বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
স্টাফ রিপোর্টার, নওগাঁ ও রাণীনগর প্রতিনিধি: বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, কৃষক-শ্রমিক আন্দোলন ও প্রগতিশীল রাজনীতির অগ্রসেনানী, বীর মুক্তিযোদ্ধা জননেতা শেখ ওহিদুর রহমান আর নেই। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার ২৬ জুলাই সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বলে জানিয়েছেন তার ছেলে ওমর ফারুক সুমন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহী অঞ্চলের ‘ওহিদুর বাহিনীর’ প্রধান ছিলেন তিনি।
শেখ ওহিদুর রহমান ছিলেন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের রণাঙ্গনের অন্যতম সংগঠক। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটির’ একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে সশস্ত্র প্রতিরোধে অংশ নেন। ছাত্র রাজনীতি দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ১৯৬৫ সালে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজশাহী জেলা কমিটির কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হন।
তিনি ছিলেন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম নেতা এবং বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। অবিভক্ত রাজশাহী জেলার কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে জাতীয় কৃষক সমিতি ও বাংলাদেশ কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি এবং বাংলাদেশ আখ চাষী সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেন।
শেখ ওহিদুর রহমান ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে সংগঠনকে আরও সুসংগঠিত করেন। ১৯৮৯ সালে তিনি পার্টির নওগাঁ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় কমিটিতে কো-অপ্ট সদস্য হিসেবে যুক্ত হন।
মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহী অঞ্চলে দুই হাজারেরও বেশি মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে বিশাল এক বাহিনী গঠন করেছিলেন ওহিদুর রহমান। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সাফল্যের সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ওহিদুর বাহিনীর চলাচল ছিল জলপথে। ওয়াহিদুর রাহমান ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৬৭-৬৮ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নে মেনন গ্রুপের সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন। তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বাহিনীটি পরবর্তীকালে ওহিদুর বাহিনী নামে পরিচিতি পায়। রাজশাহী-নওগাঁর মানুষ তার নৌকার বহরকে বলতো ‘ওহিদুরের বায়ান্ন ডিঙ্গি’। মুক্তিযুদ্ধের সেপ্টেম্বর আত্রাইয়ের সাহাগোলা ব্রিজ ধ্বংস করেছিলেন ওহিদুর বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা। সেই অপারেশনে ১০৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। ১৯ সেপ্টেম্বর আত্রাইয়ের তারানগর বাউল্লায় পাকিস্তানি বাহিনীর একটি নৌকার বহরে অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে ১৫০ পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করেছিল ওহিদুর বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা।
সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধি হিসেবেও উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেন তিনি। ১৯৮৬ সালের তিনি তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নওগাঁ-৬ (আত্রাই-রানীনগর) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়া তিনি ১৯৯০ সালে আত্রাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৩ সালে শাহাগোলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন।
শেখ ওহিদুর রহমান ১৯৬৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯১ সালের ২১ জানুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিক ভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগ দেন।
জানাজা ও দাফন: শনিবার বাদ এশা নওগাঁ শহরের নওজোয়ান মাঠে মরহুমের প্রথম জানাজা এবং আজ রবিবার ২৭ জুলাই সকাল ১০টায় তাঁর নিজ বাড়ি আত্রাই উপজেলার রসুলপুর গ্রামে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।
জননেতা শেখ ওহিদুর রহমানের মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও সর্বস্তরের মানুষ তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন।