বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
সানশাইন ডেস্ক: রংপুরে আলুর ভালো উৎপাদন হলেও দাম না পেয়ে কয়েক বছর ধরে লোকসান গুণছেন কৃষক। সেইসঙ্গে হিমাগারে সংরক্ষণের পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় বাড়িতে রাখা আলুতেও পচন ধরেছে। এতে উভয় সংকটে পড়েছেন তারা।
কৃষকরা বলছেন, বর্তমানে আলু উৎপাদনে খরচ বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় বাজারে দাম নেই। বাড়তি দামের আশায় ঘরে সংরক্ষণ করা আলুতে পচন ধরেছে। এখন প্রতি কেজি আলু আট থেকে নয় টাকা দরে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। এতে প্রতি কেজি আলুতে সাত থেকে আট টাকা করে লোকসান হচ্ছে তাদের।
কৃষি বিভাগ বলছে, অনেক কৃষক আলু বিক্রি না করে হিমাগারে রাখতে চাইছেন কিন্তু জায়গা না থাকায় সেটি সম্ভব হচ্ছে না। রংপুরে মোট উৎপাদিত আলুর প্রায় ৭৬ শতাংশ সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ২০২৫ সালে রংপুর বিভাগের আট জেলায় ১১৫টি হিমাগারের ধারণক্ষমতা ছিল ১১ লাখ ২৯ হাজার ৩৫ টন। আর মজুদ ছিল প্রায় ১১ লাখ ১৬ হাজার ৪৫৫ টন। প্রতি কেজি আলুর জন্য হিমাগারের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬ দশমিক ২৫ টাকা।
চলতি বছর আলু উৎপাদন হয় ৫১ লাখ ৭৮ হাজার ৫৪৯ টন। আর হিমাগারের ধারণ ক্ষমতা ১১ লাখ ২৯ হাজার ৩৫ টন। সেই হিসাবে মোট উৎপাদনের ২২ শতাংশ আলু সংরক্ষণ করা যায়। তবে এবার রংপুরে দুটি এবং কুড়িগ্রামে একটি কোল্ড স্টোরেজ নির্মিত হয়েছে। ফলে গত বছরের তুলনায় চলতি বছর ধারণক্ষমতা কিছুটা বেড়েছে।
রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে রংপুর বিভাগের আট জেলায় এক লাখ ৯৭ হাজার ৬৯৬ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছে। গত বছরের তুলনায় জমির পরিমাণ কম হলেও উৎপাদন ভালো হয়েছে। শুধু রংপুর জেলাতেই প্রায় ১৮ লাখ ৭৫ হাজার ৭২৪ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে জেলা সদর, গংগাচড়া, তারাগঞ্জ ও পীরগাছা উপজেলায় সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, “এবার উৎপাদন ভালো হলেও হিমাগারের সীমিত ধারণক্ষমতার কারণে সংরক্ষণে চাপ তৈরি হয়েছে। আমরা কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি এবং নতুন হিমাগার স্থাপনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।” এ জেলায় ৪০টি হিমাগার রয়েছে; যার মধ্যে একটি সরকারি এবং বাকিগুলো বেসরকারি। এসব হিমাগারের মোট ধারণক্ষমতা প্রায় চার লাখ ১৬ হাজার ৩০০ টন; যা মোট উৎপাদনের তুলনায় অনেক কম। ফলে অধিকাংশ আলু রয়ে যাচ্ছে কৃষকের ঘরে।
সম্প্রতি তীব্র গরম ও টানা বৃষ্টিতে ঘরে রাখা আলুতে পচন ধরেছে। বিশেষ করে গংগাচড়া উপজেলার অনেক কৃষক বস্তায় বস্তায় আলু জমির পাশে কিংবা সড়কের ধারে ফেলে দিচ্ছেন। কৃষকরা বলছেন, হিমাগারে জায়গা সংকটের পাশাপাশি ভাড়াও বেশি হওয়ায় অনেকই আলু সংরক্ষণ করতে পারছেন না। ফলে বাধ্য হয়ে কেউ কেউ কম দামে বিক্রি করে দেন। আবার অনেকে বেশি দামের আশায় বাড়িতে আলু সংরক্ষণ করেছেন। কিন্তু সম্প্রতি পচন ধরায় আলু ফেলে দিতে হচ্ছে।
মাঠ পর্যায়ে দেখা গেছে, প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে খরচ পড়ছে ১৫ থেকে ২০ টাকা। হিমাগারে রাখলে খরচ বেড়ে ২০ থেকে ২৫ টাকা হয়। কিন্তু পাইকারি বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে আট থেকে নয় টাকা দরে। অন্যদিকে খুচরা বাজারে একই আলু ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গংগাচড়ার চওড়ার হাট এলাকার কৃষক মুরাদ হোসেন বলেন, ৩৭ দোন (প্রতি দোন ২৮ শতাংশ) জমিতে আলু চাষ করেছেন তিনি। প্রতি দোনে তার খরচ হয়েছে প্রায় ২৯ হাজার টাকা। কিন্তু বর্তমান বাজার দরে বিক্রি করলে খরচের অর্ধেকও উঠছে না।
