সর্বশেষ সংবাদ :

সৌদিতে অগ্নিকাণ্ডে নিহত প্রবাসীদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান

আত্রাই প্রতিনিধি: সৌদি আরবে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অঙ্গার হয়ে যাওয়া নওগাঁর আত্রাইয়ের প্রবাসী ভাইদের স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো উপজেলার বাতাস। শোকের সাগরে ভাসতে থাকা সেই অশ্রুসিক্ত পরিবারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন।
মঙ্গলবার ১১আগস্ট দুপুর ১২টায় উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে উপজেলা প্রশাসন, আত্রাই-এর আয়োজনে নিহতদের পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয় নগদ অর্থ।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মনিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে প্রাথমিকভাবে ১১টি হতভাগ্য পরিবারের মাঝে পরিবারপ্রতি ২০ হাজার টাকা করে সর্বমোট ২ লাখ ২০ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তার চেক বিতরণ করা হয়। এ সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করা হয়।
অর্থ সহায়তা হয়তো সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু স্বজন হারানোর যে স্থায়ী ক্ষত এই পরিবারগুলোর হৃদয়ে তৈরি হয়েছে, তা কোনো অর্থ দিয়েই পুরণ সম্ভব নয়।
একই সঙ্গে কলিজার টুকরা দুই ছেলে মহন ও সুমনকে হারিয়ে মা ময়না খাতুনের বুকফাটা আর্তনাদে উপস্থিত সবার চোখ জলে ভেসে যায়। বিলাপ করতে করতে তিনি বলছিলেন, বড় ছাওয়ালডা গেছে সাত বছর আগে, আর মেজ ছাওয়াল গেছে দুই বছর। কত দিন দেখি না রে বাপ! একটা দিনের জন্যও ছুটিতে আসে নাই। ছাওয়ালডা শেষবারও ফোনে বলল মা, কত কষ্ট করে গায়ের রক্ত পানি করে ঋণগুলা শোধ করলাম কেবল। বাড়ির কাজটা শুরু করছি, এইডা শেষ কইরাই বাড়িত ফিরমু মা, এসে বিয়ে করমু। কিন্তু ওরে বাপ, তুই ফিরলি ঠিকই, তবে লাশ হয়ে। আমার কী সর্বনাশ হয়ে গেল রে।
অন্যদিকে, মাত্র ১৪ দিন আগে জন্ম নেওয়া নিজের কোলের ফুটফুটে কন্যাশিশুকে এক নজর দেখার সুযোগটুকুও পেলেন না নিহত রুবেল। রুবেলের বৃদ্ধ বাবা মোহাম্মদ সাইদুর অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার রুবেল ৯ বছর ধইরা সৌদিতে থাকে। ছয় মাস ছুটি কাটিয়ে মাত্র তিন মাস হলো ফিরল। ওর একটা মেয়ে হইছে, বয়স মাত্র ১৪ দিন। আমার দুধের শিশু নাতনিটারে এতিম কইরা দুনিয়া থ্যাকে চলে গেল! দুনিয়ার বুকে আমার তো আর দেখার মতো কিছুই রইল না বাবা।
সাহাগোলা ইউনিয়নের উদনপৈ গ্রামের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তান ফরিদ শেখকে হারিয়ে দিশেহারা বৃদ্ধ বাবা ময়েন শেখ ও মা সাফিয়া খাতুন। দেড় বছর আগে জমি-জমা বন্ধক আর সুদে ঋণ নিয়ে বড় ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। অঝোরে চোখ ভাসিয়ে ময়েন শেখ আকুতি জানান, ছেলেটাক বিদেশে পাঠাতে গিয়া আমি কত ঋণের সাগরে ডুব দিছি। ফরিদের পাঠানো টাকায় সংসার চলত, একটু একটু করে ঋণ শোধের আশা দেখছিলাম। এখন ঘরে দুই বছরের ছোট্ট একটা নাতনি আর ফরিদের বউ। আমি কেমনে এই ঋণ শোধ করমু, আর কেমনে এই অসহায় সংসারডা চালামু।
ডুবাই গ্রামের তরুণ হাসিবুল হাসান শুভর গল্পটা আরও নির্মম। বিএ পাস করেও চাকরি হারিয়ে সংসারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে তিন বছর আগে দেশ ছেড়েছিলেন তিনি। শুভর চাচা আনোয়ারুল ইসলাম ক্ষোভ আর কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে জানান, দিনের কাজ শেষে শ্রমিকের দল যখন কারখানায় ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন, ঠিক তখনই বাইরে থেকে তালা দেওয়া কারখানায় বিধ্বংসী আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ঘুমন্ত অবস্থাতেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যান শুভসহ অন্য শ্রমিকেরা। এক বুক আশা নিয়ে বিদেশে যাওয়া শুভ আজ ফিরছেন নিথর দেহ হয়ে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মনিরুজ্জামান বলেন, সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে আত্রাইয়ের সন্তান তথা আমাদের প্রবাসী ভাইদের এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। প্রবাসীরা আমাদের দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, তাদের এই অপূরণীয় ক্ষতি কোনো অর্থ বা সান্ত্বনা দিয়ে পূরণ করার নয়। জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন সর্বদাই এই শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর পাশে রয়েছে।
আমরা প্রাথমিকভাবে এই আর্থিক সহায়তা প্রদান করলাম। পরবর্তীতে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পরিবারগুলোকে সার্বিক সহযোগিতা ও পুনর্বাসনে যা যা প্রয়োজন, প্রশাসন তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান, সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাকসুদুর রহমান, আত্রাই উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুল জলিল চকলেট, সাধারণ সম্পাদক তসলিম উদ্দিন, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নিয়ামত আলী বাবু এবং উপজেলা যুবদলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক খোরশেদ আলম।
এছাড়াও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, স্থানীয় সংবাদকর্মী এবং নিহত প্রবাসীদের স্বজনেরা উপস্থিত ছিলেন।


প্রকাশিত: August 12, 2026 | সময়: 3:07 am | সুমন শেখ