সর্বশেষ সংবাদ :

পানিবন্দি মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ নিরসন করলেন পবার ইউএনও

স্টাফ রিপোর্টার: শিশু কোলে নিয়ে, ইটের ওপর পা ফেলে ফেলে কোনো রকমে চলতে হতো এতদিন। রাত নামলেই আতঙ্ক পোকামাকড়ের। আবার আরেক দফা বৃষ্টি হলে হয়তো ডুবে যাবে আশ্রয়টুকুও। ঘরের মেঝে থেকে রান্নাঘর—সবখানেই নোংরা পানি। টানা ১১ দিন এমন অসহায় অবস্থায় পানিবন্দি ছিল রাজশাহীর পবা উপজেলার হুজুরীপাড়া ইউনিয়নের শাহাপুর গ্রামের প্রায় ৫৫-৬০টি পরিবার।
দীর্ঘ ২২ বছরের জলাবদ্ধতার সেই অভিশাপ থেকে অবশেষে এক দিনের উদ্যোগে মুক্তি পেলেন তারা। পবা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ইবনুল আবেদীন খবর পেয়ে সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ঘটনাস্থলে ছুটে যান। মানুষের অসহায় পরিস্থিতি স্বচক্ষে দেখে তিনি দ্রুত পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ নেন। বৈরী আবহাওয়া ও বৃষ্টির মধ্যেই ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থেকে সরকারি খাস জমি কেটে খাস পুকুরের মধ্য দিয়ে পানি বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জমে থাকা পানি নামতে শুরু করে। দীর্ঘদিনের পানিবন্দি জীবন থেকে মুক্তির স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন শাহাপুরবাসী।
সরেজমিনে সোমবার সকালে শাহাপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির উঠানজুড়ে থইথই পানি। কোথাও এক হাঁটু, কোথাও তারও বেশি পানি। প্রয়োজনীয় কাজে বের হতে শিশু ও নারীদের পানির মধ্য দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে। অনেক পরিবার ঘরের ভেতরের আসবাবপত্র ইট ও কাঠের ওপর উঁচু করে রেখেছে। শাহাপুর গ্রামের বাসিন্দা তৈয়ব আলী বলেন, ‘আমাদের ঘরের মেঝেতে পানি, উঠানে পানি, রান্নার জায়গাতেও পানি ছিল। রাতে ঘুমাতে পারিনি। ছোট বাচ্চাদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভয় ছিল। কখন কোথায় পড়ে যায় কিংবা পানিতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে—সেই চিন্তায় সব সময় থাকতে হয়েছে। ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে রান্নাও করতে পারিনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সাত ভাইসহ গ্রামের মানুষ মিলে টাকা তুলে দুই ট্রাক বালু এনেছিলাম। পানির মধ্যে বালু ফেলে কোনো রকমে চলাচলের পথ করেছি। কিন্তু একদিকে বৃষ্টি, অন্যদিকে পানি বের হওয়ার পথ বন্ধ—আমরা যেন চারদিকে পানির মধ্যে আটকে পড়েছিলাম। ১১ দিন ধরে এভাবে কষ্ট করার পর আজ যখন পানি নামতে দেখছি, তখন মনে হচ্ছে বুকের ওপর থেকে একটা বড় পাথর নেমে গেছে।’
শাহাপুর গ্রামের আরেক বাসিন্দা সৈয়ব আলী বলেন, ‘দীর্ঘ ২২ বছর ধরে এই গ্রামের জলাবদ্ধতার সমস্যা। বৃষ্টির পানি আগে সরকারি খাস পুকুর দিয়ে বড় বিলে চলে যেত। কিন্তু পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন পুরো গ্রাম পানিতে ডুবে যায়। চেয়ারম্যানের কাছে গিয়েছি, বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ করেছি, কিন্তু স্থায়ী সমাধান পাইনি।’ তিনি বলেন, ‘এবার ঘরের ভেতর পানি উঠল, দুটি বাড়ির দেয়াল ধসে পড়ল। তখন আমরা সত্যিই অসহায় হয়ে পড়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমাদের দেখার কেউ নেই। কিন্তু ইউএনও স্যার নিজে এসে দুর্ভোগ দেখলেন। বৃষ্টির মধ্যেও দাঁড়িয়ে থেকে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করলেন। ২২ বছরে যে সমস্যার সমাধান হয়নি, তিনি এক দিনের উদ্যোগে তার পথ খুলে দিলেন। আমরা তাঁর জন্য অন্তর থেকে দোয়া করি।’ স্থানীয় কৃষক ইদ্রিস আলী বলেন, ‘গত প্রায় ১১ দিন ধরে আমরা পানিবন্দি ছিলাম। বৃষ্টি থামলেও পানি নামছিল না। আজ পানি বের হওয়ার কাজ শুরু হওয়ায় নতুন করে বাঁচার আশা দেখছি।’
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে গৃহিণী নূরজাহান বেগম বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে আমরা যে কষ্ট করেছি, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আজ সমস্যার সমাধান হওয়ায় আমরা ইউএনও স্যারের প্রতি কৃতজ্ঞ।’
ইউএনও মো. ইবনুল আবেদীন বলেন, চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ ৯৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের কারণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। তবে শাহাপুরে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ থাকায় মানুষের দুর্ভোগ দীর্ঘ হচ্ছিল। সরকারি খাস জমি কেটে খাস পুকুরের মধ্য দিয়ে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কোনোভাবেই জলাবদ্ধতার কারণে মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি হতে দেওয়া যাবে না। শুষ্ক মৌসুমে এখানে ড্রেন নির্মাণের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কখনো এই এলাকার মানুষকে পানিবন্দি হয়ে এমন দুর্ভোগে পড়তে না হয়।’ হুজুরীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বলেন, এলাকাবাসীর অভিযোগ পেয়ে তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানান। গত ১১ দিন ধরে গ্রামের মানুষ চরম দুর্ভোগে ছিলেন। উপজেলা প্রশাসনের দ্রুত উদ্যোগে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা হওয়ায় দীর্ঘদিনের পানিবন্দি দশা থেকে মুক্তি পেয়েছেন শাহাপুরের মানুষ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ মেহেদী হাসান, কর্ণহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাবিবুর রহমান এবং হুজুরীপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির নেতা মাজদার রহমান।


প্রকাশিত: September 8, 2026 | সময়: 4:15 am | সুমন শেখ

আরও খবর