দাম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে আরেক কৃষক মহিফুল ইসলাম বলেন, “ভাই, আপনাকে আর কী বলব! আমাদের কৃষকের খবর কেউ নেয় না। আমি ১৪ দোন জমিতে আলু চাষ করেছি। কিছু আলু হিমাগারে রেখেছি, আর কিছু বাড়িতে রাখছি। “হিমাগারে জায়গা না পেয়ে যে আলু বাড়িতে রেখেছি, তার অনেকটাই নষ্ট হচ্ছে। আমাদের মতো ছোট কৃষকের জন্য এটি বড় ক্ষতি। আর কয়েক দিনের মধ্যে বিক্রি করতে না পারলে সব আলু নষ্ট হয়ে যাবে, কিন্তু ক্রেতা নেই। যদি ক্রেতা পাই, তাহলে দাম দেয় সাড়ে আট টাকা।”
মাহিগঞ্জ বাজারে আলু কিনতে আসা নাজমুন্নাহার বেগম বলেন, বাজারে আলুর দাম কখনো কম, কখনো বেশি থাকে। কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও স্থায়ীভাবে কম দামে আলু পান না ভোক্তারা। খুচরা বিক্রেতা হারুন অর রশিদ বলেন, “পাইকারি বাজার থেকে যে দামে কিনি, সে অনুযায়ী বিক্রি করি। দাম কমলে আমাদের লাভও কমে যায়।”
রংপুর সিটি বাজারের আলু ব্যবসায়ী রাশেদ মিয়া বলেন, “এ বছর বাজারে আলুর সরবরাহ অনেক বেশি। হিমাগারের জায়গা না থাকায় কৃষকেরা একসঙ্গে বিক্রি করছেন, এতে দাম পড়ে গেছে।” বাজারে সরবরাহ বেশি হওয়ায় আলুর দাম কমে গেছে জানিয়ে ব্যবসায়ী জহুরুল ইসলাম জহু বলেন, হিমাগার কম থাকায় কৃষকেরা একসঙ্গে আলু বিক্রি করছেন, ফলে দাম আরও কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া জ্বালানি সংকটের কারণে বিদেশে আলু রপ্তানিও কম হয়েছে।
একটি বেসরকারি হিমাগারের মালিক বলেন, হিমাগার পরিচালনায় বিদ্যুৎ, রক্ষণাবেক্ষণ ও ঋণের চাপ অনেক বেশি। ফলে নতুন করে ধারণক্ষমতা বাড়ানো সহজ নয়। সরকারি সহায়তা পেলে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব। রংপুর কৃষাণ হিমাগারের ব্যবস্থাপক মাজেদুল ইসলাম বলেন, এ এলাকায় আলুর আবাদ বেশি হলেও সেই তুলনায় হিমাগার কম। আরও হিমাগার হলে ভালো হত। এ ব্যাপারে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, “আমাদের চাহিদা অনুযায়ী আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে আলু খালাস না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে কৃষকের পাশাপাশি হিমাগারগুলোরও ক্ষতি হবে।”
চলতি মৌসুমে বাম্পার ফলন হলেও বাজারে চাহিদা ও দামের সংকটে চরম বিপাকে পড়েছেন গংগাচড়ার কৃষকরা। এর মধ্যে ন্যায্য দাম না পেয়ে ঘরে সংরক্ষণ করা আলুতে পচন ধরেছে। এবার আগাম বৃষ্টিতে আলুর ক্ষতি হলেও ভালো দামের আশায় অনেকে কৃষক বিক্রি না করে ঘরে মজুদ রাখেন। কিন্তু বাজারে দাম না বাড়া, হিমাগার সংকট এবং অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে সংরক্ষণ করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত সেই আলু পচে যাচ্ছে।
উপজেলা কৃষি বিভাগ বলছে, ২০২৫-২৬ মৌসুমে গংগাচড়ায় প্রায় পাঁচ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। এতে উৎপাদন হয়েছে প্রায় এক লাখ ৫৪ হাজার টনের বেশি আলু। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, কৃষকরা বস্তায় বস্তায় আলু জমির পাশে কিংবা সড়কের ধারে ফেলে রেখেছেন। সম্প্রতি টানা বৃষ্টিপাতের কারণে আলুতে পচন ধরেছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
গঙ্গাচড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুবেল হুসাইন বলেন, এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আলুর ফলন খুব ভালো হয়েছে। কিন্তু বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে দাম কমে গেছে। কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের বিভিন্নভাবে পরামর্শ দিচ্ছেন; যাতে তারা আলু সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে সচেতন হতে পারেন। তিনি বলেন, হিমাগার সুবিধা সীমিত থাকায় সবাই সংরক্ষণ করতে পারছেন না। ভবিষ্যতে উৎপাদন পরিকল্পনা ও বাজার ব্যবস্থাপনা সমন্বয় করা জরুরি।
রংপুর জেলা কৃষি বিপণন বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক শাকিল আকতার বলছেন, “আমাদের এ অঞ্চলে যে জাতের আলু আবাদ হয়, সেই আলুর চাহিদা বাহিরে কম। এর ফলে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। তবে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি, মডেল ঘর তৈরি করার জন্য; যেখানে তিন থেকে চার মাস আলু সংরক্ষণ করা যেতে পারে।” সরকারি ক্রয় বাড়ানো এবং বিকল্প বাজার তৈরি করা গেলে কৃষকরা কিছুটা হলেও স্বস্তি পেতে পারেন বলে মনে করেন এই কৃষি কর্মকর্তা।
