সর্বশেষ সংবাদ :

সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ হয়েও মইনুল ছিলেন পদধারী আ’লীগ, করেছেন কোটি টাকার দুর্নীতি

সাইফুল ইসলাম, গোদাগাড়ী: যোগ্যতার ঘাটতি থাকলেও দলীয় প্রভাব আর টাকার জোরে রাজশাহীর গোদাগাড়ী সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ হয়েছেন মইনুল ইসলাম।
শিক্ষাজীবনে দু’বার ফেল করে ১৯৯০ সালে তৃতীয় বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছিলেন তিনি। কলেজ সরকারিকরণ হলেও তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতির পদ ছাড়েননি। দলীয় প্রভাবে লুটপাট ও দুর্নীতি করে কোটি টাকার মালিক হয়েছেন মইনুল ইসলাম। গেল বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর তিনি তিন মাস আত্মগোপনে থাকলেও পরে কলেজে ফিরে এসেছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি কলেজ থাকাকালীনই এলাকার তৎকালীন এমপি ওমর ফারুক চৌধুরীর সহায়তায় বিধিবহির্ভূত ভাবে অধ্যক্ষ হন মইনুল ইসলাম। ছয়জন সহকারী অধ্যাপককে উপেক্ষা করে তাঁকে অধ্যক্ষ বানানো হয়। অভিযোগ আছে, এজন্য এমপিকে তিনি ৩০ লাখ টাকার ব্যাগ ধরিয়ে দেন মইনুল। এরপর থেকেই শুরু হয় নানা অনিয়ম-দুর্নীতি।
অভিযোগ অনুযায়ী, কলেজ জাতীয়করণের নামে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে আদায় করেন প্রায় ৫৫ লাখ টাকা, যা সাবেক এমপির সঙ্গে ভাগাভাগি হয়। অভ্যন্তরীণ অনুদান, টিউশন ফি, প্রশংসাপত্র, ফি, আইসিটি সেবা, আসবাবপত্র ও ক্রীড়াসামগ্রী কেনার নামে লোপাট করেন প্রায় ৪৫ লাখ টাকা।
এছাড়া ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয় আরও প্রায় ৮ লাখ টাকা। ৭ লাখ ৩৯ হাজার ৩৮০ টাকা ফেরত না নিয়ে তিনি দায়মুক্তি দেন প্রাক্তন অধ্যক্ষকে। সরকারি বিধি উপেক্ষা করে মইনুল ইসলাম বেতন গ্রেড-৫ এর পরিবর্তে গ্রেড-৪ গ্রহন করেন। ফলে প্রতি মাসে অতিরিক্ত ১২ হাজার টাকা পাচ্ছেন।
প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের ভাষ্য, রাজনীতি ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে মইনুল ইসলাম কলেজকে বানিয়ে ছিলেন আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়। উপজেলা যুবলীগ সভাপতি জাহাঙ্গীর আলমের নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি সরাসরি অংশ নেন। এমনকি গেল বছরের জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের সময় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের তালিকা করে রেখেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর তিনি ৩৪ দিন আত্মগোপনে থেকে কলেজে আসেননি। পরে বিভিন্ন ব্যক্তিকে ম্যানেজ করে ফের দায়িত্ব নেন। এখন আরও বেপরোয়া।
তার বিরুদ্ধে করা লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়, দু’বছর আগে রাজশাহী শহরের ১৩ নম্বর ওয়ার্ড তেরখাদিয়া হাউজিং এলাকায় প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন তিনি। দীর্ঘ আট বছর ধরে প্রতিষ্ঠানে কোনো অডিট হয়নি। নিয়ম মেনে স্টাফ কাউন্সিল, একাডেমিক কাউন্সিল, ক্রয় কমিটি কিংবা অডিট কমিটি গঠন না করে সবই করেছেন নিজের খেয়ালখুশিমতো। শিক্ষক ও কর্মচারীদের সঙ্গে অসাদাচরণ করেছেন নিয়মিত। অনেক সময় ভয়ভীতি ও অশালীন ভাষাও ব্যবহার করেছেন তিনি। আওয়ামী লীগের পতনের পর শিক্ষকেরা ভেবেছিলেন তাঁকে অপসারণ করা হবে, কিন্তু তিনি বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ দুদকে পৌঁছালে প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে শুরু হয় তদন্ত। গত ১ জানুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে কমিশন তদন্ত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নিতে বলে। এরপর মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ৩১ জুলাই তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক শওকত আলম মীরের নেতৃত্বে এ কমিটি সরেজমিন তদন্তও করেছে। তবে এখনও প্রতিবেদন জমা হয়নি।
তদন্ত কমিটির প্রধান অধ্যাপক শওকত আলম মীর বলেন, তারা ইতোমধ্যে কলেজে গিয়ে তদন্ত করে এসেছেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। তদন্তে কী পাওয়া গেছে সে বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি তিনি। অভিযুক্ত অধ্যক্ষ ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মইনুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন দিলেও রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পঠিয়েও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


প্রকাশিত: অক্টোবর ৪, ২০২৫ | সময়: ৪:০১ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