ফাঁসতে পারেন গোদাগাড়ী সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ

সাইফুল ইসলাম, গোদাগাড়ী: প্রতিষ্ঠান সরকারি, চাকরিও সরকারি। তারপরও নিয়ম ভেঙে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতির পদ নিয়েছিলেন রাজশাহীর গোদাগাড়ী সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মইনুল ইসলাম। দলীয় প্রভাব খাটিয়ে লুটপাট করেছেন লাখ লাখ টাকা। গেল বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর তিনি প্রায় তিন মাস ছিলেন আত্মগোপনে। এরপর আবার ফিরেছেন কলেজে। তবে শেষ রক্ষা হচ্ছে না। তাঁর ব্যাপারে তদন্ত শুরু করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর। তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে।
নথিপত্রে দেখা গেছে, অধ্যক্ষ মইনুল ইসলামের বিরুদ্ধে গত ১ জানুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ। এতে তাঁর অনিয়ম-দুর্নীতির ফিরিস্তি তুলে ধরা হয়। কমিশন এই অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য গত ২৫ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিবকে চিঠি দেয়। দুদকের এই চিঠির ভিত্তিতে ২৫ জুলাই মন্ত্রণালয় মাউশির মহাপরিচালক চিঠি দেয়। এতে অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয়।
এর ভিত্তিতে গত ৩১ জুলাই মাউশির সহকারী পরিচালক (কলেজ-২) ফজলুল হক মনি একটি তদন্ত কমিটি করে দেন। কমিটির প্রধান করা হয় বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক শওকত আলম মীরকে। এছাড়া কমিটিতে অধ্যাপক শওকত মনোনীত একই কলেজের দুজন শিক্ষককে রাখতে বলা হয়। কমিটিকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে মতামত সহ প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হয়। কমিটি ইতোমধ্যে সরেজমিন তদন্ত করেছে। তবে এখনও প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি। অধ্যক্ষ মাইনুল নানা তদবির করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, কলেজটি যখন বেসরকারি ছিল, তখন বিধিবহির্ভূতভাবেই অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন মইনুল ইসলাম। শিক্ষা জীবনে তিনি দুবার ফেল করে ১৯৯০ সালে উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ হন তৃতীয় বিভাগে। তৃতীয় বিভাগ তাঁর অযোগ্যতা হলেও দলীয় প্রভাবে তিনি নিয়োগ পান। তাকে অধ্যক্ষ নিয়োগ দিতে কলেজের ছয়জন সহকারী অধ্যাপককে উপেক্ষা করে বিধিবহির্ভূতভাবে ফরিদ আকতার নামের এক প্রভাষককে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দিয়েছিলেন এলাকার তৎকালীন এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী। মাইনুল ইসলাম তার হাতে ৩০ লাখ টাকার ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে নিয়োগ বাগিয়ে নিয়েছিলেন।
অভিযোগে বলা হয়, মইনুল ইসলাম বিধিবহির্ভুতভাবে সরকারি অধ্যক্ষ (উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ) বেতন গ্রেড-৫ এর পরিবর্তে বেতন গ্রেড-৪ গ্রহণ করেছেন। অথচ সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক ও কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা-২০১৮ এর বিধি ৯ অনুযায়ী ও বিধি ৫ এর উপবিধি (১) অনুযায়ী তার উচ্চতর বেতন গ্রেড-৪ পাওয়ার কোন সুযোগ নেই। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি চতুর্থ গ্রেড গ্রহণ করে প্রতিমাসে সরকারের প্রায় ১২ হাজার টাকা বাড়তি নিচ্ছেন।
মইনুল ইসলাম প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের নামে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে প্রায় ৫৫ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছেন। এই টাকা তিনি সাবেক এমপি ওমর ফারুক চৌধুরীকে নিয়ে ভাগ-বাঁটোয়ারা করেছেন। অধ্যক্ষ নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ও অনুদানের প্রায় ৪৫ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়ম করেছেন।
শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি, প্রসংশাপত্র ফি সংক্রান্ত অর্থ, আইসিটি সার্ভিস, কম্পিউটার সামগ্রী ক্রয়, মেরামত, আসবাবপত্র ক্রয় ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনাকাটা দেখিয়ে অনেক টাকা লোপাট করেছেন তিনি।
