, , ।
অহিদুল হক, বড়াইগ্রাম: ‘জীবনডা শুরুর আগেই সব শেষ হয়ে গেল। আমার শিশু বাচ্চাক এখন কে দেকপি আল্লাহ। আমার ছাওয়ালেক কেডা বুকে টাইনি আদর করবি। দাদা-দাদী আর বাপের আদরে বড় হচ্ছিল, তুমি এক সাথে তিনজনরেই কাইড়ে নিলে আল্লাহ। আমি একন ছাওয়াল লিয়ে কি কইরবো। আমারেক দেকারতো আর কেউ থাইকলি না।’ মাত্র ১৫ মাস বয়সের শিশু সন্তান হুমায়ন আহমেদ সাদকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন নাটোরের বড়াইগ্রামের কালিকাপুর গ্রামের সদ্য স্বামীহারা তরুণী গৃহবধু শিমলা খাতুন (১৮)। তিনি গত ৬ অক্টোবর দুপুরে বড়াইগ্রামের গুনাইহাটি এলাকায় বাস ও অটোরিক্সার সংঘর্ষে নিহত আতিকুর রহমান রানা’র স্ত্রী। শুধু শিমলাই নন, তার মত নিহত অপর চারজনের কারো ভাই, কারো স্ত্রী সন্তানের বুক ফাটা আর্তনাদে গোটা এলাকার পরিবেশ যেন ভারী হয়ে উঠেছে। বাস-অটোরিক্সার মুখোমুখি সংঘর্ষে একই পরিবারের তিনজনসহ পাঁচজনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় পুরো এলাকা জুড়ে চলছে শোকের মাতম। রোববার সরেজমিনে বড়াইগ্রামের কালিকাপুর ও লালপুরের ধলা গ্রামে গেলে এমন হৃদয় বিদারক দৃশ্যই চোখে পড়ে।
গত ৬ অক্টোবর দুপুর আড়াইটার দিকে নাটোর-পাবনা মহাসড়কের বড়াইগ্রামের গুনাইহাটী এলাকায় দুর্ঘটনায় বড়াইগ্রামের কালিকাপুর পূর্বপাড়া এলাকার মৃত অফেজ উদ্দিনের ছেলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত অফিস সহায়ক আনসার আলী (৬২), জেলার লালপুর উপজেলার ধলা গ্রামের ইদু প্রামাণিকের ছেলে অটো রিক্সা চালক মুনছের প্রামাণিক (৭০) ও একই গ্রামের নওফেল হোসেনের ছেলে নয়ন হোসেন (২৬) ঘটনাস্থলেই মারা যান। গুরুতর আহতদের মধ্যে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আনসার আলীর স্ত্রী রাজিয়া বেগম (৫৫) পরদিন এবং সর্বশেষ বড় ছেলে আতিকুর রহমান রানা (৩৮) শনিবার সন্ধ্যায় মারা যান। এছাড়া তার ছোট ছেলে আশিকুর রহমান রাসেল (২৩) ও চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
দুর্ঘটনার সংবাদ পাওয়ার পর থেকেই ওই গ্রাম ছাড়াও আশেপাশের গ্রামের লোকজন ছুটে আসতে থাকেন নিহতদের বাড়িতে। এ সময় নিহতদের স্বজনদের আহাজারীতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন ছুটে আসা মানুষেরাও। আতিকুর রহমান রানা’র মামা শ্বশুরের বাড়িতে দাওয়াত খেতে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হবার কিছুক্ষণ পরেই এমন আকস্মিক লোমহর্ষক সংবাদ যেন পুরো পরিবারের উপরে আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মত আঘাত করেছে। নিহতের স্ত্রী-সন্তান ও স্বজনদের বুক ফাটা কান্নায় প্রবোধ দেয়ার মত ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না কেউই। কে কাকে শান্তনা দেবে-সবাই কাঁদছে। শান্তনার সব বাণী যেন বিলীন হয়ে যাচ্ছে এতিম সন্তানদের অশ্রুতে। ধলা গ্রামের নিহত বৃদ্ধ অটো চালক মুনছের ও নয়ন হোসেনের বাড়িতে গিয়েও একই দৃশ্য চোখে পড়ে।
দুর্ঘনায় নিহত আনসার আলীর বড় ভাই শামসুল হক কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, ‘আমার ভাইয়ের সোনার সংসার ছিল। সুখ আর আনন্দের কোন কমতি ছিল না। কিন্তু একটি দুর্ঘটনায় এক মূহুর্তে এমন সোনার সংসার বিরান ভূমি হয়ে গেল। একই পরিবারের তিনজন মানুষের মৃত্যুর এমন শোক কি করে সহ্য করবো আমরা।’
আতিকুর রহমান রানা’র স্ত্রী শিমলা খাতুন জানান, তার স্বামী একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৫ লাখ টাকা জামানত দিয়ে চাকরী নিলেও কিছুদিন আগে সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। দেবরও বেকার। শশুরের পেনশনের টাকাতেই সংসার চলতো। কিন্তু শশুর-শাশুড়ি এক সাথে মারা যাওয়ায় পেনশন পাওয়াও হবে না। স্বামীও মরে গেছে। এখন তাদের পথে বসা ছাড়া আর কোন পথ খোলা রইলো না।
বনপাড়া পৌরসভার সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর জামালউদ্দিন জানান, আমাদের এলাকায় এমন নির্মম মৃত্যু এর আগে কখনও দেখিনি। এক সঙ্গে একই পরিবারের তিনজনসহ মোট পাঁচজন মানুষ এক সাথে মারা গেলো। এমন শোকে গোটা এলাকা জুড়েই যেন একটা শোকের স্তব্ধতা নেমে এসেছে।’