সর্বশেষ সংবাদ :

তিন বাংলাদেশীকে লিবিয়ায় অপহরণ করে নির্যাতনের ভিডিও দেখিয়ে মুক্তিপণ দাবি

আক্কেলপুর প্রতিনিধি: লিবিয়ায় মুক্তিপণের দাবিতে তিন বাংলাদেশীকে অপহরণের পর নির্যাতন করা হচ্ছে এমন অডিও ক্লিপ এবং ভিডিও পরিবারের সদস্যদের কাছে ফোনের মাধ্যমে পাঠিয়ে মোটা অঙ্কের মুক্তিপন দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অপহৃত প্রবাসীদের পরিবারের সদস্যরা। অপহরণকারী চক্রটি ডাচ বাংলা ব্যাংকের মতিঝিল কর্পোরেট শাখার একটি হিসাব নম্বরে মুক্তিপণের টাকা পাঠাতে বলেছেন। এতে দেশে থাকা স্বজনরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। ইতিমধ্যে দুটি পরিবার মুক্তিপণের জন্য কিছু টাকা পাঠিয়েছেন। তাতে কোন লাভ হয়নি।
লিবিয়ায় অপহৃত প্রবাসীরা হলেন, জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার রায়কালী ইউনিয়নের গুডুম্বা গ্রামের গোলাম রব্বানী, একই ইউনিয়নের পুন্ডুরিয়া দক্ষিণ মন্ডল পাড়া গ্রামের আব্দুল করিম। একই উপজেলার সোনামুখী ইউনিয়নের রামশালা গ্রামের রুহুল আমিন। এরমধ্যে গোলাম রব্বানীকে পনেরো দিন আগে আর অন্য দুজনকে ছয়-সাত দিন আগে অপহরণ করা হয়েছে। রুহুল আমিন ও আব্দুল করিম সর্ম্পকে শ্যালক-ভগ্নিপতি।
মুক্তিপন চেয়ে পরিবারকে পাঠানো এক ভিডিওতে দেখা যায়, লিবিয়া প্রবাসী গোলাম রব্বানীকে একটি আবদ্ধ ঘড়ে হাত-পা বেঁধে ফেলে মারধর করা হচ্ছে। সেখানে রাইফেল দিয়ে মেরে ফেলার ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। রাইফেলের মাথা দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে খুঁচিয়ে আঘাত করা হচ্ছে। এতে গালাম রব্বানী চিৎকার করছেন।
প্রবাসীদের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গোলাম রব্বানী ২০১৫ সালে স্থানীয় দালালের মাধ্যমে কাজের উদ্দেশ্যে লিবিয়া যান। সেখানে বেশ কয়েকবছর কাজ করে ২০২২ সালের ছুটি বাড়িতে আসেন। ছুটি কাটিয়ে আবারও ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে লিবিয়ায় যান। সেখানে জিলথান শহরে তিনি থাকতেন। এরই মধ্যে গত ১৫ দিন আগে সেখানকার একটি চক্র তাকে রংয়ের কাজ দেওয়ার কথা বলে অপহরন করে।
পরে ৩০ নভেম্বর তাঁর ফোন থেকে দেশে থাকা স্ত্রীর ফোনে শারীরিক নির্যাতনের কিছু ভিডিও পাঠিয়ে ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপন দাবি করে চক্রটি। তারা ডাচ্ বাংলা ব্যাংকের ঢাকার মতিঝিল কর্পোরেট শাখার হিসাব নম্বর ২৭৬১৫৭০৩২৬৮৪০, রাউটিং নম্বর- ০৯০২৭১৩৯৯ তে মুক্তিপণের ৩০ লাখ টাকা জমা দিতে বলেন। সময় মতো টাকা দিতে না পারায় গোলাম রব্বানীর হাত-পা বেঁধে আবারও নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে দেন। এখন তাঁরা ১৫ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দাবি করছে।
