সর্বশেষ সংবাদ :

জেলা সদরে হাসপাতালগুলোতে ১০টি করে ডায়ালাইসিস বেড স্থাপন করা হবে : স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

নওগাঁ প্রতিনিধি: নওগাঁ জেলার বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন। রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় ২৫০ শয্যা নওগাঁ জেনারেল হাসপাতাল আকস্মিক পরিদর্শনে আসনে তিনি। পরিদর্শনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড, অপারেশন থিয়েটার, ফার্মেসী ও রান্নাঘর ঘুরে দেখে রোগীদের সাথে কথা বলেন। পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
পরিদর্শনে রোগীদের কাছ থেকে সার্বিক সেবার মান নিয়ে সন্তোষজনক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলেও, বেশ কিছু অনিয়ম ও সীমাবদ্ধতা মন্ত্রীর নজরে আসে।
মন্ত্রী জানান, ২৫০ শয্যার হাসপাতাল হলেও খাবার বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে ১০০ শয্যার। এই সংকট দূর করতে এবং খাবারের মান বাড়াতে বরাদ্দ প্রতি বেডে ১৭৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫০ টাকা করা হচ্ছে। এক চিকিৎসক ৪৫ মিনিট দেরিতে আসায় এবং এক নার্স বিনামূল্যে স্যালাইন থাকা সত্ত্বেও রোগীকে বাইরে থেকে কিনতে বলায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিগত ১৭ বছর এই খাতে কোনো জবাবদিহিতা ছিল না। আমরা মাত্র ৬ মাসে এই খাতে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা ফেরানোর কাজ শুরু করেছি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন বলেন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়াতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। ডায়ালাইসিস সুবিধা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছানো, শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি এবং চিকিৎসকদের তীব্র সংকট দূর করতে আড়াই হাজার নার্স ও আড়াই হাজার ফার্মাসিস্টসহ প্রায় ৯ হাজার ৫০০ নতুন জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ডায়ালাইসিস সেবার মান উন্নত করার মাধ্যমে বিশেষ করে ঢাকার ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দেশের প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০টি এবং জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে ১০টি করে ডায়ালাইসিস বেড স্থাপন করা হবে। ইতিমধ্যে মেশিন কেনার টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং আগামী তিন মাসের মধ্যেই জেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সেবা চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলা লেভেলে ৬০টি ডায়ালাইসিস মেশিন দৈনিক ৩ শিফটে প্রায় ১৮০ জন রোগীকে সেবা দিতে পারবে। এছাড়া, আগামী দুই বছরের মধ্যে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ১০টি করে ডায়ালাইসিস বেড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। হাসপাতালগুলোর পরিকাঠামো ও আধুনিকায়নে উপজেলা পর্যায়ে শয্যা সংখ্যা ৫০ থেকে বৃদ্ধি করে ১৫১ শয্যা করার সংশোধিত ডিপিপি (ডিপ্রোজেক্ট প্রোফাইল) অনুমোদন ও টেন্ডারের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। প্রতিটি ১৫১ শয্যার উপজেলা হাসপাতালে থাকছে প্রসূতিদের চিকিৎসায় ২৫টি শয্যা এবং শিশুদের জন্য আলাদা ২০টি বিশেষ শয্যা। নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা ফিজিওথেরাপি ওয়ার্ড এবং সমলিঙ্গের ফিজিওথেরাপিস্ট ও চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধান। আধুনিক আল্ট্রাসাউন্ড ও উন্নত প্যাথলজি ল্যাব সমৃদ্ধ ৯ তলা বিশিষ্ট নতুন ভবন। স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ‘জনবল সংকট’ নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, জনসেবা নিশ্চিত করতে খুব শিগগিরই ৫ হাজার নতুন চিকিৎসক নিয়োগের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। পাশাপাশি পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে আরও চিকিৎসক নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষা চলছে। নার্স ও ফার্মাসিস্টসহ আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের স্বাস্থ্য খাত একটি বড় ও দক্ষ চিকিৎসাবহর পাবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়। প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর অনুমোদনহীন কার্যক্রম এবং অনিয়ম রোধে কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিতের তাগিদ দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, নিবন্ধনের শর্ত না মানলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও ডিসি-সিভিল সার্জনদের সমন্বয়ে দেশব্যাপী মোবাইল কোর্ট অভিযান জোরদার করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতকে আরও সুসংগঠিত ও আধুনিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি। এসময় নওগাঁ-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও হাসপাতাল ব্যবস্থ্যাপনা কমিটির সভাপতি জাহিদুল ইসলাম ধলু, জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম, ২৫০ শয্যা নওগাঁ জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা: আঃ মঃ আখতারুজ্জামান, সিভিল সার্জন ডা: মো. আমিনুল ইসলাম ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়ব্রত পালসহ স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বদলগাছী: বদলগাছী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আকস্মিক পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী। রোববার দুপুরে হঠাৎ হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাসেবা, ওষুধের মজুত, রোগীদের খাবার এবং হাসপাতালের পরিবেশের খোঁজখবর নেন তিনি। পরিদর্শনকালে পুরোনো ভবন ভেঙে নয়তলা নতুন ভবন নির্মাণ এবং হাসপাতালটি ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা দেন মন্ত্রী।

পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের মন্ত্রী বলেন, সরকার গঠনের পর থেকেই স্বাস্থ্যসেবাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেবার মান উন্নত করতে নিয়মিত বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শন করা হচ্ছে। প্রতিটি নাগরিকের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার চলতি বছরে আড়াই হাজার নার্স নিয়োগ দেবে। পাশাপাশি এ বছর ৪১ হাজার ৩৯০ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। তাঁরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দেবেন। প্রতিটি ইউনিয়নে স্বাস্থ্য হাব তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন মন্ত্রী। চিকিৎসাসেবা নিয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা জানতে চান। পরে তিনি বলেন, ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে রোগীদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাঁরা ভালো সেবা পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। তবে হাসপাতালের টয়লেট ও বাথরুম অপরিষ্কার বলেও মন্তব্য করেন তিনি। রোগীদের খাবারের মান দেখতে হাসপাতালের রান্নাঘরে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সেখানে রোগীদের জন্য রান্না করা খাবার নিজে পরীক্ষা করে দেখেন। তিনি বলেন, রোগীদের কী খাবার দেওয়া হচ্ছে, তা দেখতেই তিনি রান্নাঘরে গিয়ে খাবার পরীক্ষা করেছেন।
এদিকে হাসপাতালের ওষুধ সরবরাহ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন মন্ত্রী। তিনি জানান, রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যাজিথ্রোমাইসিন ওষুধ এক মাস ২৩ দিন ধরে দেওয়া হচ্ছে না। অথচ হাসপাতালের স্টোরে ওই ওষুধ মজুত রয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “স্টকে ওষুধ থাকার পরও কেন রোগীরা এক মাস ২৩ দিন ওষুধ পেলেন না, তা খতিয়ে দেখা হবে।” এ ঘটনায় হাসপাতালের স্টোরকিপারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, ঢাকায় গিয়ে বিষয়টি পর্যালোচনা করে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা সাংবাদিকদের জানানো হবে।পুরোনো ভবন ভেঙে নতুন নয়তলা ভবন নির্মাণ এবং হাসপাতালটি ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণায় স্থানীয়দের মধ্যে আশার সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে মজুত থাকা ওষুধ রোগীদের না দেওয়ার ঘটনায় মন্ত্রীর কঠোর অবস্থানকেও ইতিবাচকভাবে দেখছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা। এ সময় নওগাঁর সিভিল সার্জন ডা. মো. আমিনুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়ব্রত পাল, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান ছনি, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কানিস ফারহানা, উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি জাকির হোসেন চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক রবিউল হাসানসহ স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কালাই: জয়পুরহাটের কালাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন। রবিবার বিকেল পাঁচ ঘটিকায় হঠাৎ কালাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিনি হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম, রোগীদের সেবার মান ও সার্বিক পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সরকার কাজ করছে। প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে ১০১ শয্যাবিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে কিডনি ডায়ালাইসিসের জন্য ১০টি শয্যার ব্যবস্থা করা হবে। এতে কিডনি রোগীদের মাসের পর মাস ডায়ালাইসিসের জন্য সিরিয়ারে অপেক্ষা করতে হবে না।
তিনি আরও বলেন, উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষ নিজ এলাকার কাছেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা পাবেন। পরিদর্শনের সময় মন্ত্রী হাসপাতালের ভর্তি রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তারা যথাযথ চিকিৎসা ও ওষুধসহ প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন কি না, সে বিষয়ে খোঁজখবর নেন। তিনি হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্টাফদের সঙ্গেও কথা বলে তাদের বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে অবগত হন। এ সময় জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলায় অবস্থিত মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল (মেটস) ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম পুনরায় চালুর বিষয়েও ভাবনাচিন্তার কথা জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
পরিদর্শনকালে তিনি জয়পুরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারীকে ফোন করে জয়পুরহাটে সম্ভাব্য মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা করেন। তিনি জানান, জয়পুরহাটে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালের সার্বিক পরিস্থিতি দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন। পরিদর্শনকালে জয়পুরহাটের জেলা প্রশাসক, জেলা সিভিল সার্জন, কালাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)সহ জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


প্রকাশিত: August 24, 2026 | সময়: 4:45 am | সুমন শেখ