বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
আসাদুজ্জামান মিঠু, তানোর: আমন উঠার পর বরেন্দ্র অঞ্চলের পতিত জমিতেই (রবিসশ্য) সরিষা-মসুর বোপন করেছিলেন কৃষকেরা। আর বোপন করা মসুরই এবার কৃষকের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন। চলতি বছর বরেন্দ্র অঞ্চলে মসুরের বাম্পার ফলন হচ্ছে। সেইসাথে বাজারে দামও ভাল।
রাজশাহী সহ বরেন্দ্র অঞ্চলে এখন মাঠে মাঠে ক্ষেত থেকে এখন সরিষা ও মুসুর (ডাল) তুলতে ও মাড়াইয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। অনেক এলাকায় ইতোমধ্যে সরিষা ও মসুর মাড়াই শেষ করে বোরো রোপন করছেন।
কৃষকেরা জানান, আমন ধান ওঠার পর বোরো ধান রোপনের আগ পর্যন্ত জমি ফাঁকা থাকে। সে সময় রবিসশ্য মৌসুম ধরা হয়ে থাকে। বাড়তি আয়ের উৎস হিসেবে সরিষার, মসুর আবাদ করে থাকেন কৃষকেরা।
এবছর একদিকে আবহাওয়া অনুকূল, মসুর চাষে কম খরচ, সেচ খরচ নাই এবং বাজার মূল্য ভালো থাকায় কৃষকেরা গত বছরের ন্যায় এবারও বেশিরভাগ জমিতে মসুর আবাদ করেছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে রাজশাহীতে চলতি মৌসুমে ২১ হাজার ২৫২ হেক্টর জমিতে সরিষা ও ২৪ হাজার ১৩০ হেক্টর জমিতে মসুর (ডাল) চাষ হয়েছে।
কৃষকরা বিভিন্ন জাতের মসুর ও সরিষা উৎপাদন করে থাকে। এর মধ্যে টরি-৭, বারি-৯ এবং হাইব্রিড সরিষা ও মসুর অন্যতম। অনুকূল আবহাওয়া, চাষে কম খরচ এবং বাজার মূল্য ভালো থাকায় কয়েক বছর থেকে কৃষকরা সরিষা ও মসুর চাষের দিকে ঝুঁকছেন।
রাজশাহীর তানোর উপজেলার পাঁচন্দর স্কুল পাড়া গ্রামের কৃষক রয়েল জানান, তিনি ৮ বিঘা অন্যের জমি বর্গা নিয়ে কয়েক বছর যাবত ধান চাষাবাদ করে আসছেন। তবে আগে কয়েক বছর মাহজনকে ধান পরিশোধ করার পরে তার ঘরে অল্পটায় ঘরে তুলতে পেরেছেন। ফলন কম ও ধানের দাম না থাকায় তার লোকসান গুনতে হয়েছিল।
কিন্ত চলতি বছর আমন উঠার মসুর (ডাল) চাষাবাদ করেছেন। তার ৮ বিঘা জমিতে এবার ৭২ মণ মসুর পেয়েছে। বর্তমানের প্রতিমণ (৪০) কেজি মসুরের বাজার মূল্য তিন হাজার ৩০০ টাকার উপরে। এতে করে তার কয়েক বছরের ধানের লোকসান কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে বলে জানান তিনি।
গোদাগাড়ী উপজেলার চানন্দলায় গ্রামের কৃষক তসিকুল ইসলাম জানান, গতবছর তিনি ৩ বিঘা জমিতে মসুর চাষ করে ভালো দামে তা বিক্রি করেছিলেন। চলতি বছরও দাম ভালো পাওয়া যাবে এই আশায় ৫ বিঘা জমিতে বারি-১৪ জাতের মসুর চাষ করেছিলেন। আবহাওয়া অনূকূলে থাকায় এবারো ভালো ফলন হয়েছে।
তিনি আরো জানান, ৫ বিঘা জমিতে মসুর চাষ করতে বীজ, সার, চাষ, কৃষি শ্রমিক, সেচ সহ সব মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে ১৮ হাজার ৫০০ টাকা। আর ৫ বিঘা মসুর মাড়াই করে এবার ৪০ মণ মসুর ঘরে উঠেছে তার। বর্তমান প্রতিমণ মসুর বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৩০০ টাকা দরে। এ হিসাবে তার ৪০ মণ মসুরে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা মত। এত তার উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে ৫ বিঘা জমি থেকে শুধু মসুর বিক্রি করে বছরে আয় হতে পারে লাখ টাকার উপরে।
তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহম্মেদ জানান, অনুকূল আবহাওয়া থাকায় চলতি বছর বরেন্দ্র অঞ্চলের জেলাগুলোতে সরিষার, মসুর, মটর ও আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। মাঠে মাঠে ক্ষেত থেকে এখন সরিষা, মসুর তুলতে ও মাড়াইয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। বাজারে ভাল দামেও আছে।
কৃষি কর্মকর্তা আরো জানান, সেচ খরচ কমে অধিক ফসল ও লাভ হয় এমন সব রবিসশ্য চাষাবাদে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে কৃষকদের। সেই সঙ্গে এবার সরকারী ভাবে কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে সরিষা, মসুর, পিয়াজ সহ অনেক বীজ, সার প্রণোদনা হিসাবে বিতরণ করা হয়েছে।
এ কর্মকর্তা আরো জানান, সরিষায় চাষ লাভবান এবং উৎপাদিত সরিষায় স্থানীয়ভাবে ভোজ্য তেলের চাহিদা মেটাতে সাহায্য করছে এবং মসুর (ডাল) আমদানী উপর নির্ভর ছিল, এখানে উৎপাদন শুরু হওয়ায় সেটাই স্থানীয় ভাবে চাহিদা মিটাচ্ছে। সরিষার, মসুরের বাজার দর ভালো থাকলে কৃষকেরা অন্য ফসলের লোকসান কিছুটা হলেও পুষিয়ে নিতে পারবেন বলে জানান এই কর্মকর্তা।