, , ।
স্টাফ রিপোর্টার, দুর্গাপুর: রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব অধ্যাপক জোবায়েদ হোসেন সহ বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের ১৩ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাদাবি ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। থানা পুলিশ প্রথমে রাজনৈতিক চাপের মুখে মামলা নিতে অপারগতা জানালেও শেষ পর্যন্ত মামলা নিয়েছেন। তবে ওই মামলার এজাহার নামীয় কোনো আসামীকে গ্রেপ্তার করেনি থানা পুলিশ।
উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের সূখানদীঘি ওয়ার্ড বিএনপির কর্মী ও মৎস্য ব্যবসায়ী সেকেন্দার আলীর স্ত্রী পলি খাতুন বাদী হয়ে সপ্তাহ খানেক আগে থানায় লিখিত অভিযোগ করলেও গড়িমসি করে গত মঙ্গলবার ৭ এপ্রিল রাতে বাদীর লিখিত অভিযোগ এফআইআর হিসেবে গ্রহণ করেন পুলিশ।
চাঁদাদাবির অভিযোগ এনে থানায় মামলা দায়ের করা হলেও মূলত ঘটনাটি আরও গভীরের। পাল্টাপাল্টি কমিটি গঠন নিয়ে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের উভয় পক্ষের মধ্যে গত কয়েকদিন ধরে দ্বন্দ্ব বেশ প্রকট হয়ে উঠে। উভয় পক্ষই নিজেদের অনুগত কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন।
রাজনৈতিকভাবে কে কতবড় ক্ষমতাসীন তা জানান দিতে মাঝেমধ্যে একপক্ষ অপর পক্ষকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ থেকে শুরু করে প্রাণনাশের হুমকি-ধমকিও দিতেন। তবে ঘটনা যেভাবেই ঘটুক না কেন, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জের ধরেই ওয়ার্ড বিএনপির কর্মী সেকেন্দার আলীকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছে বলে দলের একটি সূত্র জানিয়েছেন।
উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব জোবায়েদ হোসেন ছাড়াও মামলার অপর আসামীরা হলেন, ইলিয়াস উল ইসলাম ওরফে লাকী (৪৮), জুয়েল মন্ডল (৩৫), হারেজ মন্ডল (৩৮, ঈসা মন্ডল (৪৪), শহিদুল ইসলাম (৪০), হৃদয় মন্ডল (২৪), বাবু (৪০), জাহিদ হোসেন (২২), স্বপন মিয়া (২৫) সাইদুর রহমান (৫৫), তৌবী রহমান (৩৫), সাকিম (৪৫) সহ অজ্ঞাতনামা আরও ৪/৫ জন। জোবায়েদ হোসেন উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব হলেও মামলার অপর আসামীরা বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী।
থানায় দায়ের করা এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, উপজেলার সুখানদীঘি গ্রামের বিএনপি কর্মী সেকেন্দার আলী সম্পর্কে বাদীর স্বামী হোন। সেকেন্দার আলীর সঙ্গে একই গ্রামের ইলিয়াস উল ইসলাম ওরফে লাকী ও জুয়েলের পুকুর লীজ সংক্রান্ত ঘটনায় পাওনা টাকা নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে বিরোধ ও পাল্টাপাল্টি মামলা চলছিল। ওই ঘটনার জের ধরে গত সোমবার ৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় সুখানদীঘি গ্রামের ক্লিনিক মোড়ে ওয়ার্ড বিএনপির অস্থায়ী কার্যালয়ে সেকেন্দার আলীকে ডেকে নেয়া হয়। এক পর্যায়ে কার্যালয়ের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) গভীর নলকূপের অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় সেকেন্দার আলীর কাছে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন বিএনপির স্থানীয় কয়েকজন নেতাকর্মী।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, বাদীর স্বামী সেকেন্দার আলী তাদের দাবিকৃত চাঁদার টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে এজাহারে উল্লেখিত আসামীরা সেকেন্দার আলীকে হত্যার উদ্দেশ্যে লোহার রড, চেয়ারের পায়া ও বিভিন্ন ধরনের দেশীয় অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি মারপিট শুরু করে। একপর্যায়ে আসামীরা সেকেন্দার আলীকে হত্যার উদ্দেশ্য শরীরের স্পর্শকাতর অংশ সহ শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত করে। ঘটনার একপর্যায়ে সেকেন্দার আলী সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে।
