সর্বশেষ সংবাদ :

‘সমন্বিত জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো’ গড়ে তুলতে আধুনিক নীতিমালা করা হবে: প্রধানমন্ত্রী

সানশাইন ডেস্ক: সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সাধারণ জনগণও যাতে একটি ‘সমন্বিত জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো’র অংশ হিসেবে কাজ করতে পারে, সে জন্য একটি আধুনিক নীতিমালা করার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রীর মতে, দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল শক্তি কেবল সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতায় নয়, বরং সমগ্র জাতির ঐক্য, প্রস্তুতি ও সহনশীলতায় নিহিত। রোববার সকালে ‘সেনা সদর নির্বাচনি পর্ষদের’ সভার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তারেক রহমান এসব কথা বলেন। এই পর্ষদ সেনাবাহিনীর নির্দিষ্ট পদমর্যাদার (যেমন কর্নেল ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল) কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা, সার্ভিস রেকর্ড ও অন্যান্য যোগ্যতা যাচাই করে পদোন্নতির বিষয়ে সুপারিশ করবে।
প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি জানান, এই সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সরকারপ্রধান। ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি ‘দিক নির্দেশনামূলক’ বক্তব্য দেন। বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন ও পুনর্গঠনে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী শহীদ, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে নিহত সেনা সদস্যদের প্রতিও গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সরকার প্রধান এবং একই সঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল শক্তি কেবল সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতায় নয় বরং সমগ্র জাতির ঐক্য, প্রস্তুতি ও সহনশীলতায় নিহিত। “সে লক্ষ্যেই শহীদ প্রেসিডেন্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমানের ধারণার আলোকে একটি আধুনিক নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। যেখানে সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বেসামরিক প্রশাসন, শিল্প, প্রযুক্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণ একটি সমন্বিত জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে কাজ করবে।
তিনি বলেন, “এই নীতিমালার উদ্দেশ্য যুদ্ধকে উৎসাহিত করা নয়, বরং সম্ভাব্য যেকোনো সংকট, আগ্রাসন বা দুর্যোগ মোকাবিলায় সদাপ্রস্তুত, স্থিতিশীল এবং আত্মনির্ভরশীল সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলা, যাতে দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থ সর্বতোভাবে সুরক্ষিত থাকে।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সেনাবাহিনীর যেকোনো সাফল্যে আমি একধরনের গৌরববোধ করি। আবার সেনাবাহিনীর কোনো নেতিবাচক খবরে আমি অস্বস্তি অনুভব করি। আমি প্রায়শই বলি, ক্যান্টনমেন্ট আমার গভীর আবেগ এবং স্মৃতিময় স্থান। আপনারা জানেন, ঘরে-বাইরে সেনা পরিবেশেই যেহেতু আমার কৈশোর ও তারুণ্যের দিনগুলি কেটেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সেনাবাহিনীর নিয়ম-শৃঙ্খলা এবং বিধিবিধান সম্পর্কেও আমি অনেকটা ওয়াকিবহাল। এসব কারণে সেনাবাহিনী সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে আমি কিছুটা স্মৃতিকাতর হই।”
মা-বাবা ও ছোট ভাইয়ের সঙ্গে সেনা পরিবেশে বেড়ে ওঠার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, “সেনাবাহিনীকে বরাবরই আমি আমার বৃহত্তর পরিবারের অংশ বলেই মনে করি।” প্রধানমন্ত্রী তার বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করে বলেন, “একজন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে তৎকালীন মেজর জিয়া সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য ইতিহাসে পরিণত করেছেন। নিঃসন্দেহে দেশের সেনাবাহিনীর জন্য এটি একটি গৌরবজনক অধ্যায়।
“মুক্তিযুদ্ধে সেনাবাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা থাকলেও স্বাধীনতার পরপরই সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি বিনষ্ট এবং সেনাবাহিনীতে অস্থিরতা সৃষ্টির একধরনের অপপ্রয়াস লক্ষণীয় ছিল। সেই অস্থির সময়েও সাবেক সেনাপ্রধান শহীদ লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমানের দৃঢ় ও দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমেই সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল।”
সেনাবাহিনীতে পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে মেধা, পেশাগত যোগ্যতা ও নেতৃত্বের গুণাবলিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, “আমি মনে করি, পদোন্নতি কিংবা পদায়নের ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করলে পেশাদারিত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ‘সেনাসদর সিলেকশন বোর্ড’ যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারে।
“এক্ষেত্রে প্রথমেই আমার আহ্বান, সততা, ন্যায়পরায়ণতা, পেশাগত যোগ্যতা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, দূরদর্শিতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলী—সেনাবাহিনীর জন্য উপযুক্ত নেতৃত্ব নির্বাচনে এসব বিষয়কেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। এর পাশাপাশি মেধা এবং যোগ্যতাই হয়ে উঠুক একজন সেনা অফিসারের পদোন্নতি অর্জনের প্রধান মাপকাঠি।”
তিনি বলেন, “মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততার মূল্যায়নে যথানিয়মে যোগ্যতমদের বাছাই করে স্বীকৃতি প্রদানের লক্ষ্যে গঠিত এই সিলেকশন বোর্ডের মাধ্যমেই পদায়ন কিংবা পদোন্নতির ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। একইসঙ্গে সেনাবাহিনীতে আগামী দিনের দূরদর্শী এবং পেশাদার নেতৃত্বের সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপিত হবে বলেও আমি বিশ্বাস করি।”
