সর্বশেষ সংবাদ :

কৃষক কার্ড, ৩০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও উপজেলা হাসপাতাল ১৫০ শয্যার প্রতিশ্রুতি প্রধানমন্ত্রীর

স্টাফ রিপোর্টার :
কৃষকদের সহায়তায় চলতি বছর ৪০ লাখ কৃষকের হাতে কৃষি কার্ড পৌঁছে দেওয়া, আগামী পাঁচ বছরে ৩০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যা থেকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠে আখচাষিদের প্রণোদনা প্রদান উপলক্ষে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি বিশ্বাস করে, কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, আর কৃষি বাঁচলে দেশ বাঁচবে। কৃষকদের দুর্ভোগ কমানো, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।

তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সরকার গঠনের সাত দিনের মাথায় ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের মাধ্যমে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এতে দেশের ১৩ লাখ কৃষক উপকৃত হয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী জানান, ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, মাঝারি, ভূমিহীন ও অন্যান্য শ্রেণির কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। চলতি বছর নারী-পুরুষ মিলিয়ে ৪০ লাখ ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের কাছে কৃষি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের সার, বীজ ও কীটনাশক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি ফসলবিমা, ব্যাংকঋণ এবং আবহাওয়ার তথ্য পাওয়ার সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পাঁচ বছরে ৩০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা

পানির সংকট নিরসন ও কৃষিতে সেচসুবিধা বাড়াতে সরকার খাল খনন ও নদী সংস্কার কর্মসূচি শুরু করেছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ৩০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে গত আট মাসে প্রায় আট হাজার কিলোমিটার খননের কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

রাজশাহীর পদ্মা নদীর পানিপ্রবাহ প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, পদ্মা ও তিস্তা নদীতে ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের পানিসংকট দূর করা, কৃষিতে সেচসুবিধা বাড়ানো এবং মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়ন সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

উপজেলা হাসপাতাল হবে ১৫০ শয্যার

জনসভায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর দাবির প্রসঙ্গও উঠে আসে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরে দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যাসংখ্যা ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১৫০ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

তিনি বলেন, উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ করা হলে গ্রামের মানুষকে চিকিৎসার জন্য দূরের জেলা শহর বা মহানগরে ছুটতে হবে না। এসব হাসপাতালে শিশু, নারী ও কিডনি রোগীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা এবং ডায়ালাইসিসের সুবিধা রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।

কিডনি ও হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা ব্যয় কমানোর উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসাসেবা সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে সরকার বিভিন্ন ওষুধের ওপর কর কমিয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

বন্ধ কলকারখানা চালু ও কর্মসংস্থান

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের বাজার সম্প্রসারণ এবং চিনিকলসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানার কার্যক্রম সচল করার মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়াতে চায় সরকার। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে দেশের ৬৭টি বন্ধ কলকারখানা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে আরও প্রায় ৪৬টি বন্ধ কলকারখানা চালুর উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হচ্ছে, যাতে শিল্পকারখানায় উৎপাদন বাড়ে এবং দেশের বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।

তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।

নারীদের শিক্ষা ও ফ্যামিলি কার্ড

নারীদের শিক্ষার প্রসারে উচ্চমাধ্যমিকের পর স্নাতক (অনার্স) পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্তের কথা জানান তারেক রহমান। ভালো ফল করা ছাত্রীদের উপবৃত্তি দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও বলেন তিনি।

এ ছাড়া নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, এ সহায়তা দিয়ে নারীরা পরিবারের খাদ্য, সন্তানদের শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি ক্ষুদ্র সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি পরিবারের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা ধীরে ধীরে গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও শেষ পর্যন্ত পুরো দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে।

দেশের পরিবেশ উন্নয়ন ও জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

জুলাইয়ের শহীদদের স্মরণ ও রাজনৈতিক বক্তব্য

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ এবং আহত জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের কর্মসংস্থানে সহায়তার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিএনপি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের শহীদদেরও সম্মান জানায়।

তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ সরকার ঘোষিত কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। তাঁর দাবি, কিছু মহল শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি ও অস্থিরতা তৈরির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা ব্যাহত করতে চায়। এ বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে বলেও তিনি বক্তব্যে উল্লেখ করেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে বিস্তারিত তথ্য জনসভায় তুলে ধরা হয়নি।

তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষ রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চায়। সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হলে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।’

উৎসবমুখর পরিবেশে জনসভা

এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে রাজশাহীর মাদরাসা মাঠে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা মিছিল ও স্লোগান দিয়ে জনসভাস্থলে আসতে শুরু করেন।

জনসভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এতে বক্তব্য দেন ভূমিমন্ত্রী ও রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান মিনু, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল হক মিলন, রাজশাহী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদসহ জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা।

আব্দুল বাতেন /শাহজাদা

 


প্রকাশিত: October 20, 2026 | সময়: 7:24 pm | Daily Sunshine