, , ।
সবুজ ইসলাম: জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং তুলনামূলক কম খরচের কারণে রাজশাহীতে ইলেকট্রিক বাইকের (ই-বাইক) চাহিদা বাড়ছে। নগরের বিভিন্ন শোরুমে ইলেকট্রিক বাইক ও স্কুটার বিক্রির পরিমাণও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের দাম এক ধাপে লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। যা সেপ্টেম্বরের আগে ডিজেল ১১৫, পেট্রোল ১৪০ এবং অকটেন ১৪৫ টাকা ছিল। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি কয়েকমাস আগেও পেট্রোল-অকটেনের সরবরাহ ঘিরে ভোগান্তির ঘটনাও দেখা গিয়েছিল। সেসময় ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি, সীমিত পরিমাণে তেল বিক্রি এবং কোথাও কোথাও সাময়িক তেল সরবরাহও ছিলো না। এতে তখন বিপাকে পড়েন চালকেরা। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ইলেকট্রিক বাইক বর্তমান সময়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
কম খরচে আগ্রহ বেশি: ই-বাইকের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহের অন্যতম কারণ এর পরিচালন ব্যয় কম। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, মডেল ও চার্জিং খরচভেদে ই-বাইকে প্রতি কিলোমিটার চলতে প্রায় ১০ থেকে ৩০ পয়সা খরচ হয়। বিপরীতে তেলচালিত মোটরসাইকেলে জ্বালানি বাবদ প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। ফলে প্রতিদিন যাতায়াতের জন্য মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন—এমন অনেকেই এখন এককালীন বেশি দাম দিয়ে ই-বাইক কিনে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খরচ কমানোর হিসাব করছেন। ই-বাইক ব্যবহারকারীদের কাছে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভর করতে হয় না। বাড়ি বা নির্দিষ্ট চার্জিং পয়েন্টে ব্যাটারি চার্জ করে দৈনন্দিন যাতায়াত করা যায়।
নগরের ভদ্রা এলাকায় ইলেকট্রিক বাইকের তিনটি শোরুম রয়েছে। ৯৭ এন্টার প্রাইজ নামের শোরুমে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন মডেলের ই-স্কুটারের দাম প্রায় ৮৯ হাজার থেকে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা এবং কিছু ই-বাইকের দাম এর চেয়েও কম। মডেলভেদে এক চার্জে ৫০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বা তার বেশি চলার দাবি করা হচ্ছে। ই-বাইক কিনতে এসেছিলেন সামসুদ্দিন নামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তার কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কম খরচে চলাচলের জন্য এমন বাইক খুঁজছিলাম, যাতে তেলের প্রয়োজন না হয় এবং পরিবেশও দূষিত না হয়। অনেক দোকান খুজেঁ আজকে একটি ইলেকিট্রক বাইক কিনেছি। এখন ভালোই লাগছে। আশা করছি এটির মাধ্যমে আমার চলাচলের ব্যয় কমে আসবে।’
আরেক ক্রেতা সাহেব আলী বলেন,‘তেলের দাম যেভাবে বাড়ছে। তাতে তো তেল কিনে এভাবে বাইক চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই একটা ইলেকট্রিক বাইক কিনতে এসেছি। যেটি সাশ্রয় এবং মাইলেজ বেশি দিবে সেটিই কিনবো।’
শুধু ছেলেরাই নয়। ইলেকট্রিক বাইকের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে মেয়েদেরও। শাহনাজ খুশি নামে একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক এসেছেন বাইক কিনতে। তেল চালিত স্কুটার ছেড়ে ই-বাইকে কেন নিবেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন,“তেলের পাম্পগুলোতে মাঝে মাঝে দীর্ঘ লাইন এবং কয়েকদিনের ব্যবধানে যে হারে তেলের দাম বেড়ছে তাই চার্জার বাইক কিনতে আগ্রহী হয়েছি। অনেক পরিকল্পনা এবং চিন্তা করেই এই বাইক কিনতে এসেছি।’
রাজশাহীর ব্যবসায়ীরাও বলছেন, তেলের দাম যত বাড়ছে, ই-বাইকের প্রতি মানুষের আগ্রহ তত বাড়ছে। স্থানীয় বাজারে এখন বিভিন্ন দামের ও বিভিন্ন রেঞ্জের মডেল পাওয়া যাচ্ছে। ফলে আগে যারা শুধু তেলচালিত মোটরসাইকেল বিবেচনা করতেন, তাঁদের একটি অংশ এখন ই-বাইকও তুলনা করে দেখছেন।
৯৭ এন্টার প্রাইজ নামে ইলেকট্রিক বাইক বিক্রয় শোরুমের স্বত্বাধিকারী রবিউল হোসেন বলেন,‘গত ৬মাসে আগে আমাদের এখানে প্রতিমাসে গড় বিক্রি হতো ১৫ থেকে ২০ টি গাড়ি। কিন্ত এখন বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টি গাড়ি। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমাদের ইলেকট্রিক বাইকের চাহিদা অনেক বেড়েছে। মানুষ এখন যেটাতে সাশ্রয়ী পাচ্ছে সেদিকেই যাচ্ছে।’
ভদ্রা মোড়ে রিভো নামের আরেকটি শোরুমের বিক্রয়কর্মী জালাল উদ্দিন বলেন,“তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষ ইলেকট্রিক বাইকের প্রতি আগ্রহী হচ্ছে। অনেকেই আমাদের শোরুমে আসছেন, দেখছেন এবং কিনছেন। আগের তুলনায় বর্তমান সময়ে আমাদের বিক্রি বেড়েছে।’
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভালো মানের টেকসই এবং বেশি মাইলেজ দিবে এইরকম বাইক হলে দেশে ইলেকট্রিক বাইকের জনপ্রিয়তা আরো বাড়বে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘ইলেকট্রিক বাইক শুধু খরচ কম নয়, পরিবেশবান্ধব এই বাইকের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ। তেলচালিত মোটরসাইকেলের মতো সরাসরি ধোঁয়া নির্গত না হওয়ায় নগরের বায়ুদূষণ কমানোর ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক যানবাহনকে তুলনামূলক পরিবেশবান্ধব হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ই-বাইকের বাজার এখনও কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। পর্যাপ্ত চার্জিং অবকাঠামো, ব্যাটারির স্থায়িত্ব, ব্যাটারি পরিবর্তনের খরচ, সার্ভিসিং সুবিধা এবং দীর্ঘপথে চার্জ ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা—এসব বিষয় নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। দেশের মোট মোটরসাইকেল বাজারে ই-বাইকের অংশও এখনো তুলনামূলক কম।’