বাঘায় হ*ত্যা*র দায় স্বীকার করলেন ভাইরা, কারণ এনজিওর কিস্তি !

স্টাফ রিপোর্টার, বাঘা:

রাজশাহীর বাঘায় বাক প্রতিবন্ধী দিনমজুর আনিসুর রহমান (৪০)কে হ*ত্যা*র দায় স্বীকার করেছেন তার আপন ভাইরা রায়হান আলী (৪২)। হ*ত্যা*য় জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তারের পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি তার ভাইরাকে গ*লা কেটে হ*ত্যা*র স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।

 

গত শুক্রবার (২২ নভেম্বর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে তার নিজ এলাকা মনিগ্রামের জনৈক বজলু মাষ্টারের আম বাগানে এই হ*ত্যা*র ঘটনা ঘটে। তবে চিপ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলামের কাছে পরদিন বিকেলে তার ভাইরাকে হ*ত্যা*র প্রধান কারণ হিসাবে উল্লেখ করেছেন বিভিন্ন এনজিও থেকে একাধিক ঋণ গ্রহন এর পর কিস্তি দিতে না পারার অপারগতা।

 

হ*ত্যা*কারি রায়হান আলী বাঘা উপজেলার মনিগ্রাম ইউনিয়নের দেবত্ত বিনোদপুর গ্রামের মৃ*ত সাদেক আলীর ছেলে। অপর দিকে নি*হ*ত আনিসুর রহমানের বাড়ি একই উপজেলায় তুলশীপুর গ্রামে। তার পিতার নাম মৃ*ত শামসুল মোল্লা। আনিসুর শুক্রবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে মনিগ্রাম বাজারে যান ভায়রার কাছে কিস্তির টাকা নিতে। সেখান থেকে ফেরার পর নিখোঁজ হন তিনি। পরদিন পাশের গ্রামের একটি আমবাগানে গ*লা*কা*টা লা*শ পাওয়া যায় আনিসুরের।

 

পারিবারিক সুত্রে জানা যায়, দিনমজুর পাঁচ সদস্যের সংসার চালাতে হিমসিম খাওয়ার এক পর্যায় একাধিক এনজিও থেকে ঋণ গ্রহন করেন। এরপর আধাপাকা একটি বাড়ি তৈরি করেন। আবার কিছু টাকা তার ভাইরাকে ধার দেন। তিনি বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে সরকারি ভাবে ভাতাও পেতেন। অত:পর ধীরে ধীরে ঋণের কিস্তিও শোধ করছিলেন। সব মিলিয়ে সংসার চালাতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল তার।

 

এদিকে নি*হ*ত আনিসুর রহমানের স্ত্রী পারভীন বেগম জানান, তাঁর বোন সাথী বেগমের স্বামী রায়হান আলীর সংসার চালাতেও কষ্ট হচ্ছে দেখে বিভিন্ন এনজিও থেকে টাকা তুলে তার বোন জামাতাকে ধার দিয়ে ছিলেন। শুক্রবার বিকেলে রায়হানের কাছ থেকে কিস্তির সেই টাকা নিতে বাড়ি থেকে বের হয়ে মনিগ্রাম বাজারে যান স্বামী আনিসুর। পরে আর ঘরে ফেরেননি। পরদিন শনিবার সকালে মনিগ্রামের একটি আমবাগানে স্বামীর গ*লা-কা*টা লাশ পড়ে থাকার সংবাদ পান তিনি ও তার পরিবার।

 

পারভীন বেগমের ভাষ্য, স্বামী-স্ত্রীর যৌথ স্বাক্ষরে আশা এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন। মাসে পাঁচ হাজার টাকা কিস্তি ও এক হাজার টাকা ডিপিএস জমা দিতে হয়। মোট ১১ কিস্তিতে ঋণ শোধ করার কথা। মাত্র একটি কিস্তি শোধ করা হয়েছে। এ ছাড়া আইডিএফের কাছে তাঁর ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন । সেখানে সপ্তাহে ১ হাজার ৩০০ টাকা কিস্তি দিতে হয়। ৪৬ কিস্তির মধ্যে দুটি শোধ করা হয়েছে। এ ছাড়াও দিশা থেকে ঋণ নিয়েছেন ৬০ হাজার টাকা, এখানে ১ হাজার ৬০০ টাকা সাপ্তাহিক কিস্তি। ৪৬ কিস্তির মধ্যে ৩০ কিস্তি শোধ করেছেন। মাসে ৭ হাজার টাকা কিস্তিতে টিএমএসএস থেকে ৭০ হাজার টাকা ঋণ করেছেন। ১১ কিস্তির মধ্যে ৭টি বাকি। এর বাইরেও দুই মাস আগে ব্যুরো বাংলাদেশ থেকে ৬ মাস মেয়াদে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নেন। এই ঋণ সাত হাজার চাকা কিস্তি-সহ একবারেই শোধ করতে হবে। পারভীন বলেন, ব্র্যাক বাংলাদেশ থেকে মাসিক ৪ হাজার টাকা কিস্তিতে তারা ঋণ করেছেন ৪০ হাজার টাকা। ১১টি কিস্তির মধ্যে ৭-৮ কিস্তি দিয়েছেন।

