বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
স্টাফ রিপোর্টার, বাগমারা: খালে বিলে মিলে বাগমারা। আর এই বাগমারার বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রায় শতাধিক বিল দখল করে শুরু হয়েছে পুকুর খননের মহোৎসব। বাগমারার ১৬টি ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটিতে রয়েছে বিশাল আকারের বিল। আর এই বিল দখল করে বর্তমানে শুরু হয়েছে পুকুর খনন। এসব খনন কাজে জড়িত রয়েছে ক্ষমতাধর স্থানীয় প্রভাবশালী মহল।
সরেজমিনে জানা গেছে, বাগমারার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে কমবেশি পুকুর খনন করা হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি পুকুর খনন করা হচ্ছে আউসপাড়া, শুভডাঙ্গা, গনিপুর, ঝিকরা ও বিহানালী ইউনিয়নে। এসব ইউনিয়নের অন্তত অর্ধশতাধিক স্পটে রাতের আঁধারে চলছে পুকুর খনন। আউসপাড়া ইউনিয়নের নিমাই বিলে একই স্টাইলে চলছে পুকুর খনন। এই বিলের চারিপাশের গ্রাম সারন্দি, কোন্দা, ধামিনকৌড়, খোদ্দকৌড়, গাঙ্গোপাড়া সহ ১০-১২ টি গ্রামের শতশত কৃষকের আবাদী ধানী জমি জোরপূর্বক দখল করে তিনটি স্পটে রাতের আধারে পুকুর খনন করছে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ছত্রছায়ার থাকা স্থানীয় প্রশাবশালী মহল।
একই ভাবে শুভডাঙ্গা ইউনিয়নের নিমাই বিল এলাকার ৪-৫ টি গ্রামের প্রায় ৭০ জন কৃষকের জমি জোরপূর্বক দখল করে পুকুর খনন করছে ওই ইউনিয়নের ক্ষমতাসীন ছত্রছায়ায় থাকা জাহাঙ্গীর হোসেন, খুরশেদ আলম, আব্দুল হাকিম, আব্দুল মকিম ও সাহেব আলীসহ ১০-১২ জনের একটি সিন্ডিকেট। তারা স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও কথিত কিছু সাংবাদ কর্মীকে ম্যানেজ করে রাতের আঁধারে খনন কাজ শুরু করেছে। এই বিলে অন্যায় ও জবর দখল করে অন্যের জমির উপর পুকুর খনন বন্ধ করার জন্য সম্প্রতি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে গ্রামবাসীরা অভিযোগ দায়ের করেছেন।
ভুক্তভোগি জমির মালিকরা জানান, তাদেরকে না জানিয়ে রাতের আঁধারে বিলে ভেকু নামিয়ে পুকুর খনন শুরু করেছে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল। এই প্রভাবশালী মহল কারা এমন প্রশ্নের জবাবে জমি মালিকরা জানান, তারা সবাই বিএনপির ছত্রছায়ায় থেকে স্থানীয় ভাবে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বেড়ায়। এর আগেও তারা বিএনপির পক্ষ থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্বাচন করেছে। তারা বিএনপির কিছু নেতার ইন্ধনেই সেখানে পুকুর খনন করছে দেদারছে।
একই ধারাবাহিকতায় মাড়িয়া ইউনিয়নের পিদ্দপাড়া গ্রামেও চলছে পুকুর খনন। এই গ্রামের বাসিন্দা জুয়েল রানা ও আমজাদ হোসেন মিলে সিন্ডিকেট তৈরি করে শুরু করেছে পুকুর খনন। এছাড়া গনিপুর ইউনিয়নের হাসনিপুর মৌজার চান্দেরআড়া গ্রামের রুস্তম আলী প্রায় ১২ বিঘা জমি দখল করে পুকুর খনন শুরু করেছেন।
গাঙ্গোপাড়া বানোইল বাজার সংলগ্ন এলাকায় সোহেল নামে স্থানীয় এক ক্যাডার ৪০ বিঘার পুকুর খনন শুরু করেছেন। এছাড়া তাহেরপুর এলাকার জামলই গ্রামের আলম হোসেন ১০ বিঘা তিন ফসলি জমিতে পুকুর খনন শুরু করেছেন।
অপর দিকে মোহনগঞ্জ হতে খড়খড়ি যাওয়ার পথে আনুলিয়া বিলে স্থানীয় রাসুর নেতৃত্বে শুরু হয়েছে ৫০ বিঘা জমির পুকুর খনন। এসব পুকুর খননে নেই কোন নীতমালা বা জমির শ্রেণি পরিবর্তন। খোদ বাগমারা থানার পাশেই চলছে পুকুর খনন। এখানে খাজাপাড়া এলাকার মনা একক নিয়ন্ত্রনে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে শুরু করেছে পুকুর খনন। বড়বিহানালী ইউনিয়নের বড়বিহানলী গ্রামের শরিফুল ও মুনছুর শুরু করেছে পুকুর খনন। অপর দিকে ঝিকরা ইউনিয়নের আংড়ার বিলে স্থানীয় উপজেলা পর্যায়ের এক বিএনপি নেতার মালিকানা দাবী করে প্রায় দেড়শ বিঘা জমিতে বিশাল আকারের দুইটি পুকুর খনন শুরু হয়েছে।
স্থানীয় ভুক্তভোগিরা বলছেন, বিগত ৫ আগষ্টের পর সারা দেশের ন্যায় বাগমারাতেই সার্বিক পট পরিবর্তন হয়েছে। আগে যে হারে আওয়ামী লীগের লোকজন দেদারছে পুকুর খনননের মহোৎসবে মেতে ওঠেছিল। এখন একই স্টাইলে পূর্বের ধারাবাহিকতায় শুরু করেছে পুকুর খনন।
এ দিকে পুকুর খনন বিষয়ে জানতে চেয়ে একাধিক খননকারীর ফোনে কল দেওয়া হলে তাদের অনেকেই এই প্রতিনিধিকে গালিগালাজ করে বলেন, যত পারেন লেখেন।
বাগমারায় পুকুর খনন সহ বিভিন্ন আরাজকতা বিষয়ে জানতে চাইলে বাগমারা কৃতি সন্তার আগামী সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশি বিশিষ্ট আইনজীবি ব্যারিস্টার সালেকুজ্জামান সাগর বলেন, দুর্বৃত্তায়ন, চাঁদাবাজি, দখলবাজি সহ সকল অপকর্মের জন্য রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও জবাবহিহীতার অভাব। বাগমারাতে স্বচ্ছ ধারার রাজনীতি আনতে হবে। এ জন্য আমুল পরিবর্তন দরকার। এছাড়া এভাবে যত্রতত্র পুকুর খননের ফলে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ মারাত্বক হুমকির মুখে পড়বে। আচিরেই আমাদের এই প্রবনতা বন্ধ করতে হবে। এ জন্য প্রশাসন ও রাজনীতিবিদদের এগিয়ে আসতে হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব অধ্যাপক কামাল হোসেন বলেন, পুকুর খনন সহ দখলবাজি চাঁদাবাজি যে কোন অপকর্মের কারণে যা দলের ভাবমূর্তিকে ক্ষুন্ন করে এমন কোন কাজে মূল দল বা অঙ্গসহযোগি সংগঠনের কোন নেতা কর্মী জড়িত থাকলে প্রমান সহ তাদেরকে চিহ্নিত করে দল থেকে আজীবনের জন্য বহিস্কারের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আমরা তারেক রহমানের নির্দেশনা বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহবুবুল ইসলাম জানান, আমরা পুকুর খনন বন্ধ করতে ব্যাপক তৎপর রয়েছি। বেশ কিছু অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এখনও অভিযান চলমান রয়েছে। তারপরও ঠেকানো যাচ্ছে না পুকুর খনন। খননকারীরা রাতে এই কাজ করছে। অচিরে এটাও বন্ধ করা হবে।