সর্বশেষ সংবাদ :

নকল কীটনাশকে ঠকছে কৃষক

আসাদুজ্জামান মিঠু: বরেন্দ্র অঞ্চলে চলছে আমনের ভরা মৌসুম। ক্ষেতের ফসলে রোগ-বালাই দমনের অন্যতম কীটনাশক। ফসলের মোট খরচের বেশি অর্ধেকটাই যাই কীটনাশক প্রয়োগে। কষ্টের ফসল রক্ষায় বাড়িতে থাকা প্রয়োজনী জিনিস বিক্রি করে হলেও কীটনাশক প্রয়োগ করেন কৃষকেরা। বর্তমানে বাজারে বেশির ভাগ কীটনাশক প্রয়োগ করে পোকা দমন হচ্ছে বলে কৃষকদের অভিযোগ।
কীটনাশক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সিনজেন্টা, অটো, বায়া সহ, দেশের নামিদামি কীটনাশক কোম্পানী ব্যান্ডের মোড়কে এসব ভেজার কীটনাশক দেদারসে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এসব ভেজাল কীটনাশক চেনার কোন উপায় থাকেনা কৃষকের। এছাড়াও গ্রামের বেশি ভাগ কৃষক বাকিতে কীটনাশক কেনে থাকেন দোকানীর কাছে। এ সুযোগে কিছু অসাধু ডিলার নকল কীটনাশক হাতে ধরায় দিচ্ছেন কৃষকদের।
এলাকার সচেতন মহল বলছেন, বাজারে এসব ভেজাল কীটনাশক ক্ষেতে প্রয়োগ করে পোকা ও পচন দমন হচ্ছে না। তাতে কৃষকেরা যেমন আর্থিক ভাবে ক্ষতির মধ্যে পড়ছে তেমনি ফসলের উৎপাদনও কমে যাবে। আর কৃষকদের ক্ষতিতে ফেলে পকেট ভরছে অসাধু ডিলারা। তাই দ্রত ভেজার কীটনাশক প্রতিরোধে সরকারকে কার্যকারী পদক্ষেপ নিতে হবে কৃষকদে বাচাতে।
অনেকটা প্রকাশ্যে এসব ভেজাল কীটনাশক বিক্রি হলেও কৃষি বিভাগের সেভাবে তদারকি চোখে পড়ছেনা। বছরে কয়েকটি দায় সাড়া অভিযান চালায় কৃষি ভিাগের লোকজন। গত বছর রাজশাহীর মোহনপুর কেশরহাটে একটি নকল কীটনাশক কারখানায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমানে নামীদামি কোম্পানীর মোড়োকে নকল ও ভেজাল কীটনাশক জব্দ করেছিল কৃষি বিভাগের লোকজন।
এছাড়াও গোদাগাড়ী ও মুন্ডুমালা বাজারে নকল কীটনাশক বিক্রি দায়ে কয়েকটি দোকানীকে দায় সাড়া জরিপনা করা হয়েছিল। তবে চলতি বছর এসব ভেজাল কীটনাশকের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কৃষি বিভাগের অভিযান চোখে পড়েনি।
বর্তমানে আমনের ভরা মৌসুমে ক্ষেতে পচন ধরে বেশি। এ পচন দমনে বেশি কার্যকারী কীটনাশক হিসাবে কৃষকদের কাছে পরিচিত সিনজেন্টার ইমেষ্টারটপ। এ কীটনাশটি বেশি নকল ও ভেজাল পাওয়া যাচ্ছে বাজারে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব ভেজাল কীটনাশকের একাধিক কারখানা গড়ে উঠেছে রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট, স্যামপুর বাজার এবং নওগা ও বগুড়া জেলা। আর এসব ভেজার কারখানার সাব ডিলারদের হিসাবে পরিচিত বরেন্দ্র অঞ্চলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার জামতলা মোড়ের মেসার্স রাসেল ট্রেডাস আমনুরা বাজারের ভাই ভাই ট্রেডার্স রাজশাহীর মুন্ডুমালা বাজারে হাফিজ ট্রেডার্স জুমার পাড়ার হুমায়ন কবিরের কীটনাশক ডিলার সহ গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলার গ্রামের একাধিক কীটনাশক ডিলার এক প্রকার প্রকাশ্যে বিক্রি করছেন। এছাড়াও নাচোল নিয়ামতপুরসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে এসব ভেজাল কীটনাশক।
ভেজার কীটনাশকে শুধু যে কৃষক ও কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে তা নয়, সরকারও বঞ্চিত হচ্ছে বিপুল রাজস্ব থেকে। মূলত বাজারে তুলনামূলকভাবে দাম কিছুটা কম ও মোড়ক দেখে আসল না নকল চেনতে না পারাই কীটনাশকের কেনে থাকেন কৃষকেরা। যার ফলে রাজশাহী অঞ্চলের বাজার এখন ভেজাল কীটনাশকের ব্যবস্যা রমরমা।
