সর্বশেষ সংবাদ :

ডারউইন আনন্দ দিয়েছে, ম্যাকাই বাস্তবতা জানাল

স্পোর্টস ডেস্ক: ক্রিকেটকে বলা হয় ‘দ্য গ্রেট লেভেলার’। ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশ এই টেস্ট সিরিজের গল্পের প্রথম অংশটা নিজেদের করে নিয়েছিল। ম্যাকাই টেস্টে বাংলাদেশকে ভেঙেচুরে দিয়ে সেই হিসাবটা একেবারে সমান সমান করে দিল অস্ট্রেলিয়া। এক টেস্টে বাংলাদেশ জয়ী, পরের টেস্টে অস্ট্রেলিয়া। সিরিজ শেষ হলো ১-১ সমতায়। হিসাবের খাতা তাই সমান; কিন্তু গল্পটা মোটেও সাদামাটা নয়। এই গল্পটা বাংলাদেশের গর্বের। আমি তাই ম্যাকাইয়ে হারের দুঃখের চেয়ে এ সিরিজে ডারউইনের জয়টাকেই বেশি সেলিব্রেট করতে চাই। জানি না আমার সঙ্গে আর সবাই একমত হবেন কি না।
ক্রিকেটকে দেখার অনেক জানালা আছে। শুধু স্কোরবোর্ড দিয়ে একটি সিরিজের মূল্যায়ন করলে তার বড় অংশই অদেখা থেকে যায়। একটি জয় কেন বড়, একটি হার কেন হতাশারÑসেটি বুঝতে হলে প্রেক্ষাপটটিও দেখতে হয়।
২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ফিরে এসে বাংলাদেশ যে প্রথম টেস্টেই ডারউইনে জয় পেয়েছে, সেটি নিছক একটি ম্যাচের ফল নয়। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয়ের কোনো সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা ছিল না বাংলাদেশের। সেই শূন্যতা নিয়েই তারা নেমেছিল। তারপর কীভাবে একটি দল হিসেবে খেলতে হয়Ñসেটির দুর্দান্ত উদাহরণ দেখিয়েছে। সেই জয় তাই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ক্রিকেটের নতুন একটি অধ্যায়ের শুরু বলেই মনে হয়। সে গল্পটি গর্বের। অনেক আনন্দের।
পরিসংখ্যানও সে জয়কে ছোট করে দেখার সুযোগ দেয় না। গত ১৫ বছরে ভারত অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২১ টেস্ট খেলে জিতেছে মাত্র ৫টি। ইংল্যান্ড ২০ টেস্টে জয় পেয়েছে মাত্র একটিতে। ট্রান্স-তাসমান প্রতিদ্বন্দ্বী নিউজিল্যান্ডও ৮ ম্যাচে জিতেছে একটি। শ্রীলঙ্কা এখন পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে কোনো জয় পায়নি। তাহলে বাংলাদেশের ডারউইন জয়কে কীভাবে ফ্লুক বলা যায়? সেটি ছিল কঠিন লড়াইয়ের, পরিকল্পিত এবং সম্পূর্ণ প্রাপ্য একটি জয়।
এ সিরিজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি সম্ভবত বাংলাদেশের পেস বোলিং। শন টেইটও বলেছেন, বাংলাদেশের শক্তির জায়গা এখন পেস বোলিং। কথাটা যত দ্রুত আমরা বুঝতে পারব, ততই ভালো। এতদিন বাংলাদেশ ক্রিকেটে পেসারদের নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ছিল, এ সিরিজ যেন সেখানে একটি দৃঢ়তার জায়গা তৈরি করেছে।
একটি টেস্ট জিততে হলে প্রতিপক্ষের ২০ উইকেট নিতে হয়। বাংলাদেশ এখন সেটি করতে শিখছে। ডারউইনে তারা সেটিই করে দেখিয়েছে। টেস্ট ক্রিকেটে সাফল্যের সবচেয়ে মৌলিক শর্ত এটাই। সে জায়গায় পৌঁছানোই বাংলাদেশের জন্য বড় আশার খবর। অবশ্য ম্যাকাইয়ের হার নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই; বিশেষ করে ব্যাটিং নিয়ে। কঠিন কন্ডিশনে দীর্ঘ সময় ভালো গতির বোলিং কীভাবে সামলাতে হয়, সেটি এখনো বাংলাদেশের ব্যাটারদের বড় পরীক্ষার জায়গা। ম্যাকাইয়ে ধৈর্য, প্রয়োগ আর প্রতিরোধের যে মানসিকতা দরকার ছিল, সেটি যথেষ্ট দেখা যায়নি। অস্ট্রেলিয়ার পেসাররা ভালো বোলিং করেছেন; কিন্তু বাংলাদেশের বাজে ব্যাটিংও তাদের কাজটি সহজ করে দিয়েছে।
এ দুর্বলতা রাতারাতি দূর হবে না। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এসে এমন কন্ডিশনে খেলার সুযোগই যখন আসে এত দীর্ঘ বিরতিতে, তখন প্রস্তুতিটা নিতে হবে দেশের মাটিতে বসেই। কঠিন উইকেট, দ্রুতগতির বোলিং, দীর্ঘ স্পেল, অফস্টাম্পের বাইরে ধৈর্যের পরীক্ষাÑএ সবের জন্য আলাদা প্রস্তুতি দরকার। কারণ, অস্ট্রেলিয়ায় এসে শিখতে শুরু করলে সময় খুব কম থাকে।
সিরিজের আগে একটি কথা বারবার বলা হচ্ছিল। দেশের মাটিতে ইংল্যান্ড বা ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে যত টেস্টই জেতা হোক, বড় দল হয়ে উঠতে হলে বিদেশের মাটিতে জয় দরকার। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া বা দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি জয়। বাংলাদেশ সে তালিকা থেকে অস্ট্রেলিয়াকে ‘টিক’ দিয়ে এসেছে।
এটাই বড় কথা। কারণ, এই জয় শুধু একটি ম্যাচের জয় নয়। এটি স্বপ্ন দেখার দরজা খুলে দিয়েছে। গত দুবছরে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে যে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে, এই সিরিজ সেটিকে আরো বিশ্বাসযোগ্য করেছে। হয়তো এখনই বড় কোনো ঘোষণা দেওয়ার সময় নয়। কিন্তু বলা যায় ভালো একটি যাত্রার শুরু হয়ে গেছে।
ডারউইন আমাদের আনন্দ দিয়েছে। ম্যাকাই বাস্তবতা দেখিয়েছে। একটিতে জয়, অন্যটিতে হার। কিন্তু দুই ম্যাচ মিলিয়ে বাংলাদেশ পেয়েছে তারচেয়েও বড় কিছু—নিজেদের সম্পর্কে নতুন একটি বিশ্বাস। বাংলাদেশ এখন জানে বিদেশের মাটিতেও ২০ উইকেট নেওয়া সম্ভব। আর টেস্ট ক্রিকেটে সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দরজা। সামনে তাই উত্তেজনাপূর্ণ সময়। এবার দরকার সেই দরজার ওপারে যাওয়ার মতো ব্যাটিং তৈরি করা। আমার বিশ্বাস, একটু দেরিতে হলেও বাংলাদেশ সেটা পারবে। করে দেখাবে। আমি সেই আনন্দ দিনের অপেক্ষায়।


প্রকাশিত: August 25, 2026 | সময়: 4:04 am | সুমন শেখ