বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
নুরুজ্জামান,বাঘা :
ধানের শীষ কৃষক ও গ্রামীণ জনগণের প্রতি সহানুভূতির বার্তা । এ জন্য আমার প্রিয় নেতা সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এটিকে দলীয় প্রতীক হিসাবে বেছে নিয়ে ছিলেন। আমি নিজেও একজন কৃষকের সন্তান। তাই প্রিয় নেতার রাখা গ্রামীন জনপদে উৎপাদিত এই ফসলই আমার প্রিয় প্রতীক। সম্প্রতি মাঠে ধান কাটা অবস্থায় এক সাক্ষাতকারে এ ভাবেই কথা গুলো বলছিলেন রাজশাহী জেলা বিএনপির আহবায়ক ও কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা আবু সাঈদ চাঁদ। তিনি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-৬ চারঘাট-বাঘা থেকে এবার বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন।
চারঘাট-বাঘার লোকজন জানান, বিগত সময়ে রাজশাহীর মাটি-বিএনপির ঘাটি হিসাবে পরিচিত ছিলো। তবে ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনে এই জেলার সবকটি আসন দখল করে নেয় আওয়ামীলীগ। তবে ২০০১ ও ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলের অষ্টম ও সপ্তম সংসদ নির্বাচনে রাজশাহীর পাঁচটি আসনের সব কটিতেই জয়যুক্ত হন বিএনপি ও চার দলীয় জোটের প্রার্থীরা।
এর আগে ১৯৯১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে রাজশাহীর পাঁচটি আসনের তিনটিতে বিএনপি, একটিতে আওয়ামীলীগ ও একটিতে জাতীয় পার্টির প্রার্থী জয় লাভ করেন। অভিযোগ রয়েছে ২০১৪ ও ২০২৪ সালের দশম ও দ্বাদশ নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী-সহ অন্যান্য দলগুলো নির্বাচন বর্জন করলেও আওয়ামীলীগ ২০১৮ সালের একাদশ নির্বাচনে একক ভাবে ভোট করে একতরফা জয় যুক্ত হন ।
এদিক থেকে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাঠের পরিস্থিতি একেবারেই উল্টো। কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না, প্রধান উপদেষ্টার এমন মন্তব্যের পর পাল্টে গেছে ভোটের হিসাব-নিকাশ এবং তৃণমূলের পরিস্থিতি। আসন্ন নির্বাচনে রাজশাহীর সব আসন পুনরুদ্ধার ও দখলের লড়াইয়ে নেমেছেন এবার বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। এদিক থেকে অন্য দল গুলোর কোন প্রচারনা এখন পর্যন্ত লক্ষ্য করা যাইনি। তবে মাঠ পর্যায়ে রাজশাহী-৬ চারঘাট-বাঘায় লক্ষ্যনীয় হয়ে উঠেছে ভোটের রাজনীতি। এখানে বিএনপি থেকে যাকে দলীয় মানোনয়ন দেয়া হয়েছে, তিনি প্রবীন রাজনৈতিক নেতা আবু সাঈদ চাঁদ। বর্তমানে রাজশাহী জেলা বিএনপির আহবায়ক এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সদস্য হিসাবে পরিচিত।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৯৬ সালের পর থেকে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নেতাকর্মীরা একই প্ল্যাটফরমে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সমঝোতায় সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু গত বছরের জুলাইয়ে শুরু হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী একযোগে সমর্থন ও অংশগ্রহণ করলেও ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটার পর ব্যাটে-বলে না মেলাই এই দুটি দল একে অপরের বিরুদ্ধে বিষাদ গাইছেন ভোটের মাঠে। ইতোমধ্যে দেশের বেশ কিছু এলাকাতে এই দুই দলের মধ্যে সংঘর্ষও ঘটেতে দেখা গেছে ।
সূত্রমতে, আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে রাজশাহীর সব আসনে বিজয়ের বিষয়টি বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের কাছে প্রেস্ট্রিজ ইস্যু হিসেবে দেখছেন এ অঞ্চলের মানুষ । সাধারণ ভোটারদের সমর্থন নিজেদের পক্ষে নিতে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা নানা কৌশলে কাজ শুরু করেছেন।
