সর্বশেষ সংবাদ :

বাঘার গ্রামগুলোতে দিনে রাতে ১২-১৪ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না !

স্টাফ রিপোর্টার,বাঘা :
এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে পরের দুই ঘণ্টা নেই। কখনো টানা তিন-চার ঘণ্টা, আবার কখনো তারও বেশি সময় বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে। দিনে-রাতে মিলিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গড়ে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না-এমন অভিযোগ রাজশাহীর বাঘা উপজেলার দুই পৌর সভা এবং সাত ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দাদের। দীর্ঘ এই লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন কৃষক, ভ্যানচালক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও পোল্ট্রি খামারিরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহে স্পষ্ট বৈষম্য লক্ষনীয় !

 

গ্রাম বাসিন্দাদের ভাষ্য, শহরে তুলনামূলক স্বস্তি , গ্রামে লোডশেডিংয়ে নাকাল মানুষ । ব্যাহত হচ্ছে কৃষি,ব্যবসা বানিজ্য, পড়াশোনা, খামারে মরছে মুরগি। আর সব চেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ব্যাটারি চালিত রিকশা ও ভ্যান চালকরা। তারা বলছেন, বিদ্যুৎ সরবরাহের এমন অনিয়ম এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিনের পাশাপাশি রাতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। গরমে ঘরে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে, ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা। একই সঙ্গে কৃষিজমিতে সেচ, ব্যাটারিচালিত ভ্যানের চার্জ এবং পোল্ট্রি খামারের কার্যক্রমেও দেখা দিয়েছে বড় ধরনের সংকট।

 

 

বাঘা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দারা জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহের পর দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এভাবে দিনের পর দিন কাটছে তাদের। বিশেষ করে রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু, বয়স্ক ও শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট একেবারে হচ্ছে না-এমন নয়। তবে গ্রামাঞ্চলের তুলনায় সেখানে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অনেক কম। ফলে একই উপজেলার মানুষের মধ্যে বিদ্যুৎ পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়েছে। ব্যাটারি চার্জ দিতে না পেরে আয় কমেছে ভ্যানচালকদের। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে এখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ব্যাটারিচালিত ভ্যানচালকরা ।

 

 

উপজেলার এক ভ্যানচালক বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় সময়মতো ব্যাটারি চার্জ দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে ভ্যান নিয়ে নিয়মিত বের হতে পারছেন না তারা। এতে দৈনিক আয় কমে গেছে। সংসারের খরচ চালাতেও কষ্ট হচ্ছে। ওই ভ্যানচালকের ভাষ্য, বিদ্যুৎ না থাকলে আমাদের আয়ও বন্ধ থাকে। ব্যাটারি চার্জ না হলে ভ্যান চালাব কীভাবে ? এভাবে চলতে থাকলে নিম্নআয়ের মানুষের কষ্ট আরও বাড়বে। এমনকি দেশে সন্ধ্যার পর আইন শৃঙ্খলারও অবনতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ।

সেচ নিয়ে শঙ্কায় কৃষক :
বাঘার পদ্মার চরাঞ্চলের কৃষকদেরও দুর্ভোগ বেড়েছে বিদ্যুৎ সংকটে। এক কৃষক জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় বৈদ্যুতিক সেচযন্ত্র চালাতে পারছেন না তারা। ফলে প্রয়োজনের সময় জমিতে পানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

কৃষকদের আশঙ্কা, সময়মতো সেচ দিতে না পারলে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হবে। এতে একদিকে উৎপাদন কমবে, অন্যদিকে বাড়বে কৃষকের আর্থিক ক্ষতি। দীর্ঘদিন এ পরিস্থিতি চললে কৃষকরা বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়বেন বলেও মন্তব্য করেন তারা।

বিদ্যুৎ না থাকায় মুরগি মারা যাওয়ার অভিযোগ :
লোডশেডিংয়ের কারণে পোলট্রি খামারেও দেখা দিয়েছে বিপর্যয়। উপজেলার সরেরহাট গ্রামের সোহাগ জানান, তাঁর ব্রয়লার খামারে একটানা প্রায় চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় প্রায় দুই শতাধিক মুরগি মারা গেছে। সোহাগের দাবি, শুধু তাঁর খামার নয়, উপজেলার অনেক পোলট্রি খামারেই একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় খামারে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে। এতে খামারিদের বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে।

পড়াশোনায় ব্যাহত শিক্ষার্থীরা :
দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে পড়াশোনা নিয়েও উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থীরা। স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। গরমের মধ্যে ফ্যান ছাড়া ঘরে বসে পড়াশোনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এ ছাড়া মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিভাইস চার্জ দিতে না পারায় ইন্টারনেট ব্যবহারেও সমস্যা হচ্ছে। আর এ সকল সমস্যার কারনে তাদের কুপ অথবা হারিকেন জালিয়ে পড়া-শোনা করতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকটের পাশাপাশি বিদ্যুতের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পরিবারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।

শহরে আলো , গ্রামে অন্ধকার :
উপজেলার সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে গ্রাম ও শহরের মধ্যে বৈষম্য দূর করা জরুরি। তাদের দাবি, রাজধানী ঢাকা-সহ প্রতিটা শহরাঞ্চলে সন্ধ্যার পর সড়কের দুই পাশে আলোকসজ্জা দেখা গেলেও গ্রামের মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন অন্ধকারে থাকতে হচ্ছে।

 

একজন সচেতন নাগরিক বলেন, শহরে মানুষ যদি দুই-তিন ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের মধ্যে থাকে, তাহলে গ্রামের মানুষকে কেন ১২-১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হবে ? একই দেশের, মানুষ হয়েও বিদ্যুৎ পাওয়ার ক্ষেত্রে এমন পার্থক্য গ্রহণযোগ্য নয় ! তাদের অভিযোগ, দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে ইতোমধ্যে অনেক মানুষ কর্মঘণ্টা হারাচ্ছেন। কৃষি, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও পোল্ট্রি খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে স্থানীয় অর্থনীতিতে এর আরও বড় প্রভাব পড়তে পারে।

দ্রুত সমাধানের দাবি :
স্থানীয় বাসিন্দারা বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি এবং গ্রামাঞ্চলে সুষম বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে লোডশেডিংয়ের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা। তাদের দাবি, শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহের সময় বাড়ালেই হবে না, গ্রাম ও শহরের মধ্যে বিদ্যুৎ বিতরণে বৈষম্য থাকলে তা চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদি লোডশেডিংয়ের কারণে কৃষি, শিক্ষা, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবন-জীবিকায় আরও বড় সংকট তৈরি হতে পারে।

চাহিদার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ বরাদ্দ :
গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের অভিযোগের বিষয়ে বাঘা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মনিরুজ্জামান বলেন, বাঘা ও আড়ানী পৌরসভা-সহ সাত ইউনিয়ন মিলে অত্র এলাকায় যে পরিমান চাহিদা তার অর্ধেকও মিলছেনা। ফলে বিদ্যুতের এই ঘাটতি।

নুরুজ্জামান /শামি


প্রকাশিত: August 10, 2026 | সময়: 10:42 pm | Daily Sunshine

আরও খবর