সর্বশেষ সংবাদ :

রাজশাহীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর: বিদেশে পাঁচার হওয়া টাকা ফেরত আনতে ‘রিকভারি টাস্কফোর্স’ গঠন

স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেছেন, ‘আগে বিদেশে পাঁচার হওয়া টাকা ফেরত আনতে দুদক থেকে বা সিআইডি থেকে বা এনবিআর থেকে তারা আসতেন, কাজ করতেন আবার চলেও যেতেন। কিন্তু এখন বিদেশে পাঁচারকৃত টাকা ফেরত আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে আমাদের একটা স্টোলেন অ্যাসেট ‘রিকভারি টাস্কফোর্স’ গঠন করা হয়েছে।’
শুক্রবার (২ অক্টোর) বিকেলে রাজশাহী মহানগরীর পিটিআই অডিটোরিয়ামে বেসরকারি খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজসমূহের সফল বাস্তবায়নে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘এই যে কিছুদিন আগে বিদেশে নিয়ে চলে গেল টাকাটা, এটা তো সব আমাদের চোখের সামনে হইছে। কারো না কারো চোখের সামনে হইছে। আমাদেরও অনেক গাফিলতি ছিল, এটাকে মানতে হবে। এর জন্য আমরা কি ব্যবস্থা নিচ্ছি? আপনারা জানেন বাংলাদেশ ব্যাংকে আমাদের একটা ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স’ করা হয়েছে। আমরা আসার পরেই এই টাস্কফোর্সকে আরও স্ট্রং করা হয়েছে। এখানে ১১টা জয়েন্ট ইনভেস্টিগেশন টিম করা হয়েছে। আগে যেটা ছিল এটা একটা কমিটি টাইপ, এখন এটাকে আমরা পারমানেন্ট স্ট্রাকচারে নিয়ে আসছি। এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের টাস্কফোর্সে ১১টা টিম কাজ করছে, যেখানে দুদকের ২২ জন, সিআইডির ১১ জন, এনবিআরের ২২ জন এবং আমাদের এই টিমটা কাজ করছে।’
দেশের টাকা চুরি করবে আবার শান্তিতেও থাকবে এমনটা হতে দেওয়া হবে না উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর মোস্তাকুর রহমান বলেন,‘সারা পৃথিবীতে স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারির সাকসেস রেট হচ্ছে লেস দেন ২ শতাংশ। ফলে এটা দেখলে অনেক সময় হতাশ হই। কিন্তু আমরা বসে থাকি না। আমরা যেই কাজটা করি—যারা চুরি করল, ওরা যাতে ভোগ করতে না পারে, সেটাকে আমরা এনশিওর করার চেষ্টা করি। অর্থাৎ ফ্রিজ করি, ওইখানে কেস ইনস্টিটিউট করাই। আমাদের এই ব্যাপারে সবাইকে এক থাকতে হবে। দেশের টাকা চুরি করবে আবার শান্তিতে থাকবে—এটা হতে দেওয়া যাবে না। সো এই জায়গায় আমাদের একটা ঐক্যবদ্ধ থাকা উচিত—যে চুরি করবে তাকে আমরা শান্তিতে থাকতে দেব না।’
ব্যাংকিং সেক্টরে কাউকে আলাদা সুবিধা দেওয়া হবে না উল্লেখ করে গর্ভনর আরো বলেন,‘আমরা এক্সটার্নাল ইনফ্লুয়েন্স এলাউ করব না। এটা আমাদের সরকার প্রধানের কমিটমেন্ট—যে আমরা ফিনান্সিয়াল সেক্টরে এটা হতে দেব না। এটাতে সবার কিন্তু পার্টিসিপেশন লাগবে। এটা যদি হয়, সেটাকে এক্সপোজ করতে হবে এবং এই ধরনের ক্ষেত্রে নিজের মেরুদণ্ড শক্ত করতে হবে। আমার সহকর্মী, আমার ব্যাংকের যারা বন্ধুরা আছেন তাদেরকে বলব—শক্ত হন। রুল-বেসড আমরা একটা সিস্টেমে যেতে চাই, সবাই যেখানে আইন মানবে। এর বাইরে কোনো কাউকে ব্যাংকিং সেক্টরে আলাদা সুবিধা দেওয়া হবে না।’
কিউআর কোডে সফলতা বাড়ছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন,‘কিউআর কোডে আমরা যখন ফার্স্ট জুলাই শুরু করি প্রতিদিন ট্রানজেকশন ছিল ৩৭ কোটি টাকা। আর এখন তিন মাসে এটা চলে আসছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকায়। আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ সমূহে অনেক আগেই কিউআর কোড চালু হয়েছে। আমাদের এখানেও সেটি করা হবে।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে গভর্নর বলেন, ‘সারাদেশে ৬২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো উচ্চ সুদহারের কারণে উদ্যোক্তাদের ওপর তৈরি হওয়া চাপ কিছুটা কমানো। বর্তমানে ব্যাংক ঋণের বিদ্যমান সুদহার প্রায় ১২ থেকে ১৪ শতাংশ। এ অবস্থায় স্বল্প সুদে অর্থায়নের ব্যবস্থা উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তরুণদের উদ্যোগ ও উদ্দীপনাকে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কাজে লাগাতে ‘উদ্যোগ’ নামে একটি স্কিমের পরিকল্পনা করা হয়েছে। দেশের প্রতিটি উপজেলা থেকে ১০ জন করে উদ্যোক্তা বাছাই করে ৫ হাজার তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এ স্কিম প্রণয়ন করা হয়েছে। বর্তমানে এটি পাইলট পর্যায়ে রয়েছে এবং নভেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যক্রম শুরু হতে পারে।’
গভর্নর জানান, ১০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় অধিকসংখ্যক প্রকৃত ও প্রান্তিক কৃষককে সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রচলিত জমি বা স্থাবর সম্পত্তির পরিবর্তে বিকল্প জামানত ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্যের উৎপাদন থেকে সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি পর্যন্ত পুরো ‘এগ্রি ভ্যালু চেইন’ কার্যক্রমকে গতিশীল করতে ৩ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম নেওয়ার কথা জানান তিনি।
সভায় জানানো হয়, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচির আওতায় সারাদেশে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ৬০ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এছাড়া কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ১০ হাজার ও ৩ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সভায় অংশগ্রহণকারীরা প্রণোদনা প্যাকেজের ব্যাপক প্রচার ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন। তাদের মতে, সংশ্লিষ্টদের মতামত ও সমন্বিত সহযোগিতার ভিত্তিতে এসব নীতি বাস্তবায়ন করা হলে কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসতে পারে। এর আগে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন গর্ভনর। সেখানে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত উদ্যোক্তারা তাদের মতামত জানান প্রধান অতিথিকে।
সভায় বাংলাদেশ ব্যাংক রাজশাহী শাখার নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ বদিউজ্জামান এর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ইউসুফ আলী, জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের কৃষি ঋণ বিভাগের পরিচালকসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী, নারী ও কৃষি উদ্যোক্তা এবং গণমাধ্যমকর্মীরা সভায় উপস্থিত ছিলেন।


প্রকাশিত: October 3, 2026 | সময়: 6:38 am | সুমন শেখ