অভিযোগে বলা হয়, আইসিটি সার্ভিসের নামে প্রায় ৫ লাখ টাকা এবং কম্পিউটার সামগ্রী ক্রয় ও মেরামত, আসবাবপত্র ক্রয়, দৈনন্দিন ব্যবহার্য দ্রব্যাদি ক্রয়, ক্রীড়াসামগ্রী ক্রয় বাবদ পরিকল্পিত বিভিন্ন ভুয়া ভাউচার দিয়ে প্রায় ৮ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন অধ্যক্ষ। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে একবার ২৯ হাজার ৬১৮ টাকা পাঠালে অধ্যক্ষ এ অর্থ তুলে আত্মসাৎ করেছেন।
প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অডিট কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শারওয়ার জাহান চৌধুরী ৭ লাখ ৩৯ হাজার ৩৮০ টাকা আত্মসাৎ করেছিলেন। মাইনুল ইসলাম অধ্যক্ষ হওয়ার পর এমপির প্রভাব খাটিয়ে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ওই টাকা আদায় না করে তাকে দায়মুক্তি দেন।
অধ্যক্ষ মইনুল ইসলাম ফুলেফেঁপে উঠেছেন অনিয়ম ও দুর্নীতি করে। দুবছর আগে তিনি রাজশাহী শহরের ১৩ নম্বর ওয়ার্ড তেরখাদিয়া হাউজিংয়ে একটি বহুতল ভবনে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ের একটি অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ করেছেন।
অভিযোগে বলা হয়, মইনুল ইসলাম ২০১৭ সালের ৩১ জুলাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতির পদ নেন। পরে কলেজ সরকারিকরণ হলেও তিনি এ পদ ছাড়েননি। গতবছর পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। গত বছরের মে মাসে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি এমপি ফারুক চৌধুরীর পছন্দের প্রার্থী উপজেলা যুবলীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলমের পক্ষে দলীয় নির্বাচনী প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচনে প্রচারণার কার্যক্রম পরিচালনায় অংশগ্রহণ করেন।
তিনি জাহাঙ্গীর আলমের নির্বাচনি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি হিসেবে চরআষাড়িয়াদহ, বাসুদেবপুর ও মোহনপুর ইউনিয়নে কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এছাড়া সাবেক এমপি ফারুক চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে নানা রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে এসেছেন। কলেজকে বানিয়েছিলেন দলীয় কার্যালয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রায় ৮ বছর ধরে শিক্ষক-কর্মচারীদের সাথে অসাদাচরণ ও স্বজনপ্রীতি করে এসেছেন মইনুল ইসলাম। সাবেক এমপির প্রভাব খাটিয়ে প্রতিষ্ঠানে তিনি নিয়ম মেনে স্টাফ কাউন্সিল, একাডেমিক কাউন্সিল, ক্রয় কমিটি, আয়-ব্যয়ের হিসাব কমিটি ও অভ্যন্তরীণ অডিট কমিটি গঠন করেননি। কমিটিগুলো নিজের খেয়াল-খুশিমতো ৮ বছর ধরে গোপনীয়ভাবে গঠন করেছেন। ফলে গত ৮ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানে কোন অডিট করা হয়নি। এভাবে অনিয়ম লুকিয়ে রাখা হয়।
কলেজের শিক্ষার্থীরা জানান, গত বছরের জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন অধ্যক্ষ মইনুল ইসলাম। যে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে যেত, তাদের তালিকা করে রাখতেন তিনি। ৫ আগস্ট সরকারের পতন হলে তিনি আত্মগোপন করেছিলেন। এরপর ৩৪ দিন তিনি কলেজে আসেননি। পরে কাউকে কাউকে ম্যানেজ করে তিনি কলেজে এসেছেন।
কলেজের একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উপায়ে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক ও কর্মচারীদের ভয়-ভীতি দেখাতেন। তার আচার-ব্যবহারে শিক্ষক ও কর্মচারীরা অসন্তুষ্ট। তিনি কখনও কখনও অশালীন ভাষাও বলে এসেছেন। আওয়ামী লীগের পতনের পর তারা ভেবেছিলেন অধ্যক্ষকে অপসারণ করা হবে। কিন্তু তিনি বহাল তবিয়তে থেকে আগের মতোই আচরণ করে যাচ্ছেন।
তদন্তের অগ্রগতি জানতে চাইলে কমিটির প্রধান বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক শওকত আলম মীর বলেন, ‘আমরা কলেজে গিয়ে তদন্ত করে এসেছি। তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করব।’ তদন্তে কী পাওয়া গেছে সে বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে চাননি।
অভিযুক্ত অধ্যক্ষ ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মইনুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে খুদে বার্তা পাঠিয়েও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


প্রকাশিত: আগস্ট ৩১, ২০২৫ | সময়: ৪:০৭ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