সর্বশেষ সংবাদ :

বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি সংকট: এক প্রশিক্ষণই বদলে দিল কৃষক জাব্বারের জীবন

মেহেদী হাসান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ: বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি সংকটের সবচেয়ে ভুক্তভোগী কৃষকরা। সংকটের দরুন সময়মতো কৃষিজমিতে সেচ দিতে না পারার আক্ষেপে ভুগেন তারা। বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি সংকট মোকাবিলায় খরাসহিষ্ণু ফসল চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে কাজ করে যাচ্ছে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন। এই সংকট মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানটির স্মার্ট (সাসটেইনেবল মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট ট্রান্সফরমেশন) প্রকল্প বাস্তবায়নে চাঁপাইনবাবগঞ্জে কাজ করছে প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি।
এই স্মার্ট প্রকল্পের এক প্রশিক্ষণই বদলে দিয়েছে কৃষক মো. আব্দুল জাব্বারের জীবন। আব্দুল জাব্বার চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার কালুপুর এলাকার বরেন্দ্র অঞ্চলের একজন পরিশ্রমী ও উদ্যমী কৃষক। দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ১০ বিঘা জমিতে বিভিন্ন জাতের আমের পাশাপাশি মৌসুমি বিভিন্ন ফসলের চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কৃষিকাজে তার আগ্রহ ও অভিজ্ঞতা থাকলেও বরেন্দ্র অঞ্চলের তীব্র পানির সংকট এবং বিদ্যুৎ সুবিধার অনুপস্থিতি তার কৃষি উৎপাদনের অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা ছিল।
জব্বার সাহেবের আমবাগানটি এমন একটি এলাকায় অবস্থিত, যেখানে বিদ্যুতের কোনো সংযোগ নেই। ফলে বাগানে সেচ দেওয়ার জন্য তাকে দূরবর্তী একটি খাল থেকে ডিজেলচালিত শ্যালোমেশিনের সাহায্যে দীর্ঘ পাইপ ব্যবহার করে পানি সংগ্রহ করতে হতো। কিন্তু অনেক সময় প্রয়োজনমতো পানি পাওয়া যেত না। তাছাড়া এই পদ্ধতিতে সেচ দিতে অতিরিক্ত জ্বালানি, শ্রম ও সময় ব্যয় হওয়ায় উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেত। সময়মতো পর্যাপ্ত সেচ দিতে না পারায় আমের মুকুল ও গুটি ঝরে যেত, ফল ছোট হতো, গাছ দুর্বল হয়ে যেত এবং আমসহ অন্যান্য ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কাক্সিক্ষত আর্থিক লাভ থেকে তিনি বঞ্চিত হতেন।
এই অবস্থায় জানতে পারেন স্মার্ট প্রকল্পের কথা। সদস্যও হয়ে যান। এরপর তার গল্পই পাল্টে যায়। কৃষি কার্যক্রমে পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয় তার।
আব্দুল জাব্বার স্মার্ট প্রকল্পের আওতায় ক্লাইমেট ভালনারেবল আরইসিপি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন। এই প্রশিক্ষণ থেকেই তিনি জলবায়ু সহনশীল, সম্পদ-দক্ষ ও পরিবেশবান্ধব কৃষিপ্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান ও সচেতনতা অর্জন করেন। প্রকল্পের কারিগরি পরামর্শ ও উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে তিনি তার বাগানে আধুনিক সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থা স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য তিনি স্মার্ট প্রকল্প থেকে ৫ লাখ টাকার ঋণ নেন। এছাড়া অনুদান পান ৬০ হাজার টাকা। এসব অর্থ দিয়ে তিনি তার আমবাাগানে ৮ হাজার ৮০০ ওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ৫৫০ ওয়াটের ১৬টি সৌর প্যানেল, ৭.৫ হর্সপাওয়ারের পানির মোটর এবং ১৩০ অ্যাম্পিয়ার, ১২ ভোল্টের ব্যাটারি ব্যাকআপ সংযুক্ত আধুনিক সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থা স্থাপন করেন।
এই ব্যবস্থার ফলে বছরের প্রয়োজনীয় সময়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে বাগানে সেচ দিতে পারছেন আব্দুল জাব্বার। একই সঙ্গে ডিজেলের ব্যবহার ও সেচ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় তার উৎপাদন খরচ হ্রাস পেয়েছে এবং কৃষি কার্যক্রম থেকে তার লাভ আরো বেড়েছে।
বর্তমানে আব্দুল জব্বার শুধু নিজের জমিতে সেচ দিচ্ছেন না; আশপাশের কৃষকদের ৩০ বিঘা আমবাগান ও ২০ একর ধানের জমিতেও সৌরচালিত সেচসেবা দিচ্ছেন। ঘণ্টাপ্রতি ১২০ টাকা হারে সেচসেবা দিয়ে বছরে প্রায় ৫০ হাজার টাকা অতিরিক্ত আয় করছেন। একই সঙ্গে তার এলাকার আরো প্রায় ৩০ জন কৃষকের সেচ সংকট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
আব্দুল জব্বার বলেন, “স্মার্ট প্রকল্পের পাশাপাশি অন্যদের কাছ থেকে সহযোগিতা না পেলে এত বড় একটি উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা আমার জন্য অত্যন্ত কঠিন হতো। বর্তমানে আমি নিজে উপকৃত হওয়ার পাশাপাশি এলাকার অন্য কৃষকদেরও সেচসেবা দিতে পারছি।”
এ ধরনের সময়োপযোগী ও কৃষিবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণের জন্য পিকেএসএফ এবং প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
আব্দুল জাব্বারের মতে, এ ধরনের টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি উদ্যোগ দেশের প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে সম্প্রসারিত হলে কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


প্রকাশিত: October 29, 2026 | সময়: 5:02 am | সুমন শেখ

আরও খবর