বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
স্টাফ রিপোর্টার: শীতকালে খেজুর গুড়ের কদর বাড়ার ঐতিহ্য আবহমানকাল থেকে। কারণ এটি বাঙালির ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা পিঠা-পুলির স্বাদ বাড়ায়, প্রাকৃতিক শক্তি দেয় এবং এতে থাকা ভিটামিন ও মিনারেলস স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হওয়ায় এর চাহিদা ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। এই সময়ে গাছিরা গাছ প্রস্তুত করে রস সংগ্রহ করেন এবং গুড় ও পাটালি তৈরি করে, যা গ্রাম থেকে শহরে ব্যাপক চাহিদা তৈরি করে।
হেমন্তের মাঝামাঝি থেকে বইতে শুরু করে শীতের আগমনী বার্তা। এই সময়ে বাংলাদেশের সংস্কৃতির এক প্রধান অনুষঙ্গ খেজুর রস। গাছিরা প্রস্তুত করতে শুরু করেছেন খেজুর গাছ। কোথাও কোথাও রস সংগ্রহ শেষে গুড় তৈরিতে ব্যস্ত গাছিরা। যদিও নিপা ভাইরাসের অজুহাতে সদ্য নামানো কাচা সাদা রস অনেকের কাছেই জ্বরের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজশাহীর বিশেষ করে দুর্গাপুর, পুঠিয়া, চারঘাট ও বাঘায় খেজুর রসের লালি ও গুড়ের গন্ধে চারপাশ ম-ম করছে। শীতের আমেজ বাড়ার সাথে সাথে খেজুরের লালি ও গুড়ের কদর বেড়ে যায়। তাই শীতের শুরু থেকেই গাছিরা প্রস্তুত করতে থাকেন খেজুর রসের লালি ও গুড়। যদিও কিছু অসাধু মুনাফালোভি ব্যবসায়ীরা খেজুর গুড়ের বারোটা বাজিয়ে যাচ্ছে।
একসময় এলাকার লোকজনই খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করতেন। এখন এসব গাছ চুক্তি ভিত্তিতে দেয়া হয় অন্য এলাকার গাছিদের। গাছিরা জানান, তাদের এলাকার অনেক গাছি শীত মৌসুমে এ এলাকায় খেজুর রস সংগ্রহের জন্য এসে থাকেন। এবারেও অনেকেই এসেছেন। রস জাল করে গুড় তৈরী করেন। বিভিন্ন পাইকারি বাজারে বিক্রি করে যে অর্থ আসে তাতে তারা খুশি।
পৌষ মাস আসার সাথে সাথে শীতের তীব্রতা বেড়েছে। ঘন কুয়াশা আর হিমেল হাওয়ায় জোরেশোরে শীতের আমেজ চলছে। শীত মানেই খেজুরের রস, শীত মানেই পিঠা। তাই শীত মৌসুম আসার সাথে সাথে ব্যস্ত হয়ে উঠেন গাছিরা। শীত হলো খেজুর রস আহরণের মৌসুম। এ মৌসুমে আবহমান বাংলায় খেজুর রস থেকে তৈরি পিঠার উৎসব আর নবান্নের উৎসব একটি প্রাচীন ঐতিহ্য। খেজুর রসের পিঠা-পায়েস বাংলার উপাদেয় খাদ্যতালিকায় এখনও জনপ্রিয়। শীতের মৌসুমজুড়ে চলে রস, গুড়, পিঠা-পুলি, পায়েস খাওয়ার পালা। নতুন গুড়ের মিষ্টি গন্ধে ধীরে ধীরে আমোদিত হয়ে উঠছে গ্রামবাংলা।
শীতের দিনে শহরাঞ্চলেও খেজুর গুড়ের কদর কম নয়। নগরীর গুড় ব্যবসায়ী ইকবাল হোসেন বলেন আসল গুড় খেতে বা পেতে হলে লালি গুড় নিতে হবে। চকি গুড়ের মধ্যে অনিচ্ছা সত্বেও কিছু চিনি মেশাতে হয়। চিনি না মেশালে চকি শক্ত থাকবে না। নুয়ে নুয়ে ভেঙ্গে যাবে এবং পড়ে যাবে। ব্যবসা যখন থেকে চালু হয়েছে-সৎ আর অসৎ ভাল-মন্দ তখন থেকেই শুরু হয়েছে। আপনাকে বিশ্বাস রাখতে এবং ভাল ব্যবসায়ী খুঁজে গুড় নিলে ঠকবেন না।
এদিকে কৃষিবিদরা মনে করেন, খেজুর গাছ আমাদের অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এর পরিকল্পিত আবাদ তেমন নেই। উপরন্তু নির্বিচারে খেজুর গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। যা পল্লিবাংলার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। খেজুর গাছ থেকে সুমিষ্ট রস, গুড় আহরণে কেবল আমদের রসনা তৃপ্তির জন্য নয়; আমাদের পরিবেশ ও প্রাণ-প্রকৃতির ভারসাম্য সুরক্ষায় খেজুর গাছের আবাদ সম্প্রসারণ জরুরি। অপরদিকে সচেতন মহল মনে করেন, খেজুর গাছ আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সাহিত্য তথা জীবনধারায় মিশে আছে। এই ঐতিহ্যকে আমাদের রক্ষা করতে হবে।