বাদী পলি খাতুন এজাহারে আরও উল্লেখ করেন, হত্যার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত হামলার পর গুরুতর আশংকাজনক অবস্থায় সেকেন্দার আলীকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেয়া হলেও হামলার খবর শুনে উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব জোবায়েদ হোসেন খুশি হয়ে আসামীদের বকশিস হিসেবে নগদ টাকা দেন। এতে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, বিএনপি নেতা জোবায়েদ হোসেন হামলার ঘটনা আগে থেকেই জানতেন এবং তার হুকুম ও নির্দেশেই সেকেন্দার আলীকে পূর্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দলীয় কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদার টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে জোবায়েদ হোসেন তার আজ্ঞাবহ নেতাকর্মীদের দিয়ে সেকেন্দার আলীকে হত্যার চেষ্টা চালান। মুমূর্ষু সেকেন্দার আলীর নিস্তেজ শরীর মাটিতে লুটিয়ে পড়লে আসামীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব জোবায়েদ হোসেনের কাছে গিয়ে আশ্রয় নেয়।
সেকেন্দার আলীর স্ত্রী পলি খাতুন আরও অভিযোগ করেন, এর আগে সরকারের খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির ১৫ টাকা কেজি চালের ডিলার নিয়ে দেবার কথা বলে ৪০ হাজার টাকা চাঁদা নেয় জোবায়েদ হোসেন ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা। পরে অপর এক ব্যাক্তির কাছ থেকে আরও বেশি টাকা নিয়ে চালের ডিলার ওই ব্যাক্তিকে পাইয়ে দেয়। ওই ঘটনার পর আমি আমার ৪০ হাজার টাকা ফেরত চাইলে আমাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেয়া হয়। ওই ঘটনায় দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছে নালিশ দিয়েও কোনো ফল পাননি বলেও পলি খাতুন অভিযোগ করেন।
তবে অপর একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, সম্প্রতি জয়নগর ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির পাল্টাপাল্টি কমিটি ঘোষণা নিয়ে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হয়।
পাল্টাপাল্টি কমিটির দু’টি তালিকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। এরপর দু’টি কমিটিই বাতিল করে ফের দলীয় প্যাডে লিখিত প্রেস বিজ্ঞপ্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়। উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কামরুজ্জামান আয়নাল ও সদস্য সচিব জোবায়েদ হোসেন তাতে স্বাক্ষর করেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব অধ্যাপক জোবায়েদ হোসেন ওই ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে দাবি করেন, সেই দিনের ঘটনার সাথে তিনি কোনোভাবেই জড়িত নন। এমনকি ওই ধরনের ঘটনা তার এলাকায় ঘটেছে সেটাও তিনি তাৎক্ষণিক জানতেন না। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় নেতাকর্মীরা ফোন করে বিষয়টি তাকে জানিয়েছেন। রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে মামলার এজাহারে আসামী হিসেবে তার নামটা দেয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
দুর্গাপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম জানান, ওই ঘটনার প্রেক্ষিতে থানায় লিখিত অভিযোগ করেন আহত সেকেন্দার আলীর স্ত্রী পলি খাতুন। ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ-আলোচনা করে বাদীর অভিযোগটি এজাহার হিসেবে রুজু করা হয়েছে। তবে আসামীরা ঘটনার পরপরই এলাকা ছেড়ে পালানোর কারণে কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি বলেও জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।