বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার কাজীপাড়া এলাকায় রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তরা পরিকল্পিতভাবে কেটে ফেলেছে ১১৭টি উন্নত জাতের আমগাছ। বুধবার ভোরে সিন্দুর কুসুম্বী কাজীপাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের একটি আমবাগানে এ ঘটনা ঘটে। এতে দুই বছরের পরিশ্রম, স্বপ্ন ও বিনিয়োগ এক রাতেই হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন কৃষক সাইদুর রহমান। ঘটনাটি এলাকাজুড়ে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
ভোরের কুয়াশা ভেদ করে নিজের বাগানে পৌঁছে যে দৃশ্য দেখেন, তা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না সাইদুর রহমান। সারি সারি আমগাছ গোড়া থেকে কাটা, মাটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে ডালপালা ও পাতার স্তূপ। অনেক গাছের গায়ে তখনও নতুন মুকুলের কুড়ি ঝুলছিল, যা দেখে এবছর ভালো ফলনের আশা করেছিলেন তিনি। কিন্তু রাতের মধ্যেই সেই আশা নিষ্ঠুরভাবে ধ্বংস করে দেয় দুর্বৃত্তরা।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সাইদুর রহমান জানান, দুই বছর আগে সিন্দুর কুসুম্বী মৌজায় সাড়ে ১৫ শতক জমিতে তিনি ১৩৩টি উন্নত জাতের আমগাছ রোপণ করেন। বাগানে ছিল বারোমাসি জাতের পাশাপাশি কাটিমন, আম্রপালি, হাঁড়িভাঙ্গা, গৌড়মতি ও বারি-৪ জাতের আমগাছ। শুরু থেকেই নিয়মিত সেচ, সার প্রয়োগ ও রোগবালাই দমনে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। অনেক গাছে ইতোমধ্যে মুকুল আসায় এবছর ফল বিক্রি করে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির স্বপ্ন দেখছিলেন।
সাইদুর রহমান বলেন, “গতকালই আমগাছের সঙ্গে সাথি ফসল হিসেবে প্রায় ৬০ কেজি রসুনের বীজ লাগিয়েছিলাম। সব মিলিয়ে বড় পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ভোরে এসে দেখি সব শেষ। ১৩৩ গাছের মধ্যে ১১৭টি আম গাছ কেটে ফেলেছে দুর্বৃত্তরা। মনে হচ্ছে কেউ যেন আমার বুকের ভেতর ছুরি চালিয়েছে।” তার ভাষ্যমতে, গাছ, পরিচর্যা ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রায় তিন লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে ক্ষতির পরিমাণ শুধু আর্থিক নয়—দুই বছরের শ্রম, ভবিষ্যৎ আয়ের সম্ভাবনা ও পরিবারের জীবিকার নিশ্চয়তা একসঙ্গে ভেঙে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এলাকাটি তুলনামূলক নিরিবিলি হওয়ায় গভীর রাতে এ ধরনের নাশকতা চালানো দুর্বৃত্তদের জন্য সহজ হয়েছে। ভোরের দিকে খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের কৃষক ও এলাকাবাসী ঘটনাস্থলে ছুটে যান। স্থানীয় বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম জানান, গাছ অবুলা, গাছের সাথে শত্রুতা ঠিক না। তিনি দাবি করেন দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ ধরনের ঘটনা শুধু একজন কৃষকের ক্ষতি না; এটি এলাকার সামগ্রিকভাবে কৃষি উৎপাদন ও পরিবেশের ওপর ক্ষতি। কাজীপাড়া এলাকার কৃষক ইশা খান বলেন, “এটা নিছক দুষ্টুমি নয়, পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। একজন কৃষকের জীবনের সঙ্গে এমন আচরণ মেনে নেওয়া যায় না। আজ সাইদুর রহমান, কাল অন্য কেউ—এভাবে চলতে থাকলে কৃষিকাজে মানুষ আগ্রহ হারাবে।”
এ ঘটনার পেছনে পূর্বশত্রুতা, জমি সংক্রান্ত বিরোধ কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা। কেউ কেউ বলছেন, আমবাগানটি ভালোভাবে দাঁড়িয়ে যাওয়ায় ঈর্ষা থেকেই এ ঘটনা ঘটানো হতে পারে। তবে এখনো পর্যন্ত প্রকৃত কারণ জানা যায়নি।
ঘটনার পর ভুক্তভোগী কৃষক সাইদুর রহমান পবা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। এ বিষয়ে পবা থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই প্রতাপ কুমার বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রাথমিক তদন্ত করা হয়েছে। কে বা কারা কী উদ্দেশ্যে এই নাশকতা চালিয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পূর্বশত্রুতা, জমি বিরোধসহ সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে। দোষীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।