সর্বশেষ সংবাদ :

পদ্মার বুকে বর্ষার ঢেউ, শুষ্ক মৌসুমে ধু-ধু চর: গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ডিসেম্বরে

সবুজ ইসলাম: বর্ষায় পদ্মা ফুলে-ফেঁপে ওঠে। তীরের মানুষ ঘরবাড়ি, ফসল আর গবাদিপশু নিয়ে ছোটেন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। কিন্তু কয়েক মাস পরই পাল্টে যায় দৃশ্যপট। সেই পদ্মার বুকজুড়ে জেগে ওঠে বিস্তীর্ণ বালুচর। শুকিয়ে যায় শাখা নদীগুলোর অংশ। বর্ষা মৌসুমে একদিকে বন্যার শঙ্কা, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট—পদ্মার এই বৈপরীত্য বছরের পর বছর ভোগাচ্ছে নদী তীরের মানুষকে।
এর মধ্যেই নতুন করে সামনে এসেছে গঙ্গা-পদ্মার পানি বণ্টনের প্রশ্ন। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে চলতি বছরের ডিসেম্বরে। ফলে নতুন পানি বণ্টন কাঠামো, শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ এবং নদীর সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই দেশের আলোচনার গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
রাজশাহীর পদ্মার সাম্প্রতিক চিত্রও সংকটের দুই দিককে সামনে এনেছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি রাজশাহী পয়েন্টে নদীর পানি ১৭ দশমিক ৩০ মিটার পর্যন্ত উঠেছিল। বিপৎসীমা ১৮ দশমিক ০৫ মিটার। এতে চরখিদিরপুর, খানপুরসহ দক্ষিণ তীরের বিভিন্ন চরাঞ্চলের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। পানিবন্দি হয়ে পড়ে বহু পরিবার। কোথাও ঘরে পানি ঢুকে যায়, কোথাও গবাদিপশু নিয়ে নৌকায় আশ্রয় নিতে হয়। এই করুণ দৃশ্য নদীপাড়ের কয়েক হাজার মানুষের।
চলতি বর্ষা মৌসুমে গরু-ছাগল ও বিভিন্ন আসবাপত্র নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়েছিল বাসিন্দাদের। তার ভিতরে চরখিদিরপুরের বাসিন্দা রাকিব তার ৫০ টি গরুর ভিতরে ৪০ টি নিয়ে সে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে পেরেছিল। এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘চরে থাকার কোনো অবস্থা নেই। সব বাড়ি ডুবে গেছে। গরু নিয়ে বেরিয়ে এসেছি। খুব কষ্টের মধ্যে আছি।’
একই স্থানের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগমের বাড়িও পানিতে ডুবে গেছে। গবাদিপশু রাখার জায়গা নেই, রান্নারও সুযোগ নেই। তিনি বলেন,‘আমার সব ডুবে গেছে। শহরে জায়গা নেই। গরু-ছাগল রাখার জায়গা নেই। বর্ষা মৌসুম আসলেই আমরা বিপদে পড়ি।’
কয়েক মাসেই বদলে যায় নদীর চেহারাঃ
বর্ষার এই পদ্মাই শুষ্ক মৌসুমে হয়ে ওঠে একেবারে ভিন্ন। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় নদীর বুকজুড়ে দেখা যায় বিস্তীর্ণ বালুচর। কোথাও মূল প্রবাহ সংকুচিত হয়ে সরু ধারায় পরিণত হয়। কোথাও চর জেগে ওঠায় নৌযান চলাচল ব্যাহত হয়।
শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে কৃষিতে। সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ে। এতে বাড়ে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়, একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর তৈরি হয় অতিরিক্ত চাপ। নদীতে পানি কমে গেলে মাছের আবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
নদী গবেষকদের মতে, পদ্মার এই পরিবর্তনের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। উজানের পানিপ্রবাহ, পানি প্রত্যাহার, নদীতে পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়া, নদীর গতিপথের পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা—সবকিছুকেই বিবেচনায় নিতে হবে।
গোদাগাড়ী উপজেলার চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের বাসিন্দা মোকলেুসর রহমান বলেন,‘আমাদের এই নদীতে এখন যেমন দেখছেন ভর্তি পানি। আবার গ্রীষ্মের সময়ে নদীর দুপাশে চর পড়ে যায়। তখনও আমাদের সমস্যা হয়, আবার এই বর্ষা মৌসুমেও অতিরিক্ত পানিতে আমাদের সমস্যা হয়।’