এদিকে উপজেলার পুন্ডুরিয়া গ্রামের আব্দুল করিম ১৩ বছর ধরে লিবিয়া আছেন। তিনি গত বছর আট মাসের ছুটিতে বাড়ি এসে আবারও লিবিয়া যান। গত ৬ ডিসেম্বর তাকেও রংয়ের কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অপহরন করা হয়। পরে তার স্ত্রীর কাছে একই কায়দায় নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে দিয়ে ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
তার স্ত্রী স্বামীকে বাঁচাতে ডাচ্ বাংলা ব্যাংকের ওই একাউন্টে এক লাখ টাকা পাঠান। কিন্তু তাতেও কোন লাভ হয়নি। এরপর অপহরনের শিকার হন তার আত্মীয় রুহুল আমিন। সে অপহরণ হওয়ার আগে নতুন কাজ দেখতে যাচ্ছে বলে দেশে থাকা তাঁর স্ত্রীকে জানান।
পরে সে তার স্ত্রীকে একটি গাড়ির ছবি তুলে পাঠায়। কয়েকদিন পর তার ফোন থেকে স্ত্রীর ফোনে শারীরিকভাবে নির্যাতনের অডিও রের্কড পাঠিয়ে ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
লিবিয়ায় অপহৃত প্রবাসী গোলাম রব্বানীর বোন বুলবুলি বলেন, আমার ভাইকে প্রায় পনেরো দিন আগে লিবিয়ার কয়েকজন লোক হটাৎ রঙের কাজ করে নিবে বলে ডেকে নিয়ে গিয়ে আটক করে অমানুষিক নির্যাতন করতে থাকে। প্রথমে ৩০ লক্ষ টাকা মুক্তিপন চাইলেও পরে ২৫ লক্ষ টাকা এবং সর্বশেষ ১৫ লক্ষ টাকা মুক্তিপন চাইছে।
তার স্ত্রী জুথি আক্তার বলেন, লিবিয়ায় আমার স্বামীকে অপহরণ করে আমার ফোনে স্বামীর হাত-পা বেঁধে নির্যাতন করে ভিডিও পাঠিয়ে ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে তারা। আমি আমার স্বামীকে উদ্ধার করতে প্রবাসী কল্যাণের ওয়েজ অর্নার বোর্ডের সহযোগিতা চেয়ে মহাপরিচালকের কাছে আবেদন করেছি।
অপহৃত আব্দুল করিম মন্ডলের বাবা আজিজুর রহমান বলেন, লিবিয়ায় আমার ছেলে ভবনে রংয়ের কাজ করে। সেখানে একটি বাড়িতে রংয়ের কাজ করে দেওয়ার কথা বলে একটি চক্র ডেকে নিয়ে যায়। পরে তাকে অপহরণ করে ৩০ লাখ টাকা চাওয়া হয়। তারা আমার ছেলেকে মারধর করে ভিডিও করে আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছে। আমরা খুব উৎকন্ঠায় দিন পার করছি।
রামশালা গ্রামের অপহৃত রুহুল আমিনের স্ত্রী আছিয়া বেগমও উৎকন্ঠা নিয়ে বলেন, সবশেষ ফোনে আমার স্বামী কাজ দেখতে যাওয়া কথা বলে নিখোঁজ হয়েছিল। পরে তার ফোন থেকে লিবিয়ায় থাকা এক বড় ভাই ও আমাকে একটি গাড়ির ছবি তুলে পাঠায়। এ ঘটনার একদিন পর আমার স্বামীর মুঠোফোন থেকে আমাকে কল দিয়ে নির্যাতনের অডিও রের্কড পাঠিয়ে ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। আমি এক লাখ টাকা পাঠিয়েও কোন লাভ হয়নি।
আক্কেলপুর থানার এসআই গণেশ চন্দ্র বলেন, লিবিয়ায় অপহরণের বিষয়ে আমাদের তেমন কিছু করার থাকে না। লিবিয়ায় অপহৃত গোলাম রব্বানীর স্ত্রীর কাছে স্বামীর নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে মুক্তিপনের দাবি করা হচ্ছে বলে তাঁর স্ত্রী জুথি আক্তার থানায় এসেছিলেন। প্রবাসীদের বিষয়ে কাজ করে প্রবাস বন্ধু নামের এক সংস্থা। আমরা তার স্ত্রীকে তাদের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছি।


প্রকাশিত: December 12, 2025 | সময়: 3:09 am | সুমন শেখ