সর্বশেষ সংবাদ :

পদ্মা ও তিস্তায় ব্যারেজ নির্মাণের ঘোষণা: ৩৮ হাজারের বেশি আখচাষি পেলো প্রণোদনা

সবুজ ইসলাম: রাজশাহী অঞ্চলের ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখচাষীর মাঝে ১২ কোটি প্রণোদনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার বিকালে রাজশাহীর হাজী মুহাম্মদ মহসীন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ( ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠ) আখচাষীদের প্রণোদনা প্রদান ও জনসভায় প্রধানমন্ত্রী কম্পিউটারে বোতাম টিপে এই অর্থ সংশ্লিষ্ট চাষীদের মোবাইল একাউন্টে প্রদান করেন।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন আমি কম্পিউটার একটা বোতাম চাপ দেব। চাপটা দেওয়ার সাথে সাথে কয়েক মিনিটের মধ্যে আখচাষী ভাইদের একাউন্টে সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া সহযোগিতা কয়েক মিনিটের মধ্যে ইনশাল্লাহ পৌঁছে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘সরকার আখচাষীদের সহযোগিতার জন্য মোট ১২ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। বরাদ্দের অর্থ ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখচাষীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। আমি আশা করছি কৃষকদের এ সহযোগিতা তাদের আখ চাষে সহায়তা করবে।’ প্রধানমন্ত্রী ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে কম্পিউটারের বোতাম চাপেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ সময় জনসভাস্থলে উপস্থিত হাজারো মানুষও সমস্বরে ‘বিসমিল্লাহ’ উচ্চারণ করে এবং উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। অনুষ্ঠানে ১৫ জন আখচাষীকে চেক প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী। এরা হলেন, আবু সাঈদ চান, আবদুল আউয়াল মালেক, আবদুল মান্নান মন্ডল, এমাজ উদ্দিন, মো. কাহার, গোলাম রাব্বানী, সবিতা রানী, জালাল উদ্দিন মৃধা, জিয়াউল হক, মহিদুল ইসলাম, আবদুল মাজেদ, নিরান্দ কুমার ঘোষ, শামীমুর রহমান, রীমা খাতুন ও রফিকুল ইসলাম।
পরে তিনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রদান করেন। তিনি বলেন, রাজশাহীতে যে পদ্মা নদী আছে, আমরা দেখেছি কিভাবে আমাদের এই পদ্মা নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। কিভাবে এই পদ্মা নদীর পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সেই জন্যেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিএনপি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে যে উত্তরাঞ্চলের তিস্তা ও রাজশাহীর পদ্মা নদীতে ব্যারেজ নির্মাণ করা হবে।”
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে রাজশাহীর মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত আখচাষিদের মাঝে প্রণোদনার অর্থ বিতরণ শেষে জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন,“এই যে দুটি নদীতে আমরা ব্যারেজ তৈরি করব, যাতে করে আমাদের পানির সমস্যা আমরা দূর করতে পারি। পানির সমস্যা যারা তৈরি করেছে, তাদের সাথে আমরা কথা বলব। দরকার হলে বাংলাদেশের মানুষের পানির হিস্যা আদায় করার জন্য যতদূর আমাদেরকে যেতে হবে আমরা চেষ্টা করবো ততদূর যেতে। বাংলাদেশের পানির হিস্যা আমরা নিয়ে আসবো এবং একই সাথে আমরা চেষ্টা করব যত দ্রুত সম্ভব হয় সেই সময়ের মধ্যে আমরা এই পদ্মা ব্যারেজ এবং তিস্তা ব্যারাজের কাজ শুরু করব এবং শেষ করব ইনশাআল্লাহ।”
একটি পক্ষ পাশ্ববর্তী দেশে পলাতক ফ্যাসিষ্টদের সাথে এক হয়ে দেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, “পাশ্ববর্তী দেশে পলাতক ফ্যাসিস্টদের কাছে একটি পক্ষ অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করছে। নির্বাচন আসার আগে যারা মিথ্যা কথা বলে বিভিন্ন টিকিট বিক্রি করার চেষ্টা করেছিল জনগণের কাছে, তারা এবং পলাতক ফ্যাসিস্ট এই দুই পক্ষ এক হয়েছে। একজন পয়সা দিচ্ছে সীমান্তের ওপার থেকে, আরেকজন এখানে বসে অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা করছে।”
জনগণকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আজ সময় এসেছে বাংলাদেশের জনগণকে সচেতন হবার। আমি আপনাদেরকে আহ্বান জানাই, আজ থেকেই আমাদেরকে সচেতন হতে হবে, যাতে কেউ বাংলাদেশে আর কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে। যাতে করে বাংলাদেশের যে অর্থনীতি, মানুষের যে অর্থনৈতিক অবস্থা, বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যের যে পরিবর্তন, সেটি পরিবর্তন করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, কাজ শুরু হয়েছে, এটিকে যাতে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে না পারে। দেশ বিরোধী সকল চক্রান্ত থেকে আপনারা সাবধানে এবং সর্তক থাকবেন।”
মেয়েদের স্নাতক পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থা বিনামূল্যে চালু করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, “এইযে মা-বোনেরা সামনে বসে আছেন, এই মা-বোনদেরকে শিক্ষিত করার জন্য দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিনামূল্যে তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। আপনাদের মনে আছে? বিএনপি খালেদা জিয়ার সরকার সেটি করেছে, ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা ব্যবস্থা ফ্রি করে দিয়েছিলেন। বর্তমান বিএনপি সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে এই মা-বোনদেরকে যাতে শিক্ষা কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়, সেইজন্য তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা অনার্স পর্যন্ত বিনামূল্যে করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। শুধু তাই নয়, এই মা-বোনদের মধ্যে যারা ভালো রেজাল্ট করবে, যেই মেয়েরা ভালো রেজাল্ট করবে, তাদেরকে আমরা সরকারের পক্ষ থেকে উপবৃত্তির ব্যবস্থা করব যাতে আমাদের দেশের নারীরা, আমাদের দেশের মেয়েরা আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে।
সরকার দেশের বন্ধ কল-কারখানা চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন,“আমরা চেষ্টা করছি কীভাবে বন্ধ কল-কারখানাগুলো চালু করা যায়। যারা বিদেশি উদ্যোক্তা আছে, তাদেরকে বিদেশ থেকে নিয়ে এসে উৎসাহ দিচ্ছি যে আপনারা আসেন, বাংলাদেশে আপনারা বিনিয়োগ করেন। বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার মাধ্যমে আপনারা বন্ধ মিল-কারখানাগুলোকে চালু করেন যাতে করে উৎপাদিত পণ্য বিদেশে যেতে পারে যাতে করে বাংলাদেশের বেকার শ্রমিকরা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে।
কিন্তু এই সকল কাজকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য আমরা দেখছি একটি দল উঠে-পড়ে লেগেছে এবং জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য তারা রাজপথে বিশৃঙ্খলা তৈরি করার চেষ্টা করছে। প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আমরা চাচ্ছি পাটকলগুলো চালু হোক, আমরা চাচ্ছি বিভিন্ন মিল-কারখানাগুলো চালু হোক, আমরা চাচ্ছি বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবাটা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হোক। কিন্তু কতগুলো রাজনৈতিক দল বিভ্রান্তি তৈরি করার মাধ্যমে জনগণের এই কাজগুলোকে, সরকারের এই কাজগুলোকে তারা স্লো করে দিতে চাইছে, দিন করে দিতে চাইছে। তাদের থেকে সাবধান থাকবেন।”
চলতি বছরেই ৪০ লাখ কৃষককে কৃষি কার্ড প্রদান করা হবে জানিয়ে বিএনপি প্রধান বলেন,“এই বছর সমগ্র বাংলাদেশে আমরা প্রান্তিক এবং ক্ষুদ্র কৃষক ভাই যারা আছেন তাদের ভেতরে চল্লিশ লক্ষ কৃষক ভাইয়ের কাছে আমরা কৃষি কার্ড ইনশাআল্লাহ পৌঁছে দিবই। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে আপনি সহজেই সেই ব্যাংক ঋণও গ্রহণ করতে পারবেন আপনার কাজের সুবিধার জন্য। এই কৃষক কার্ডের মাধ্যমে আপনার মোবাইল ফোন আপনি যদি জানতে চান, আপনি জানতে পারবেন যে আগামীকাল আপনার এখানে বৃষ্টি হবে কি হবে না। তারপরে আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন আপনি বীজ বপন করবেন নাকি সার দেবেন, কোন কাজটি আপনি করবেন আপনি জানবেন। এরকম প্রায় দশটি সুবিধা থাকবে সেই কৃষক কার্ডের।”
৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন,“শহীদ জিয়ার সময় খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। শুধু খাল খনন নয়, এই যে বরেন্দ্র—বরেন্দ্র প্রকল্প সবই শহীদ জিয়ার সময় কার্যকর হয়েছিল, এটা লাভ করেছিল। আমরা সেই জন্য বলেছিলাম, আমরা সরকার গঠন করলে কৃষক ভাইয়েরা যাতে সঠিকভাবে সেচ সুবিধা পায়, সঠিকভাবে যাতে পানি পায়, গ্রামের ভেতরে মা-বোনেরা যাতে দূর থেকে কষ্ট করে পানি আনতে না হয়, সেই জন্য সমগ্র দেশে আমরা আবার খাল খনন এবং নদী সংস্কার বা নদী খনন করব সেইটি শুরু করব এবং আল্লাহর রহমতে আমরা সেই কাজও আমাদের শুরু করেছি। আমরা বলছি আগামী পাঁচ বছর ইনশাআল্লাহ আমরা ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করব। এর মধ্যে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার খাল গত এক মাসে আমরা খনন কার্য সম্পন্ন করেছি।”
সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছে জানিয়ে তিনি বলেন,“নির্বাচনের আগে আমরা বলেছিলাম যে বিএনপি সরকার গঠন করলে কৃষক ভাইদের যাদের দশ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ আছে, সেই কৃষি ঋণ সুদসহ মকুব করা হবে। আমরা নির্বাচিত হওয়ার পর সমগ্র বাংলাদেশের ১৩ লক্ষ্য কৃষক ভাইদের দশ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ আমরা মকুব করে দিয়েছি সুদসহ।”
“সরকার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১৫০ শয্যায় বাড়াবে। রাজশাহীতে যে ১৩০০ বেডের হাসপাতাল আছে সেটিও নেতৃবৃন্দ বলেছে ২৫০০ বেড করার জন্য । সেটিও করা হবে।”
সকল দেশবিরোধী চক্রের বিরুদ্ধে সজাগ না থাকলে এগুলো উন্নয়নের প্রতিফলন হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এখন যদি উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতাল তৈরি না হয়, এখন যদি মিল-কারখানাগুলো তৈরি আবার চালু না হয়, এখন যদি খাল খনন কর্মসূচি স্থগিত হয়ে যায়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত কে হবে প্রিয় ভাই ও বোনেরা? ক্ষতিগ্রস্ত কে হবে? জনগণ। জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই তো নাকি? জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না? জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাহলে প্রিয় ভাইয়েরা, আমার প্রশ্ন, আপনাদের সকলের কাছে আমার প্রশ্ন যে, যারা এমন কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করতে চায়, যেই কর্মসূচি গ্রহণ করলে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তারা কি জনগণের বন্ধু হলো? তারা জনগণের বন্ধু না। এখন খাল কাটা কর্মসূচি এটি কি জনগণের কর্মসূচি নয়? বিএনপি ঘোষণা করেছে যে, তারা আগামী পাঁচ বছর ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণ করবে। এগুলোর সুবিধা সবই দেশের জনগণ পাবে। তাই আজকে আপানাদের মাধ্যমে সারাদেশের জনগণকে জানিয়ে রাখতে চাই, আপনারা এসব চক্রের বিরুদ্ধে সজাগ থাকবেন।”
জনসভায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সভাপতিত্বে আরো উপস্থিত ছিলেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, শিল্প বাণিজ্য ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, পবা-মোহনপুর আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল হক মিলন, পুঠিয়া-দূর্গাপুর আসনের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, চারঘাট-বাঘা আসনের আবু সাঈদ চাঁদ, রাজশাহী বিভাগীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ওবায়দুর রহমান চন্দন, আমিনুল ইসলাম আলিম, জাতীয় নির্বাহী কমেটির বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশিদ মামুন, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন, রাজশাহী জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট এরশাদ আলী ঈশা, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যন আবুল কালাম আজাদ সুইট, মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক শরিফুল ইসলাম জনিসহ জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা।


প্রকাশিত: October 21, 2026 | সময়: 5:00 am | সুমন শেখ