তবে মাঠ পর্যায়ের একাধিক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা স্বীকার করছেন, কোম্পানীর কর্তৃতপত্র ছাড়াই যততত্র কীটনাশক বিক্রি করছেন অনেক অসাধু ডিলার। আর ভেজাল ও নকল কীটনাশকগুলো পরীক্ষা করা ল্যাব উপজেলা পর্যায়ে না থাকায় সহজে ধরা যাচ্ছে না বলে তারা দাবি করেছেন।
কৃষি অফিসের কীটনাশক লাইন্সেস ১৬টি শর্ত রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান শর্ত হলো লাইন্সেস প্রাপ্ত ডিলারেরা সরকারী অনুমোদিত কোম্পানীর কর্তৃত্বপত্র ছাড়া কীটনাশক বিক্রি করতে পারবেনা। আর যদি কেউ শর্ত ভঙ্গ করে তবে তার লাইন্সেস বাতিল বলে গণ্যহবে। কিন্ত এমন শর্ত মানছেনা স্বার্থান্বেষি ডিলারেরা। তারা কোম্পানীর কর্তৃতপত্র ছাড়াই বেশি লাভের আশায় নকল ও ভেজার কীটনাশক বিক্রিতে উৎসাহ হচ্ছে। আর এসব দোকানীর কাছে বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকেন কৃষি কর্মকর্তারা।
নাচোল উপজেলার বরেন্দা গ্রামের কৃষক জমসে আলী বলেন, এক সপ্তহ আগে মুণ্ডুমালা বাজারে সিনজেন্টার ডিলার নয়, এমন এক কীটনাশক দোকানে গিয়ে আমনে পচনের জন্য কীটনাশক চান। দোকানীরা সিনজেন্টার ইমেষ্টারটপ বড় বোতল ধরিয়ে দেন। বোতলে গায়ে ১৯৫০ টাকা দর দেয়া ছিল। তারা সাড়ে চারশ টাকা কমে ১৫০০ টাকা দিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। ক্ষেতে প্রয়োগ করে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বিষয়টি স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের জানানো হলেও কোন প্রতিকার পাওয়া যাইনি।
কীটনাশক কেনে এমন প্রতারণা শিকার শুধু নাচোল ও তানোর উপজেলার কৃষকেরাই নয়, রাজশাহীর গোদাগাড়ী সহ বরেন্দ্র অঞ্চলের হাজারা হাজার কৃষক এসব ভেজার ও নকল কীটনাশক কেনে প্রতিনিয়ত ঠকছে।
সিনজেন্টার কোম্পানীর চাঁপাই ও রাজশাহীর জেলা দায়িত্বে থাকা মার্কেটিং অফিসার মিজানুর রহমান বলেন, তাদের কোম্পানী দেশের এক নম্বর ব্যান্ড। এ ব্যান্ডের কীটনাশক নকল বাজারে পাওয়া যাচ্ছে বলে তারা প্রতিনিয়ত খবর পাচ্ছেন। তাদের কোম্পানীর ডিলার নয় এসব দোকানে সিনজেন্টার মোড়োকে নকল কীটনাশক দেখেও প্রশাসনিক ক্ষমতা না থাকায় তারা কোন ব্যবস্থা নিয়ে পারেনা। বিষয়টি স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয় ভেজাল বিরোধী অভিযান করার জন্য। কিন্ত কোন ফল পাওয়া যায়না।
তানোর উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রাজিউল হক বাজারে নকল ও ভেজার কীটনাশক পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন,এসব ভেজার কীটনাশক গুলো পরীক্ষা করা কোন ল্যাব উপজেলা পর্যায়ে নেই। এমন ভাবে এগুলো প্যাকেটজাত হয়ে থাকে, ব্যান্ডের মোড়ক দেখে চেনার উপায় থাকে না এগুলো নকল না আসল। তবে কৃষকেরা এসব কীটনাশক ব্যাবহার করে কোন কাজে আসছেনা বলে ভরি ভরি অভিযোগ রয়েছে।
আমরা বিষয়গুলো উর্দ্ধত কর্মকর্তাদের কাছে জানানো গয়েছে।


প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৪ | সময়: ৬:১৮ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