বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
সবুজ ইসলাম: রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার প্রত্যন্ত থালতা গ্রামের যুবক জাহাঙ্গীর হোসেন। একসময় বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমিতে চাকরি করলেও সেই বেতনে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো। অনিশ্চিত চাকরির জীবন ছেড়ে ২০২১ সালে তিনি কৃষিকাজে মনোনিবেশ করেন। মাত্র ১০ কাঠা জমিতে পুদিনা পাতা চাষ দিয়ে শুরু হওয়া সেই যাত্রা আজ পাঁচ বছরে এসে বিস্তৃত হয়েছে ১২ থেকে ১৩ বিঘা জমিতে।
ধান বা গম নয়, জাহাঙ্গীর বেছে নিয়েছেন ভিন্ন স্বাদের বিদেশি সবজি। তাঁর জমিতে এখন চাষ হচ্ছে বিটরুট, পুদিনা পাতা, লেটুস, আইস লেটুস, থাই পাতা, চেরি টমেটো, রেড ক্যাবেজ, ক্যাপসিকাম ও বালচিং অনিয়নসহ নানা ধরনের চাইনিজ ভ্যারাইটি সবজি। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি প্রায় ১০ বিঘা জমিতে বিটরুট চাষ করছেন তিনি।
সরেজমিনে থালতা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, শীতের সকালের নরম রোদে মাঠজুড়ে কর্মচাঞ্চল্য। শ্রমিকরা মাটির নিচ থেকে তুলে আনছেন লালচে বিটরুট। পাশে বস্তায় ভরে রাখা হচ্ছে সবজি। একটু দূরে সারি সারি সবুজ পুদিনা পাতা, তার পাশেই নজর কাড়ছে লেটুসের সারি। বাতাসে ভেসে আসছে তাজা সবজির গন্ধ।
নিজের খামারে শ্রমিকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন জাহাঙ্গীর হোসেন। কখনো বিটরুট তোলার তদারকি করছেন, কখনো বস্তায় ভরছেন সবজি, আবার কখনো পুদিনা পাতার বস্তা ঠিক করছেন।
তার জমিতে কাজ করছিরেন কৃষক তৈয়বুর রহমান। তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এই ধরনের বিদেশি সবজি আগে এলাকায় কেউ চাষ করত না। জাহাঙ্গীরই প্রথম শুরু করেছে। এখন সে একাই ১০ বিঘা জমিতে বিটরুট চাষ করছে। এলাকায় সে একটা উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
নিজের সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “ধান-গমে কেজিতে দাম বাড়ে না, কিন্তু সবজিতে কেজিতেই লাভ। এই চিন্তা থেকেই ভিন্ন পথে হাঁটলাম।” তিনি জানান, শুরু থেকেই পবা উপজেলা কৃষি অফিস তাঁর পাশে রয়েছে। ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. জালাল উদ্দিন দেওয়ান নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। মো. জালাল উদ্দিন দেওয়ান এই বিষয়ে বলেন, “জাহাঙ্গীর খুব বিচক্ষণ কৃষক। তিনি বাজার বুঝে চাষ করেন এবং নিজেই বাজারজাত করেন। ধাপে ধাপে ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে তিনি নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন।”
সব ফসল একসঙ্গে বাজারে না এনে পর্যায়ক্রমে বাজারজাত করেন জাহাঙ্গীর। এ বছর ১০ বিঘা জমিতে বিটরুট চাষ করেছেন তিনি। কয়েক বিঘার বিটরুট আগেই তুলে বিক্রি করা হয়েছে। কোথাও এখন ফসল তোলার শেষ পর্যায়, কোথাও গাছ বড় হচ্ছে, আবার কোথাও সদ্য বীজ বপন করা হয়েছে।
জাহাঙ্গীর বলেন, “সব একসঙ্গে বাজারে আনলে দাম পাওয়া যায় না। তাই ধাপে ধাপে চাষ করি, যেন সবসময় কিছু না কিছু বাজারে থাকে।” বর্তমানে বিটরুটের পাইকারি দাম কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ টাকা। ভালো বাজার পেলে এক বিঘা জমি থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি সম্ভব। এতে জমি ভাড়া ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ব্যয় হয় ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া তিন বিঘা জমিতে পুদিনা পাতা চাষ করছেন তিনি। বর্ষাকালে এই ফসলের চাহিদা বেশি থাকে। কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, বগুড়া, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় বাসযোগে পুদিনা পাতা পাঠান জাহাঙ্গীর।
তিনি বলেন, “পুদিনা পাতা মূলত রেস্তোরাঁয় বিক্রি হয়। এই ফসলে খরচ কম, লাভ বেশি।” নিজের অর্জন নিয়ে আবেগপ্লুত হয়ে জাহাঙ্গীর বলেন,“একসময় আমি নিজেই পরাধীন ছিলাম, অন্যের চাকরি করতাম। আজ আমার কাজ দিয়ে পাঁচটা পরিবার চলছে এটাই আমার সবচেয়ে বড় সাফল্য।” ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে চাষাবাদ এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির স্বপ্ন দেখছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “কষ্টের কোনো বিকল্প নেই। মাটি ধরলে মাটি আপনাকে ফিরিয়ে দেবে এই বিশ্বাসেই সামনে এগোচ্ছি।”
জাহাঙ্গীরের এই যাত্রায় কৃষি অফিস তার সাথে আছে জানিয়ে পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এম. এ. মান্নান বলেন, “জাহাঙ্গীর একজন এ্যাডভান্স কৃষক। বাজারে যখন যে পণ্যের দাম থাকে তিনি তখন সেই চাষাবাদ শুরু করেন।
সে কিন্ত শিক্ষিত ও উদ্যোগী কৃষক। তিনি যে ফসলগুলো চাষ করছেন, সেগুলো লাভজনক ও ব্যতিক্রমী। আমরা নিয়মিত তাঁকে পরামর্শ ও সহযোগিতা দিচ্ছি। জাহাঙ্গীরের মতো উদ্যোক্তা বাড়লে কৃষি আরও আধুনিক ও লাভজনক হবে।”