সর্বশেষ সংবাদ :

কৃষিকে টেকসই ও লাভজনক খাতে রূপান্তরে বহুমুখী পরিকল্পনা আছে: প্রধানমন্ত্রী

সানশাইন ডেস্ক: কৃষিকে টেকসই এবং লাভজনক খাতে রূপান্তর করার লক্ষ্যে সরকার সময়োপযোগী ৭ দফা পরিকল্পনা নিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংসদ অধিবেশনে বুধবার প্রশ্নোত্তর পর্বে টাঙ্গাইল-৬ আসনের সংসদ সদস্য রবিউল আলমের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী ৭ দফা পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে একটি কৃষি নির্ভর দেশ। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমরা যেটি সবাই দেখছি আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে বিভিন্ন বিষয়। যেমন জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জমির পরিমাণ হ্রাসএবং প্রযুক্তির যে সীমাবদ্ধতা, এ সকল কারণে কৃষি খাত বিভিন্ন রকম চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।
“আমাদেরকে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই কৃষি উৎপাদন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষিকে টেকসই এবং লাভজনক খাতে রূপান্তর করার লক্ষ্যে সমগ্র দেশবাসী দেখেছেন আমরা এরই ভিতরে ১৪ই এপ্রিল কৃষক কার্ড, আমরা যেটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম নির্বাচনের পূর্বে সেটির কাজ আমরা শুরু করেছি কৃষক কার্ড আমরা বিতরণ করেছি।” কৃষক কার্ডের মাধ্যমে যেসব সুবিধা পাওয়া যাবে তা তুলে ধরেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, কৃষি কার্ডের মাধ্যমে ১০টি সেবা যেমন ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ বিতরণ, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা প্রদান, স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ, ন্যায্যমূল্যে সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষি ঋণ, কৃষি বীমা সুবিধা, ন্যায্যমূল্যে কৃষি পণ্য বিক্রয়ের সুবিধা, কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আবহাওয়া ও বাজার তথ্য প্রাপ্তিসহ ফসলের রোগ-বালাই দমনের পরামর্শ দেওয়া হবে।
পর্যায়ক্রমে দেশের ২ কোটি ৭৫ লাখ কৃষকে এ কার্ড দেওয়া হবে বলে জানিয়ছেন তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী কৃষি উন্নয়নে সরকারের ৭ দফা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। সেগুলোর মধ্যে আছে-আধুনিক সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, পতিত জমি আবাদের আওতায় আনা এবং জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য ‘ক্রপ জোনিং’ পদ্ধতি চালু করা।
কৃষি পণ্যের বহুমুখীকরণ, কৃষকদের জন্য প্রণোদনা ও সহায়তা কার্যক্রম স্বচ্ছ-জবাবদিহিমূলক করার জন্য কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের বীজ, সার, কৃষিযন্ত্রসহ বিভিন্ন খাতে ভুর্তকি প্রদান, কৃষকদের জন্য স্বল্প সুদের কৃষিঋণ, ফসল বীমা চালুকরণ।
কৃষিপণ্য সংরক্ষণে লক্ষ্যে আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ ও গুদাম নির্মাণ এবং ফল ও সবজি সংরক্ষণের জন্য এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণ। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) এর মাধ্যমে বেশি ফলনশীল রোগ প্রতিরোধী এবং স্বল্প মেয়াদি নতুন জাতের ফসল উদ্ভাবনের উদ্যোগ।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ‘ক্লইমেট স্মার্ট কৃষি’ বাস্তবায়ন। টেকসই কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষিকে পরিবেশ বান্ধব করা। এছাড়া কম সেচ, কম রাসায়নিক সার ও কম কীটনাশক প্রয়োগের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন, প্রি-পেইড মিটার, খামারি অ্যাপস ব্যবহার। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এদিন বিকার ৩টায় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের প্রথম ত্রিশ মিনিট ছিল প্রধানমন্ত্রীর জন্য প্রশ্নোত্তর পর্ব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষির উন্নয়নে বর্তমান সরকার আরো অনেকগুলো সময়উপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য সরকার উন্নত ও উচ্চ ফলনশীল বীজ সুষম সার ব্যবহারের পাশাপাশি আধুনিক সেচ ব্যবস্থা সম্প্রষণের পরিকল্পনা নিয়েছে। এইজন্য ইতিমধ্যেই ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচি সরকার হাতে নিয়েছে যা আগামী পাঁচ বছরে করা হবে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ভুর্তুকি প্রদান করে ট্রাক্টর হারভেস্টার রিপারসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কৃষকদের কাছে সহজলভ্য করার পরিকল্পনা বর্তমান সরকারে হয়েছে। ”