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধানমন্ত্রী বলেন, “প্রিয় জেনারেলদের প্রতি আমার আহ্বান, এই সিলেকশন বোর্ডের মাধ্যমে নির্বাচিত অফিসারগণ ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাফল্য, গৌরব ও পেশাদারিত্বের ধারাবাহিকতা আরও সুদৃঢ় করবেন।” এ সময় বর্তমান সরকারের দর্শন তুলে ধরে তিনি বলেন, “দেশের স্বার্থ রক্ষায় ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। জনগণের স্বার্থ রক্ষায় ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সময়ের চাহিদানুযায়ী আধুনিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে সরকার বদ্ধপরিকর। বর্তমানে বাংলাদেশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তঃরাষ্ট্রীয় ও আন্তঃসীমান্ত হুমকি, সাইবার ও তথ্যভিত্তিক নিরাপত্তা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমসহ বহুমাত্রিক ও জটিল নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।
ফলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা এবং জনগণের প্রত্যাশা ও সহনশীলতাকে বিবেচনায় রেখে প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের একটি বাস্তবসম্মত ও টেকসই মডেল অনুসরণ করা এখন সময়ের দাবি।”
সরকার সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের জন্য একটি রূপরেখা প্রণয়নের কাজ করছে তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হল বাহিনীর ভবিষ্যৎ উন্নয়ন, যেখানে গুরুত্ব পাবে— সংখ্যার পরিবর্তে সক্ষমতা; সম্প্রসারণের পাশাপাশি কার্যকারিতা; প্ল্যাটফর্ম বৃদ্ধির পরিবর্তে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং একক বাহিনীকেন্দ্রিক উন্নয়নের পরিবর্তে জয়েন্টনেস-এর ওপর গুরুত্বারোপ।
“সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়নে সরকারের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়সমূহ হলো, সুশৃঙ্খল, আধুনিক ও শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গঠন; সমন্বিত প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা জোরদার; যুগোপযোগী প্রতিরক্ষা নীতি ও কৌশল প্রণয়ন; দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ; এবং গণতান্ত্রিক সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক সুদৃঢ়করণ।”
সেনাবাহিনী অবদানের কথা স্মরণ করে সরকারপ্রধান বলেন, “স্বাধীনতার সূচনালগ্ন থেকেই সেনাবাহিনীর সদস্যগণ পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করছেন। পার্বত্য ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে চলমান প্রায় ১ হাজার ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘বর্ডার রোড’ প্রকল্প শুধু সীমান্ত নিরাপত্তাই নিশ্চিত করছে না, বরং দুর্গম এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
“এ ছাড়াও পার্বত্য এলাকায় সেনাবাহিনী কর্তৃক ১ হাজার ২০০ বর্গমিটার এলাকা মাইন ও বিস্ফোরকমুক্ত করার কাজ চলমান রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিরক্ষা ও সন্ত্রাস দমনে নিয়োজিত থেকে শাহাদাত বরণকারী ২১৭ জন বীর সেনা সদস্যের পরিবারের প্রতি আমি গভীর সমবেদনা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।”
শান্তিরক্ষা মিশনে দক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের গৌরব ও মর্যাদা অর্জনের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, এই গৌরবময় অর্জনের পেছনে রয়েছে আত্মোৎসর্গের ইতিহাস। ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর দক্ষিণ সুদানে ড্রোন হামলায় সেনাবাহিনীর ছয়জন শান্তিরক্ষী নিহত হওয়ার ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।”
২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের গণঅভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ের ভূমিকার জন্য সেনাবাহিনীর প্রশংসা করেন সরকারপ্রধান। গণতন্ত্রকামী জনগণ সেটি ইতিবাচকভাবেই মূল্যায়ন করবে বলে তার বিশ্বাস। তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরো সময় জুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতির চাকা সচল রাখার ক্ষেত্রেও সেনাবাহিনী প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছে।”
গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী যে সহায়তা দিয়েছে, তা স্মরণ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, “ফ্যাসিস্ট শাসনের সময় দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান তাদের পেশাদারিত্ব হারিয়েছিল। সেনাবাহিনীকেও অনাকাঙ্ক্ষিত বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। বর্তমানে গণতান্ত্রিক পরিবেশে সেনাবাহিনীকে পুনরায় নিজেদের যোগ্যতা, দক্ষতা এবং পেশাদারিত্ব দিয়ে জনগণের আস্থায় থাকতে হবে।”
প্রধানমন্ত্রী সেনাসদরে পৌঁছালে সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এবং চিফ অব জেনারেল স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ মাইনুর রহমান তাকে স্বাগত জানান। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম শামছুল ইসলামসহ ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা সভায় উপস্থিত ছিলেন। সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি প্রতিরক্ষাসচিব আশরাফ উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন সেনা সদর নির্বাচনী পর্ষদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছবি তোলেন এবং সেনাবাহিনীর পরিদর্শন বইয়ে সেই করেন।


প্রকাশিত: July 27, 2026 | সময়: 4:57 am | সুমন শেখ