নীলফামারীতে তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে হিমাগারে রাখা আলু নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। ঘনঘন লোডশেডিংয়ে হিমাগারগুলো স্বাভাবিকভাবে চালানো সম্ভব না হওয়ায় জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। এতে বেড়েছে ব্যয়, আর সেই চাপ পড়ছে কৃষকদের ওপর।
নীলফামারী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে এ জেলায় আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২২ হাজার হেক্টর জমিতে। তবে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ২২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল পাঁচ লাখ ৩২ হাজার ৬২০ টন; যা অতিক্রম করে হয়েছে পাঁচ লাখ ৪৬ হাজার ৫৬০ টন।
নীলফামারী জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা উম্মে কুলসুম বলেন, এ জেলায় মোট হিমাগার ১১টি। এর মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)-এর দুটি এবং বেসরকারি মালিকানাধীন নয়টি হিমাগার রয়েছে।
হিমাগারগুলোতে ধারণক্ষমতা মাত্র ৯০ হাজার ১০০ টন; যা মোট উৎপাদিত আলুর ২৫ শতাংশেরও কম বলে জানান তিনি। ভালো দামের আশায় এসব হিমাগারে বিপুল পরিমাণ আলু সংরক্ষণ করেছেন কৃষকরা। কিন্তু বিদ্যুতের অপ্রতুল সরবরাহের কারণে হিমাগারগুলো জেনারেটরের মাধ্যমে চালাতে হচ্ছে। এতে প্রতি ঘণ্টায় ৭৮ থেকে ৮০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল খরচ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে হিমাগার কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ খরচ বাড়ানোর চিন্তা করছে; যা নিয়ে উদ্বিগ্ন কৃষকরা।
কিশোরগঞ্জ উপজেলার বড়ভিটা আলু চাষি শামীম বাবু বলেন, “অনেক আশা করে আলু হিমাগারে রেখেছিলাম যেন ভালো দামে বিক্রি করতে পারি। কিন্তু ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে হিমাগারে ভেতরে আলুর গায়ে পানি জমছে এবং পচন ধরার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যদি আলু নষ্ট হয়ে যায়, তবে কোথায় বিক্রি করব?”
ডোমার উপজেলার সোনারায় এলাকার কৃষক আব্দুল কাদের বলেন, “লাভের আশায় আমরা ধার-দেনা করে আলু ফলিয়েছি। যদি হিমাগারে সমস্যা হয়, তাহলে আমাদের সব বিনিয়োগ ডুবে যাবে। সরকার দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আমরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ব।” জেলা সদরের অংকুর সিড অ্যান্ড হিমাগার লিমিটেডের ব্যবস্থাপক সফি হায়দার বলেন, বর্তমান ডিজেলের উচ্চমূল্যের কারণে জেনারেটর চালিয়ে দীর্ঘক্ষণ হিমাগার ঠান্ডা রাখা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এতে করে হিমাগারের ভাড়ার চেয়ে পরিচালনা খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ না থাকায় মেশিনারিজের যান্ত্রিক ত্রুটিও দেখা দিচ্ছে।
বিদ্যুৎ না থাকায় হিমাগারে ঘণ্টায় ৭৫ থেকে ৮০ লিটার ডিজেল খরচ হচ্ছে বলে জানান তিনি। জলঢাকা উপজেলার মুক্তা হিমাগার ইউনিট-১ এর ব্যবস্থাপক বিমল চন্দ্র রায় বলেন, আগে যেখানে মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার ডিজেল লাগত, এখন তা বেড়ে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। আগে বিদ্যুৎ থাকায় খরচ নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। ডিজেলের খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
তিনি বলেন, “হিমাগারে এই ইউনিটে ধারণ ক্ষমতা ১৫ হাজার ৫০০ টন। বর্তমানে এখানে ১১ হাজার ১৮৭ টন আলু রয়েছে। বস্তা রয়েছে (৬০ কেজি করে) এক লাখ ৮৬ হাজার ৪৫০। আমাদের দ্বিতীয় ইউনিট কিশোরগঞ্জ উপজেলায়। সেটির ধারণ ক্ষমতা ১১ হাজার টন। বর্তমানে সেখানে আট হাজার ৭৭০ টন আলু রয়েছে।”