সমাবেশগুলোতে জাহিদ হাসান বলতেন, এবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ভাতা দ্বিগুণ হয়ে যাবে।
জাহিদ হাসানের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার শরীফ বাড়ি। এ গ্রামে জাহিদ হাসান ফাতেমা ফাউন্ডেশন নামে একটি সংগঠন করেছেন। গত ২ মার্চ এলাকার ২০ জন ব্যক্তি টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসকের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দেন। এতে উল্লেখ করা হয়, সরকারি রাস্তা দখল করে ফাতেমা ফাউন্ডেশনের প্রধান ফটক নির্মাণ করা হয়েছে। ফাতেমা ফাউন্ডেশন আওয়ামী লীগের একটি সংগঠন এবং এর নেপথ্যে দলটির নেতা মাহাবুবুল আলম হানিফ আছেন বলেও এলাকাবাসীর ওই অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। জাহিদ হাসান এলাকায় মানুষের মাঝে আতঙ্ক তৈরি করে অরাজকতা করছেন বলেও এতে বলা হয়।
টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের শরীফ বাড়ি গ্রামের রাস্তার পাশেই একটি কংক্রিটের নেমপ্লেট। সেখানে লেখা, ‘জজ ম্যাজিস্ট্রেট বাড়ি’। বাড়ির সঙ্গেই ফাতেমা ফাউন্ডেশন। সেখানকার একটি ভিডিও পাওয়া গেছে। ভিডিওতে কয়েকটি ডাস্টবিন নজরে পড়েছে। এই ডাস্টবিনে লেখা রয়েছে পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার নাম। নওহাটা পৌরসভা সম্প্রতি ডাস্টবিন বিতরণ করেছে। ডাস্টবিন বিতরণ উপলক্ষে গঠিত কমিটির সভাপতি ছিলেন জাহিদ হাসান।
এই ডাস্টবিন জাহিদের গ্রামের বাড়ির ফাতেমা ফাউন্ডেশনে গেল কীভাবে জানতে চাইলে কমিটির সদস্য সচিব ও পৌরসভার মেডিকেল অফিসার ডা. ওয়ালিউল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা পবার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ডাস্টবিনগুলো বিতরণ করি। কমিটির সভাপতি জাহিদ হাসান তার কার্যালয়ের জন্য কয়েকটি ডাস্টবিন নেন। এছাড়া তিনি পবার একটি সংগঠনকে কয়েকটি ডাস্টবিন দেওয়ার জন্য চিঠি দেন। এই ডাস্টবিন তিনি লোক পাঠিয়ে নিয়েছেন। তারপর কী করেছেন বলতে পারব না। যদি তিনি গ্রামের বাড়ি নিয়ে যান, তাহলে এটা দুঃখজনক।’
ডাস্টবিনের বিষয়ে কথা বলতে ফাতেমা ফাউন্ডেশনের ফেসবুক পেইজে থাকা নম্বরে ফোন করা হলে কেউ ধরেননি। সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে বরখাস্ত হওয়া সমাজসেবা কর্মকর্তা জাহিদ হাসানকে ফোন করা হলে তিনিও ধরেননি। তাই এসব বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পৌরসভার প্রশাসক পবার ইউএনও আরাফাত আমান আজিজ বলেন, ‘এটা তিনি পারেন না। যদিও বিষয়টি আমার জানা নেই। কেউ অভিযোগ করলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জাহিদ হাসানের কর্মকাণ্ড নিয়ে জানতে চাইলে ইউএনও বলেন, ‘এই সমস্ত বিষয়গুলো এখন আসছে। আগে কেউ বলেনি। রিকশাচালককে মারধরের ঘটনায় জেলা প্রশাসক আমাকে তদন্ত করে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছেন। সুনির্দিষ্ট এই বিষয়টি তদন্তের জন্য আমি একটা কমিটি করে দিয়েছি। তদন্ত শেষে যথাসময়ে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।’
তুমুল বিতর্কিত কর্মকর্তা জাহিদ হাসানকে এখনও বাঁচানোর চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিভাগীয় সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক সৈয়দ মোস্তাক হাসান ও জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মনিরা খাতুন এবং রাজশাহী থেকে অধিদপ্তরে বদলি হওয়া কর্মকর্তা হাসিনা মমতাজ তাকে রক্ষায় নানাভাবে চেষ্টা করছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে মনিরা খাতুন ও হাসিনা মমতাজকে ফোন করা হলে তারা ধরেননি। বিভাগীয় পরিচালক সৈয়দ মোস্তাক হাসান বলেন, ‘গাড়ি ব্যবহারের ব্যাপারে আমি তাকে সতর্ক করেছিলাম।’ লিখিত অভিযোগেও ব্যবস্থা না নিয়ে জাহিদকে রক্ষার চেষ্টার প্রশ্ন কৌশলে এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সাক্ষাতে আসেন তখন কথা বলব। মোবাইলে না।’