সর্বশেষ সংবাদ :

শিবগঞ্জে ছেলের বিরুদ্ধে শতবর্ষী মায়ের মামলা

স্টাফ রিপোর্টার, শিবগঞ্জ: বাবা-মায়ের সকল সম্পত্তি লিখে নেয়ার পর পৈত্রিক বসতবাড়ি থেকে বের করে দেয়ার হুমকি ও জরাজীর্ণ ঘরের মেরামত করতে না দেয়ার পর এক ছেলের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন তার শতবর্ষী মা। এছাড়াও ছয় ভাই-বোনকে বঞ্চিত করে প্রতারণার মাধ্যমে বাবা-মায়ের সকল সম্পত্তি লিখে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে শতবর্ষী অসহায় মায়ের মেজ ছেলে বুয়েটের ওই টেকনিক্যাল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এমনকি সেই মা বিভিন্ন আদালত জমি লিখে দেয়ার বিষয়টি না দেয়ার অভিযোগ করেন মুখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে।
বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের এক টেকনিক্যাল কর্মকর্তার শতবর্ষী মা চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা মাঝপাড়া গ্রামের মৃত এসলাম হোসেনের স্ত্রী মোসা. রহিমা খাতুন মনোয়ারা রেফুল। বারিয়াডাঙ্গার সে গ্রামে গিয়ে জানা যায়, শতবর্ষী রহিমা খাতুন মনোয়ারা রেফুল ৭ সন্তানের জননী। স্বামী মারা যাবার পর বর্তমানে ছোট ছেলে ইসমাইলের সাথে নিজ গ্রাম বালিয়াডাঙ্গায় বসবাস করেন তিনি। টিনের চালার ফুটো দিয়ে পড়ে পানি। ঘরের বিভিন্ন জায়গায় ফাটল ধরেছে। ঘুনের কারনে খসে পড়ছে চালার বিভিন্ন অংশ। এমন জরাজীর্ণ ঘরেই বসবাস করা বৃদ্ধা মায়ের দাবি, সম্পত্তির মালিকানা নিজের নামে নেওয়ার পর থেকেই মুখতারুজ্জামান তাঁকে এবং তাঁর ছোট ভাই ইসমাইল হোসেনকে বাড়ি থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ ও হুমকি দিচ্ছেন। এমনকি বৃষ্টির পানি পড়া এবং ফাটল ধরা জরাজীর্ণ শেষ আশ্রয়টুকু মেরামত করতে গেলেও তিনি বাধা দিচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে। এমন অবস্থায় বসবাস করলেও এখন বসবাসের সেই পৈতৃক বাড়ি থেকেও সেই মাকে বের করতে নানারকম হুমকি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে বুয়েটে কর্মরত কর্মকর্তা মো. মুখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে। এমনকি মৃত বাবা ও মা মনোয়ারা রেফুলের সকল সম্পত্তি জোরপূর্বক লিখে নেয়ারও অভিযোগ ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে। বসবাসের একমাত্র সম্বলটুকু নিয়ে যখন টালমাটাল অবস্থা তখন ছেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হন এই শতবর্ষে হতভাগ্য মা।
নিজের ও স্বামীর সকল সম্পত্তি জোরপূর্বক লিখে নেয়ার প্রতিকার চেয়ে এবং পৈতৃক বসতবাড়ি রক্ষায় এবার ছেলের বিরুদ্ধেই আদালতে মামলা করেছেন মা মনোয়ারা রেফুল। এনিয়ে গ্রাম্য সালিশ ও থানায় এবং জেলা লিগ্যাল এইড আদালতে অভিযোগ দেয়ার পর তা নিয়ে বসলেও হয়নি সমাধান। প্রত্যেকবারেই সমাধান মানতে অস্বীকৃতি জানান ওই ব্যক্তি।
ভুক্তভোগী শতবর্ষী মায়ের দাবি, জমি সংক্রান্ত মামলা চলছে বলে টিপসই নিয়ে স্বামী ও তার জমি লিখে নেয় মেজ ছেলে মুখতারুজ্জামান।রহিমা খাতুনের অভিযোগ অনুযায়ী, জমি-সংক্রান্ত অন্য একটি মামলা পরিচালনার কথা বলে তাঁর এবং তাঁর প্রয়াত স্বামীর কাছ থেকে কৌশলে টিপসই নেন অভিযুক্ত ছেলে মুখতারুজ্জামান। পরবর্তীতে সেই টিপসই ব্যবহার করে তিনি পৈতৃক সম্পত্তির মালিকানা নিজের নামে লিখে নেন। দিনমজুর ছোট ছেলে ইসমাইল হোসেন এখন মাকে নিয়ে থাকেন বাপ-দাদার পৈতৃক বাড়িতে। সেই বাড়ি থেকেও তাড়িয়ে দিতে মা ও ভাইকে চাপ দিচ্ছে মুখতারুজ্জামান। তবে ছেলের এমন প্রতারণার পরেও বদ দোয়া না দিয়ে আদালতের বারান্দায় না যাওয়ার আকুতি মায়ের।
স্থানীয়রা জানান, রেফুলের তিন ছেলে ও দুই মেয়ে সকলেই থাকেন বাইরে। অসুস্থ অবস্থায় বাবা ও মার কাছে সকল সম্পত্তি লিখে নেয়ায় বঞ্চিত ৬ ছেলে-মেয়ে। তাদের জন্যেও আফসোসের শেষ নেই রেফুলের।
ছোট ছেলে ইসমাইল হোসেন জানান, বাবা-মায়ের প্রায় ১২ বিঘা ধান ও আমের জমি ও বসতবাড়ি লিখে নিলেও এখন মাকে দেখেন না বুয়েটের সিনিয়র টেকনিক্যাল অফিসার মুখতারুজ্জামান। তিনি তার মাকে দেখাশোনা করেন এবং এই পৈতৃক বাড়িতে থাকেন জরাজীর্ণ ভবন হওয়ায় বসবাসের অনুপযোগী হওয়ায় মেরামতের চেষ্টা করা হলেও সেটি করতে দিচ্ছে না তার ভাই। উল্টো তাদের এই ভবনটি খালি করার চাপ দিচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন তার মেজ ভাই এবং সে দুজনই মায়ের সন্তান অথচ তার মেজ ভাই তো দেখি না উল্টো ঘরছাড়া করার চেষ্টা করছে। আর আমার আয় একেবারে নগণ্য হলেও মাকে দেখাশোনা করতে হচ্ছে। বর্তমান দ্রব্যমূল্য রৌদ্রগতির মধ্যেও মাকে নিয়ে অনেক কষ্টে তাদের দিন পার করতে হচ্ছে।
অপর ২ ভাই আলিম হোসেন ও খাইরুল হোসেন জানান, রহিমা খাতুন ও প্রয়াত এসলাম হোসেনের মোট সাত সন্তানের মধ্যে বাকি ছয় সন্তানকেই এই সম্পত্তি বণ্টন থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করা হয়েছে। প্রতারণার মাধ্যমে মা ও বাবা কে ভূল বুঝিয়ে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি নিজের নামে নেওয়ার পরও অভিযুক্ত ছেলে তাঁর শতবর্ষী মায়ের কোনো খোঁজখবর নেন না। এই জমি বিরোধ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে একাধিকবার গ্রাম্য সালিশ হলেও অভিযুক্ত ব্যক্তি তা মানেননি। কোনো উপায় না পেয়ে নিজের শেষ বসতভিটা ও অধিকার রক্ষায় শতবর্ষী রহিমা খাতুন তাদের মা অবশেষে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন এবং মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
এনিয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও পাওয়া যায়নি সিনিয়র টেকনিক্যাল অফিসার মুখতারুজ্জামানকে। কয়েকদিনের চেষ্টায় ৩ টি ফোন নম্বারে পাওয়া গেলেও কথা বলতে রাজি হননি তিনি। পরে তার ব্যবহৃত তিনটি নাম্বারই বন্ধ পাওয়া যায়।
বালিয়াডাঙ্গা ইউপির চেয়ারম্যান আতাউল হক কমল জানান, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের বিষয়ে একাধিকবার গ্রাম্য সালিশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সালিশে বিষয়টি সমাধানের জন্য বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হলেও অভিযুক্ত তা মেনে নেননি।
তিনি আরো বলেন, অভিযোগের পর তার দলিল পত্র দেখে যেটা মনে হয়েছে আইনগতভাবেই তার পিতা সকল সম্পত্তির মালিক এখন তিনি।তবে প্রতারনা করেই হোক বা যেভাবেই হোক। পিতার মৃত্যুর পর অন্যান্য সন্তানরা যখন বাড়ি বা তাদের সম্পত্তি গুলোর উপর নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে যান তখনই মূলত বিষয়টি জানাজানি হয়।
এনিয়ে সালিশ হলে মানবিক কারনে জমি ফেরত দেয়ার কথা বলায় তা মানেননি বুয়েটের সিনিয়র টেকনিক্যাল অফিসার মুখতারুজ্জামান। আর শালিসে জীবিত মা বারবার দাবি করছেন তিনি তার কোন সন্তানকে কোন সম্পত্তি লিখে দেননি।


প্রকাশিত: October 9, 2026 | সময়: 6:17 am | সুমন শেখ

আরও খবর