পতিত জমি আবাদের আওতায় আনা এবং জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য ‘ক্রপ জোনিং’ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঞ্চলের মাটি, আবহাওয়া ও পরিবেশের উপযোগী ফসল নির্ধারণ করা হয়। ফলে জমির অপচয় কমে এবং উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।
একই সাথে পতিত জমি চিহ্নিত করে সেগুলো আবাদের আওতায় আনার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে, যেমন খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে পতিত জমি কৃষির আওতায় আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া, সিলেট অঞ্চলে পতিত জমিসহ চরাঞ্চলের পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আনার জন্য বিশেষ প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণে সরকারের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এক সময় ধান নির্ভর কৃষি ব্যবস্থা এখন ধীরে ধীরে ফল, সবজি, ডাল, তেলবীজ, মসলা, ফুল চাষ খাতে সম্প্রসারণ করার জন্য সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। “কৃষকদের জন্য প্রণোদনা ও সহায়তা কার্যক্রম স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার জন্য কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের বীজ, সার, কৃষিযন্ত্র ক্রয়সহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি প্রদান করা হবে। তাছাড়া, কৃষকদের জন্য স্বল্প সুদের কৃষিঋণ এবং ফসল বীমা চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের জন্যও বিশেষ সহায়তা কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। দেশের ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষিদের কল্যাণে প্রতি অর্থবছর কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাজেটের ‘কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা’ খাতে অর্থ বরাদ্দ প্রদান করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা খাতে ৭ শত কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এই বরাদ্দ থেকে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ বিতরণ বাবদ ৪ শত ১ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা ছাড় করা হয়েছে। এতে ২৫ লক্ষ ২২ হাজার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক উপকৃত হয়েছেন।
তিনি বলেন, “কৃষিপণ্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ ও গুদাম নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া ফল ও সবজি সংরক্ষণের জন্য মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন এবং পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কৃষিপণ্য রপ্তানির লক্ষ্যে, উত্তরাঞ্চলে কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং ক্রয়কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।” কৃষি গবেষণা ও উদ্ভাবনে সরকারের কার্যক্রমও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
টাঙ্গাইল-৬ আসনের সংসদ সদস্য রবিউল আউয়ালের একটি সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির একটি পরিকল্পনা সরকার গ্রহণ করছে। আপনি জানেন যে, বিভিন্ন মাননীয় স্পিকার কেমিক্যাল সার ব্যবহার করার ফলে আমাদের অনেক জায়গায় মাটির উর্বরতা কমে গিয়েছে এবং সেজন্য মাটির বিভিন্ন বিষয় টেস্ট করার মাধ্যমে আমরা ন্যানো সারের প্রয়োগ বৃদ্ধি করতে চাচ্ছি দেশে। প্রচলনটা তৈরি করতে চাচ্ছি যাতে করে সারের খরচও কমে এবং মাটির যে উর্বরতা শক্তি সেটি নষ্ট না হয়।
“একই সাথে আরেকটি বিষয় আছে, বিভিন্ন জায়গায় মাটির যে উর্বরতা নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে চুনের ব্যবহার করার মাধ্যমে মাটির উর্বতা বৃদ্ধি করা সম্ভবৃরাসায়নিক যে ক্রিয়াটি থাকে সেটিকে নিউট্রালাইজ করা সম্ভব সেই উদ্যোগও গ্রহণ করছে।”
নেত্রকোনো-৫ আসনের সংসদ সদস্য মাসুম মোস্তফার সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি বলেছি যে প্রান্তিক কৃষক যারা আছেন তাদেরকে আমরা এই কৃষক কার্ড সহায়তার মধ্যে নিয়ে এসেছি এবং প্রান্তিক কৃষক বা একদম ক্ষুদ্র কৃষক যারা আছেন তাদেরকে সহায়তা যেটা আমরা দিচ্ছি। সেইটার ভেতর দিয়েই আমরা কৃষি শ্রমিক যারা আছে তাদেরকে আমরা সহায়তা পৌঁছে দিতে চেষ্টা করব। “তাদেরকে যে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে আমরা যেই অর্থনৈতিক সহযোগিতা করছি সেখান থেকেই একদম শ্রমিক যারা আছেন তারাও সেই সহযোগিতার অংশীদার হবেন।”


প্রকাশিত: এপ্রিল ২৩, ২০২৬ | সময়: ৭:১৭ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