দলীয় একাধিক সুত্রে জানা গেছে, রাজশাহী-৬ আসন বাঘা ও চারঘাট উপজেলায় ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগ, ১৯৭৯ সালে বিএনপি, ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি, ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টি, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে বিএনপি, ২০০১ সালে বিএনপি এবং ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শাহরিয়ার আলম একটানা চারবার নির্বাচিত হন। তিনি পর-পর দুইবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে পালন করেন।তবে বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের জায়গা থেকে এখন দেশের বাইরে আত্নগোপনে রয়েছেন।
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে দ্বিতীয়বার বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ। বিগত আওয়ামী লীগ আমলে শেখ হাসিনাকে ‘কবরে পাঠানোর’ হুমকির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে ২৮টি মামলা করে আওয়ামী লীগ। এছাড়া আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছর এবং আগের আমলে তার বিরুদ্ধে মোট ১০২টি মামলা হয়। এসব মামলায় কারাগারে থাকাকালে তিনি মা ও স্ত্রীকে হারান। তবে বিএনপি তার ওপর আস্থা রেখেছেন। এ আসনে বিএনপির একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী থাকলেও আবু সাঈদ চাঁদকে মনোনয়ন দেওয়ার পর অপর মনোনয়ন প্রত্যাশীরা কেউ এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে বিরোধিতা করে মাঠে নামেননি।
বিএনপির নেতা আবু সাঈদ চাঁর এ প্রতিবেদককে জানান, ধানের শীষ আমার একক প্রতীক নয়। এ প্রতীক গ্রামীন জনগোষ্ঠি তথা সারা বাংলাদেশের মেহনতি কৃষক-শ্রমিক-জনতার প্রতীক । এই প্রতীক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতীক। এই প্রতীক দলীয় প্রধান বেগম খালেদা জিয়া ও তারুন্যের অহংকার তারেক রহমানের প্রতীক।
তিনি বলেন, যারা আমার প্রতিপক্ষ হয়ে দলীয় মনোনয়ন চেয়ে ছিলেন তারা আমাকে কথা দিয়েছেন, নিবাচনী তফশীল ঘোষনার পর থেকে মাঠে নেমে ধানের শীষের পক্ষ্যে ভোট করবেন এবং আমার সাথে থাকবেন। তিনি আরো বলেন, রাজনীতি করতে গিয়ে আমি আমার জীবন-যৌবন হারিয়েছি। দীর্ঘ সময় কারাবাসে কাটিয়েছি। এই দীর্ঘ সময়ে হারিয়েছি আমার স্ত্রী এবং গর্ভধারীনি মা’কে। আমি জেলখানায় থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে ছিলাম। এলাকায় আমার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। আমি বিশ্বাস করি এবারের নির্বাচনে আমি জয়যুক্ত হবো ইনশাল্লাহ।
এই আসনে জামায়াতের দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন রাজশাহী জেলার সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক নাজমুল হক। ইসলামী আন্দোলনের আমিনুল ইসলাম এবং খেলাফত মজলিসের তোফায়েল আহমদ প্রার্থী হয়েছেন। এখানে জাতীয় নাগরিক পার্টির রাজশাহী বিভাগীয় সংগঠক ইমরান ইমন নির্বাচন করবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে এখন পর্যন্ত মাঠে পর্যায়ে কর্মী সমাবেশ ও জনসভায় মুখ দেখা গেছে কেবল বিএনপি ও জামাতে ইসলামী দলের দুই প্রার্থীকে। ইতোমধ্যে জামাতের নেতারাও তাদের দলীয় প্রার্থীর জন্য মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছেন। তারা দুই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গনংযোগ থেকে শুরু করে কর্মীসভা এবং ইসলামী জালসা করে চলেছেন। সেই জালসায় সত্য ও ন্যায়ের পক্ষ্যে ইসলামী সংগঠনের প্রার্থীকে ভোট দেয়ার জন্য তারা আহবান জানাচ্ছেন ।
সানশাইন /শামি