বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
সাইফুল ইসলাম, গোদাগাড়ী: কুরবানির ঈদ সামনে রেখে কামারদের ব্যস্ততা বেড়েছে। টুং টাং শব্দে মুখরিত কামারপাল্লি। শেষ সময়ে পশু কুরবানির জন্য প্রয়োজনীয় দা, ছুরি, বঁটি, চাপাতি সহ নানা সরঞ্জামের কদর বেড়েছে। গোদাগাড়ীর বিভিন্ন বাজার এমনকি পাড়া-মহল্লার দোকানে এসব পণ্য বিক্রি হচ্ছে। এগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন আকারের গাছের গুড়ির চাহিদাও বেড়েছে। এসব পণ্য কিনতে ক্রেতারা ভিড় করছেন।
কোরবানি মুসলিমদের আত্মত্যাগের অনন্য এক ইবাদত পবিত্র ঈদুল আজহা। এ সময় পশুর পাশাপাশি চাহিদা থাকে দা, ছুরি, বটি, চাকু, চাপাতি, কুড়াল সহ কোরবানির পশুর মাংস কাটার লোহার তৈরি বিভিন্ন সরঞ্জামের।
এবছরও পশুর মাংস কাটার সে চাহিদা পূরণে ব্যস্ততা বেড়েছে গোদাগাড়ী উপজেলার বিভিন্ন কামারপল্লিতে। গরম লোহাকে হাতুড়ি দিয়ে পেটানোয় দম ফেলার যেন সময় নেই এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগরদের।
গোদাগাড়ী সদরে রবিন কর্মকারসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্প্রিং লোহা ও কাঁচা লোহা দিয়ে উপকরণ তৈরি করা হয় এসব উপকরণ। স্প্রিং লোহা দিয়ে তৈরি উপকরণের মান ভালো, তবে দাম বেশি। আর কাঁচা লোহার তৈরি উপকরণের দাম কিছুটা কম। এছাড়া অ্যাঙ্গেল, রড, স্প্রিং, রেললাইনের লোহা, গাড়ির পাতগুলো দিয়েও দা, ছুরি, বঁটি তৈরি করে থাকি।
মানভেদে পশুর চামড়া ছাড়ানো ছুরি ১৫০ থেকে ৩৫০ টাকা, চাপাতি ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা, দা ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা, বটি ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা, পশু জবাইয়ের ছুরি ৫০০ থেকে ১৫শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
গোদাগাড়ীতে শতাধিক কামারের দোকান রয়েছে। মঙ্গলবার সকালে সরেজমিন বিভিন্ন দোকান ঘুরে দেখা গেছে ঈদকে সামনে রেখে কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটা কাজে ব্যবহৃত ছোট বড় আকারের চাপাতি, ছুরি, দা ও বটির পসরা সাজিয়েছেন দোকানিরা। দোকানগুলোতে বেশ ভিড়ও লক্ষ্য করা গেছে।
রেলওয়ে বাজারে বিকাশ নামের এক কর্মকার বলেন, আমার বাপ-দাদার আমল থেকেই শত বছরের বেশি সময় ধরে এ ব্যবসা করেন তারা। তিনি বলেন, কোরবানির পশু ও এসব আনুষাঙ্গিক জিনিস সাধারণত ঈদের ২-৩ দিন আগে থেকে শুরু হয়। ক্রেতাদের আনাগোনা বেড়েছে, তবে সামনে আরো বিক্রি বাড়বে। সব জিনিসপত্রে দাম বেড়ে যাওয়া শ্রমিকের পারিশ্রমিক বাড়লেও আগের দামে তারা বিক্রি করছে।
নিখিল নামের অপর দোকানি বলছেন, সারা বছরের তুলনায় বর্তমানে বিক্রি বেড়েছে, সামনে আরো বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জৈতগসায়ের কর্মকার প্রেম কুমার বলেন, বর্তমানে এ ব্যবসায় প্রতিযোগিতা বেড়েছে। এ ব্যবসায় অনেকেই আসছেন, যাদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। ফলে তারা বাজারকে কিছুটা কুলষিত করে তুলেছে। এতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে হিমসিম খাচ্ছেন।
এদিকে অনেকেই পুরাতন দা, বঁটি, চাপাতি, ছুরি যত্ন করে রেখেছিল। কোরবানি এলেই সেগুলো ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করে থাকেন। অনেক দিন রেখে দেয়ার কারণে সেগুলো মরিচা পড়ে ধার কমে যায়। তাই এগুলোকে ধার দেয়ার জন্য অনেকেই কাছাকাছি কামারের দোকানে ভিড় করছেন।
এ সময় ফেরি করে অনেক ফেরিওয়ালা দা, বটি, চাপাতি, ছুরি ধার দিয়ে থাকেন। পাড়া-মহল্লায় ফেরিওয়ালাদের হাকডাঁক শুনে তাদের কাছ থেকেও ধার দিয়ে নিচ্ছেন অনেকে। এদিকে যতই ঈদ দিন ঘনিয়ে আসছে, এগুলো ধার দেয়ার জন্য টাকার পরিমাণও বাড়ছে।
সোমবার সকালে রেলওয়ে বাজার কামার পল্লীতে গিয়ে দেখা যায়, হাপরের টানে কয়লার চুলায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। জ্বলে ওঠা আগুনের ফুলকিতে লোহাও যেন ধারণ করেছে সূর্যবর্ণ।
দগদগে গরম লোহায় দিনরাত হাতুড়ি পেটানোর টুং টাং শব্দে মুখর কামারপল্লির এলাকাগুলো। শহর থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যায়ে কামারপল্লিতে এখন এ শব্দে মুখর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেন ব্যস্ততাও বাড়ছে। কেউবা দা, ছুরি এবং বঁটিতে শান দিতে আবার কেউবা নতুন নতুন হাতিয়ার তৈরিতে ব্যস্ত।
গোদাগাড়ীর বাজার ঘুরে ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এ বছর ঈদ ঘিরে পশু জবাইয়ের ছুরি আকারভেদে বিক্রি হচ্ছে ৩০০-৮০০ টাকায়, পশুর চামড়া ছাড়ানোয় ব্যবহৃত ছুরি প্রতি পিস আকারভেদে বিক্রি হচ্ছে ১০০-২০০ টাকা। চাকু আকারভেদে ১৫০-২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভালো মানের বঁটি বিক্রি হচ্ছে ৭০০-১০০০ টাকা। এছাড়া ওজন অনুযায়ী প্রতি পিস চাপাতি বিক্রি হচ্ছে ৮০০-১২০০ টাকায়।
গোদাগাড়ী বাজারে আসা ক্রেতা ইব্রাহিম (৭০) বলেন, শেষ সময়ে কুরবানির সরঞ্জামের দাম বাড়িয়ে দেয় তাই আগেভাগে কিনতে এসেছি।
এদিকে কুরবানির পশুর মাংস কাটায় ব্যবহৃত গাছের গুঁড়ি বিক্রিও বেড়েছে। ছোট আকারের গাছের গুঁড়ি বিক্রি হচ্ছে ২০০-৩০০ টাকা। মাঝারি ৪০০-৫০০ টাকা ও বড় আকারের বিক্রি হচ্ছে ৬০০-৮০০ টাকা।
কাঁকনহাটে ব্যবসায়ীর কৃষ্ণা বলেন, ঈদের আগের দিন ও রাতে কুরবানির পশু বেশি কেনাবেচা হয়। আশা করি এবারও বিক্রি ভালো হবে।