 

পারভিন আরো জানান, ডাক নামে আরেকটি এনজিও থেকে মাসিক ৯ হাজার টাকা কিস্তিতে তাদের ঋণ নেওয়া আছে ৯০ হাজার টাকা। এর মধ্যে শোধ হয়েছে ৯ কিস্তি। এসব ঋণের মধ্যে আশা এনজিও এবং ব্যুরো বাংলাদেশ থেকে ঋণে নেওয়া টাকার কিস্তি নিজেরা চালাতেন। বাকি ৫টির টাকা তুলে রায়হান আলীকে দিয়েছেন। তিন বছর ধরে বিপুল অঙ্কের টাকা তুলে রায়হানকে দিয়েছেন। কিস্তি দিতেও হাল করেননি। কিন্ত হটাৎ কি ভাবে কি হয়ে গেল বুঝতে পারছি না।

তিনি কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, এখন বিপুল অঙ্কের টাকার কিস্তি ও সংসার খরচ কি ভাবে চালাবেন কীভাবে । ছেলে-মেয়ের দেখভাল কে করবেন ? কেইবা জোগাবে ঋণের কিস্তির টাকা ? এ নিয়ে এখন তিনি একেবারে দিশে হারা।

 

আনিসুর-পারভীন দম্পতির তিন সন্তান। বড় মেয়ে আল্পনার বিয়ে হয়েছিল। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর বাবার বাড়িতেই আছেন। ছোট মেয়ে মদিনার বয়স কেবল সাত বছর। সবার ছোট সোহাগ। তার বয়স মাত্র এক বছর। আনিসুরের মা সত্তরোর্ধ্ব আনজেরাকে কখনো বড় ছেলে আনিসুর কখনো তার ছোট ছেলে আনারুল দেখভাল করেন।

 

এ বিষয়ে আনিসুরের ছোট ভাই আনারুল ইসলাম ও চাচাতো ভাই কবি হাফিজুর রহমানের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, শুক্রবার রাত ১০ টায়ও যখন তিনি বাড়ি ফেরেননি, তখন বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ খবর নিয়ে কোথাও তাকে পাননি। তবে পরদিন শনিবার সকাল ৮টার দিকে জানতে পারেন, মনিগ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বজলু রহমানের আমবাগানে তার লা*শ পড়ে আছে। আত্মীয়স্বজন সেখানে গিয়ে শরীরের পোশাক দেখে তাঁকে শনাক্ত করেন। এরপর পুলিশ লা*শ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায়।

 

স্থানীয় লোকজন জানান, চারঘাট-বাঘা সড়কের পূর্বদিকে আনিসুরের বাড়ি। পথেই চায়ের দোকান রয়েছে বজলু মিয়ার। বাড়ি ফেরার পথে মাঝে মধ্যেই এখানে বসতেন আনিসুর। শুক্রবার রাত ৮টার দিকেও এসে ছিলেন। চা খেয়েছেন। কিন্তু পরে তাকে আর খুজে পাওয়া যাইনি।

 

বাঘা থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু সিদ্দিক বলেন, তিনি-সহ (চারঘাট-বাঘার) সার্কেল সিনিয়র এএসপি প্রণব কুমার ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও রায়হান এবং আনিসুরের স্ত্রীসহ চা দোকানীর সাথে কথা বলেন। পরবর্তীতে সিসি ফুটেজে রায়হানকে হ*ত্যা*র সাথে জড়িত থাকার সন্দেহ করা হয় তার ভাইরাকে। তবে ঘটনার একদিন পর শুক্রবার রাতে রায়হান আলীকে গ্রেপ্তার করলে সে তার ভায়রা আনিসুরকে হ*ত্যা*র দায় স্বীকার করেন। রায়হানের ধারনা, তার ভাইরাকে মেরে ফেললে আর কোন কিস্তি দেয়া লাগবে না।

 

এ বিষয়ে নিহত আনিসুরের স্ত্রী পারভিন জানান, তার স্বামীকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পোষ্টমর্টেম শেষে গ্রামের গোরস্থানে দাফন সম্পন্য করা হয়েছে। তিনি বাদী হয়ে বাঘা থানায় একটি হ*ত্যা মামরা দায়ের করেছে । যার সত্যতা নিশ্চিত করেন ওসি আবু সিদ্দিক।


প্রকাশিত: নভেম্বর ২৬, ২০২৪ | সময়: ৩:৩৪ অপরাহ্ণ | Daily Sunshine