বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীতে সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ চলে। দিনভর কোথাও বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় ভোটগ্রহণ কার্যক্রম।
সকালের দিকে কিছু কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকলেও সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোটারদের ভিড় বাড়তে থাকে। নারী ও প্রবীণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে ভোটকেন্দ্রে এসে লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। রাজশাহী বিভাগে ৫৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের মিডিয়া সেল। কমিশনার কার্যালয়ের তথ্য মতে বিকাল চারটা পর্যন্ত সর্বোচ্চ ভোট পড়েছে রাজশাহী জেলায়। জেলায় ভোট কাস্টের হার ৭০ দশমিক ৫৫ শতাংশ। অন্যদিকে নাটোর জেলায় সর্বনিম্ন ৫০ শতাংশ ভোট পড়েছে। বিভাগের অন্যান্য জেলার মধ্যে জয়পুরহাটে ৫৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫৫ শতাংশ, সিরাজগঞ্জে ৬১ দশমিক ০৮ শতাংশ, নওগাঁয় ৫২ দশমিক ৫০ শতাংশ, বগুড়ায় ৫৭ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং পাবনায় ৫৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ ভোট পড়েছে।
রাজশাহী জেলার মোট ছয়টি সংসদীয় আসনে ৭৭৮ টি ভোট কেন্দ্রে ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। আসনগুলোতে মোট ৩২ জন প্রার্থী থাকলেও কয়েকদিন আগে রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনের একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। ফলে ভোটের মাঠে ছিলেন ৩১ জন প্রার্থী। স্থানীয় ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সবকটি আসনেই বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীদের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে।
সারাদিন নির্বাচন সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্ন করতে নেয়া হয়েছিল ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। জেলা জুড়ে প্রায় ১৭ হাজার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন ছিল। এরমধ্যে ১০ হাজার ১শ ১৪ জন আনসার , ১ হাজার ১ শ ১০ জন সেনা সদস্য, জেলা পুলিশের ১ হাজার ৯শ ১৭ জন, আরএমপি’র ২ হাজার ৬৫ ও ১৪৭ জন র্যাব সদস্য নিয়োজিত আছে । এছাড়াও মোতায়েন রয়েছে ৩৮ প্লাটুন বিজিবি।
ভোট শুরুর পরে সকাল সাড়ে নয়টায় রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) সংসদীয় আসনের নওপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাঁধা দেওয়ায় বিএনপি প্রার্থী অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রেজাউল করিমের সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এছাড়াও একই আসনের বানেশ্বর ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ভোট কেন্দ্রের সামনে ভোটারদের টাকা দেওয়ায় সময় জামায়াত কর্মীকে ধাওয়া করে বিএনপি নেতাকর্মীরা।
এদিকে চারঘাট প্রতিনিধি মিজানুর রহমান মিজান জানান, সকাল থেকেই চারঘাটে নারী পুরুষ সমান তালেই ভীড় জমিয়েছিল ভোট কেন্দ্র। বিকেলে ভোট শেষ হলে জানা যায় এ কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা ৩৫৮৩ ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ২ হাজার ৮২৬ ভোট। ফলে ভোট বর্জনের কেন্দ্রে লেগেছিল ভোট উৎসবের আমেজ।
চারঘাট-বাঘা আসনে মোট চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মূলত বিএনপি প্রার্থী আবু সাইদ চাঁদের সঙ্গে মুলত লড়াই হচ্ছে জামায়াত প্রার্থী অধ্যক্ষ নাজমুল হকের মধ্যে। এদিন সকাল সাড়ে ৭টায় মাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রথম ভোটটি দেন আবু সাইদ চাঁদ। এরপর পরই দীর্ঘ লাইনে দাড়িয়ে ভোট দেন অন্য ভোটাররা। অন্যদিকে একই ইউনিয়নের শলুয়া ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে সকাল ১০ টায় ভোট দেন জামায়াত প্রার্থী নাজমুল হক।
শলুয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জিয়াউল হক জানান, মাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোটার ৩ হাজার ৫৮৩ জন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে ফ্যাসিস্ট সরকারের পররাষ্টট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার ক্ষমতা কালিন সময়ে বিএনপি সহ অনান্য দল ভোট বর্জন করলে একজন মানুষও ভোট দিতে আসছিল না কেউ। প্রশাসন সহ ফ্যাসিস্ট সরকারের সব ধরনের চালিকা শক্তি প্রয়োগ করেও কোন ভোটারকে দিয়ে একটি ভোটও দেযাতে পারেনি। ফলে ওই সময় সারা দেশে ব্যাপক আলোচিত হয় মাড়িযা সরকারী প্রাথীমক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রটি। এরপর থেকে এ অঞ্চলের মানুষ আর ভোট দেয়নি। তবে এবারের নির্বাচনে এই কেন্দ্রে দেখা গেছে ভোটাররা চরম উৎসাহ, উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে ভোট উৎসব করে ভোট দিয়েছেন। যার উদাহরণ এবারের ভোটে এ কেন্দ্রে ৩ হাজার ৫৮৩ ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ২ হাজার ৮২৬ জন।
ভোট দিতে আসা আব্দুল রফিক বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর মাড়িয়া গ্রামের মানুষ ভোট দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্র প্রািতমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ক্ষমতাকালিন সময়ে ২০১৪ সালে একেন্দ্রে একজন মানুষ আসেনি ভোট দিকে। সারা দেশের মধ্যে একটি ভোট কেন্দ্র মাড়িয়ায় কোন ভোট পড়েনি। কিন্তু এবার ভোট উৎসব চলছে। ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে উৎসবের আমেজেই ভোট তিয়েছেন ভোটাররা।
মাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের ভাষ্য, সকাল থেকেই ভোটারদের উপস্থিতি ছিল ব্যাপক। এই কেন্দ্রে ভোট দিয়ে বিএনপি প্রার্থী আবু সাইদ চাঁদ বলেন, এই গ্রামের মানুষ ভোট বর্জনের সধ্যে দিয়ে বয়কট করেছিল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে। তবে এবারের নির্বাচনে ভোরথেকে মানুষ এসে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়ে প্রমান করলো এ গ্রামের মানুষ শান্তিপ্রিয় মানুষ। এ কেন্দ্র ছাড়াও চারঘাট-বাঘা জুড়েই ছিল ভোট উৎসবের আমেজ। আমি শতভাগ আশা করি সর্বস্তরের মানুষের আস্থার প্রতীক হিসেবে বিপুল ভোটে জয়লাভ করবো ইনশাল্লাহ।
শলুয়া ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়ে জামায়াত প্রার্থী নাজমুল হক জানান, এবারের ভোট শান্তিপুর্ণ ভাবে ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোন ধরনের বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া যায়নি। তবে তিনিও শতভাগ আশা করছেন জয়ের ব্যাপারে।