রাজশাহীর নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, বর্ষায় অতিরিক্ত পানি আর শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। উজানে পানির প্রবাহ ও প্রত্যাহার, নদীতে পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়া, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহব্যবস্থায় পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং নদী ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।
আলোচনায় গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তিঃ
শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানিপ্রবাহের প্রসঙ্গ এলেই সামনে আসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা ব্যারাজ। ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর পর থেকেই গঙ্গার পানি প্রবাহ ও বাংলাদেশের পানিপ্রাপ্তি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ও মতবিরোধ রয়েছে।
এরপর ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত হয় গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি। ৩০ বছরের এই চুক্তিতে জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার পানির প্রাপ্যতার ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যে পানি বণ্টনের ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়। পানি প্রবাহ পর্যবেক্ষণ ও তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থাও রয়েছে এতে। চুক্তির ১২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, চুক্তিটি ৩০ বছর বহাল থাকবে এবং পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নবায়ন করা যাবে। ফলে ডিসেম্বরের পর কী ধরনের পানি বণ্টন কাঠামো তৈরি হবে, সেটি এখন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন আলোচনায় শুধু শুষ্ক মৌসুমে কত পানি পাওয়া যাবে—এ হিসাবের মধ্যে বিষয়টিকে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। নদীর পরিবেশগত প্রবাহ, কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, বন্যা ব্যবস্থাপনা এবং নদীনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ একই নদী বর্ষায় মানুষের জন্য হয়ে উঠছে আতঙ্কের, আবার শুষ্ক মৌসুমে সেই নদীর পানির জন্যই তৈরি হচ্ছে হাহাকার।
ফারাক্কা চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে হবে জানিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহমুদুর রহমান বলেন,‘আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের সাথে যে পানি চুক্তি ছিলো সেটি রিনিউ করে গ্যারান্টি ক্লোজ করতে হবে। বর্ষা মৌসুমে পানি ছাড়ার আগে ভারত যাতে আমাদের নোটিশ প্রদান করে সে বিষয়টিতেও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ আমাদের ছোট এই দেশের নিম্নাঞ্চল অতিরিক্ত পানিতে প্লাবিত হয়ে পড়ে। আবার গ্রীষ্ম মৌসুমেও যাতে আমরা প্রয়োজনীয় পানি পায় সেটিও নিশ্চয়তা করতে হবে উভয়ই দেশকে। আমাদের জন্য গঙ্গা বন্টন পানি চুক্তি অনেক গরুত্বপূর্ণ।’
রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন এবং নদীনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে পদ্মার পানিপ্রবাহ সরাসরি জড়িত। শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে গেলে যেমন কৃষি ও মৎস্য খাতে চাপ পড়ে, তেমনি বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ও পলি জমে বন্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই পদ্মার সংকটকে শুধু ‘পানির সংকট’ কিংবা শুধু ‘বন্যার সমস্যা’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। নদীর উজান-ভাটি, বর্ষা-শুষ্ক মৌসুম এবং পানি-পলি-পরিবেশ—সবকিছুকে একই ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে। ১৯৯৬ সালের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার বছরে বাংলাদেশের সামনে তাই শুধু একটি চুক্তি নবায়নের প্রশ্ন নয়; সামনে রয়েছে নদীর ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলছে ফারাক্কা চুক্তি নবায়ন হবে খুব শীঘ্রই। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর বলেন,‘মন্ত্রণালয়ে এই বিষয়ে মিটিং হয়েছে। আমাদের প্রস্তাবনাও দেওয়া আছে। আশা করছি খুব শীঘ্রই এই চুক্তি নবায়ন হবে।’


প্রকাশিত: September 28, 2026 | সময়: 6:43 am | সুমন শেখ