সর্বশেষ সংবাদ :

বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ২০২৫ সালের কিছু স্মরণীয় লড়াই

স্পোর্টস ডেস্ক: উত্তেজনা আর রোমাঞ্চে ঠাসা বাছাই পেরিয়ে, শুরু হয়ে গেছে ফুটবল বিশ্বকাপের ক্ষণগণনা। ৪৮ দলের মহারণের টিকেট পেয়ে গেছে ৪২টি দল। মহাদেশীয় বাছাইপর্বগুলো অসাধারণ সব ম্যাচের জন্ম দিয়েছে, যেখানে বিশেষ করে স্মরণীয় হয়ে আছে বেশ কিছু লড়াই। ২০২৫ এর শেষ প্রান্তে এসে সেইসব রুদ্ধশ্বাস ও মোড় বদলে দেওয়া পাঁচটি ম্যাচের দিকে ফিরে দেখা যাক।
ইরান ২-২ উজবেকিস্তান: তেহরানের আজাদি স্টেডিয়ামে, গত ২৫ মার্চের সেই লড়াইয়ে দুই দলের সামনেই ছিল বিশ্বকাপে জায়গা পাকা করার সুযোগ। একটা সময় মনে হচ্ছিল, দুইবার এগিয়ে যাওয়া সফরকারীরা জয় দিয়েই লক্ষ্য পূরণ করতে যাচ্ছে। কিন্তু একজন সবকিছু বদলে দেন, মেহেদি তারেমি।
ম্যাচের শুরুর দিকেই এর্কিনভের গোলে লক্ষ্যের পথে চলা শুরু করে উজবেকিস্তান। এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় তারা। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ডি-বক্সের মুখ থেকে বুলেট গতির শটে সমতা ফেরান তারেমি। পরের মিনিটেই ফেইজুল্লায়েভের গোলে আবার এগিয়ে যায় উজবেকিস্তান। এই ব্যবধান ধরে রেখে এগিয়ে যাচ্ছিল তারা; কিন্তু ৮৩তম মিনিটে আবার জালে বল পাঠান ইন্টার মিলান স্ট্রাইকার তারেমি। মহামূল্যবান একটি পয়েন্ট তুলে নিয়ে টানা চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখে ইরান। পরে অবশ্য উজবেকিস্তানও গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে।
আর্জেন্টিনা ৪-১ ব্রাজিল: আর্জেন্টিনার ধারাবাহিক উন্নতি ও ব্রাজিলের অবনতিতে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর ম্যাচে এখন আর আগের মতো লড়াইয়ের দেখা মেলে না। যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে গত ২৫ মার্চ, বুয়েন্স আইরেসে। এস্তাদিও মনুমেন্তালের সেই ম্যাচের আগে ব্রাজিলের তরফ থেকে ছোড়া হয়েছিল হুঙ্কার, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের মাঠে জয়গান গেয়েই যেন হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার আশায় ছিল দলটি। কিন্তু মাঠে নেমে ভীষণ তেতো অভিজ্ঞতা হয় তাদের।
দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে নিজেদের মেলে ধরে আলবিসেলেস্তেরা, আর তাতে নাস্তানাবুদ হয় সেলেসাওরা। প্রথমার্ধেই পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের জালে তিনবার বল পাঠায় আর্জেন্টিনা; চতুর্থ মিনিটে যার শুরুটা হয় হুলিয়ান আলভারেসের গোলে, বিরতির আগে তাদের অন্য দুটি গোল করেন এন্সো ফের্নান্দেস ও আলেক্সিস মাক আলিস্তের। দুই গোল হজমের পর মাথেউস কুইয়া একটি ফিরিয়ে দিলেও, সত্যিকার অর্থে ম্যাচে কখনোই ফিরতে পারেনি সফরকারীরা। স্বনামধন্য কোচ দিয়েগো সিমেওনের ছেলে জুলিয়ানো সিমেওনের দ্বিতীয়ার্ধের গোলে বিশাল জয়ের আনন্দে ভাসে সবশেষ কাতার বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়নরা।
একই সঙ্গে বাছাই পেরিয়ে প্রথম দল হিসেবে আসছে বিশ্বকাপে খেলাও নিশ্চিত করে মেসি-আলভারেসরা।
ইসরায়েল ৪-৫ ইতালি: মাস তিনেক আগের সেদিনে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা রোমাঞ্চে ঠাসা এক লড়াইয়ের জন্ম হয়। আগের দুটি বিশ্বকাপে খেলতে না পারা ইতালি এবার বাছাইয়ের একদম শুরুতেই বড় ধাক্কা খায়, হেরে বসে তারা নরওয়ের বিপক্ষে। পরের দুটি ম্যাচে জিতে ছন্দে ফেরার আভাস দেয় তারা। এরপরই, ইসরায়েলের বিপক্ষে তুমুল সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়ে দলটি।
আত্মঘাতী গোলে শুরুতেই পিছিয়ে পড়ে চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। সেই ধাক্কা সামলে বিরতির আগে মোইজে কিনের গোলে সমতায় ফেরে তারা। মূল গোল উৎসবের শুরু হয় দ্বিতীয়ার্ধে; যেখানে প্রথম ১২ মিনিটেই দুই পাশে মিলিয়ে তিনবার জালে বল জড়ায়। এর মাঝেই আবার পিছিয়ে পড়ে ইতালি। রোমাঞ্চের উত্তুঙ্গ স্পর্শ করা সেই লড়াইয়ে ফের ঘুরে দাঁড়ায় ইতালি। কিনের দ্বিতীয় এবং পলিতানো ও রাসপাদোরির গোলে ৮১তম মিনিটে দুই গোলের লিড নেয় তারা। কিন্তু বারবার মোড় বদলের লড়াইয়ে তখনও ঢের নাটকীয়তা বাকি ছিল।
নির্ধারিত সময়ের শেষ দিকে ব্যবধান ঘুচিয়ে স্কোরলাইন ৪-৪ করে ফেলে ইসরায়েল। ইতালিয়ানদের মনে তখন আরেকবার বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন মিথ্যে হওয়ার শঙ্কা হয়তো জেঁকে বসতে শুরু করেছিল; তবে যোগ করা সময়ে ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেন সান্দ্রো তোলানি। ৯ গোলের অবিশ্বাস্য লড়াইয়ে জিতে স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখে ইতালি। বিশ্বকাপের টিকেট এখনও অবশ্য পায়নি দলটি। নরওয়ের পেছনে থেকে গ্রুপ রানার্সআপ হওয়ায় তাদের খেলতে হবে প্লে-অফ।
ডিআর কঙ্গো ২-৩ সেনেগাল: ফিরতি লেগে দুই দলের এই সাক্ষাতই মূলত গড়ে দেয় তাদের গ্রুপের চূড়ান্ত দৃশ্যপট। সাত রাউন্ডের লড়াই শেষে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছিল কঙ্গো। ঘরের মাঠে গত সেপ্টেম্বরের ওই ম্যাচে ৩৩ মিনিটের মধ্যে দুই গোল করে জয়ের সম্ভাবনাও জোরাল করে তারা, সেই সঙ্গে সরাসরি বিশ্বকাপে ওঠারও। তাদের সেই স্বপ্ন ভেঙে অসাধারণ এক প্রত্যাবর্তনের গল্প লেখে সেনেগাল। দুই গোলে পিছিয়ে পড়ার ছয় মিনিট পর, পাপ গেয়ির গোলে ব্যবধান কমিয়ে বিরতিতে যায় তারা। আর দ্বিতীয়ার্ধে জ্যাকসন ও পাপ সারের গোলে পায় ৩-২ ব্যবধানের নাটকীয় জয়। পরের দুই রাউন্ডেও জিতে সরাসরি বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয় সেনেগাল। হতাশায় পুড়তে হয় কঙ্গোকে। অবশ্য আন্ত:মহাদেশীয় প্লে-অফ জায়গা পাওয়ায় এখনও তাদের মূল পর্বে খেলার আশা বেঁচে আছে।
কোস্টা রিকা ৩-৩ হাইতি: ঘরের মাঠে প্রথমার্ধেই দুই গোলে এগিয়ে গিয়ে সহজ জয়ের সম্ভাবনা জাগায় কোস্টা রিকা। কিন্তু বদলি নেমে একাই সেদিন হ্যাটট্রিক করে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেন ডুকঁন নাজোঁ। বিরতির আগেই অভিজ্ঞ এই ফরোয়ার্ডকে বদলি নামায় হাইতির কোচ। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে তিন মিনিটের মধ্যে দুটি গোল করে সমতা টানেন তিনি, এর মধ্যে ৫৮তম মিনিটে বাইসাইকেল কিকে করেছিলেন দ্বিতীয় গোলটি।
৮৬তম মিনিটে তার হ্যাটট্রিক পূরণের গোলে জয়ের সম্ভাবনাও জাগে হাইতির। তবে যোগ করা সময়ে আবার গোল হজম করায় জয়ের স্বাদ সেদিন পায়নি তারা; কিন্তু গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে ইতিহাসের দ্বিতীয় এবং ১৯৭৪ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলা নিশ্চিত করে হাইতি।


প্রকাশিত: December 26, 2025 | সময়: 2:30 am | সুমন শেখ