বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
স্টাফ রিপোর্টার, জয়পুরহাট: সারা দেশের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম আলু উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে পরিচিত জয়পুরহাটে সরকার নির্ধারিত দামেও বিক্রি হচ্ছে না আলু। গত বছর সংরক্ষণ করায় অধিক লাভের ফলে যে আলুতে জয়পুরহাটের শত শত কৃষক ও মৌসুমী ব্যবসায়ীর ভাগ্য বদল হয়েছিল সেই আলুই এ বছর গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কৃষকের লোকসান ঠেকাতে হিমাগার গেটে আলুর দাম বেঁধে দেওয়ার পরেও কোন সুফল মিলছে না। হিমাগারের গেটে কেজি প্রতি নির্ধারিত ২২ টাকা দরে আলু বিক্রি হচ্ছে না। ফলে খুচরা বাজারেও এর তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা কেজি। আর হিমাগার থেকে এখনো কেজি প্রতি আলু বেচাকেনা হচ্ছে ১৫ থেকে ১৬ টাকা দরে। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
গত ২৭ আগস্ট কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে বিজ্ঞপ্তিতে হিমাগার থেকে ২২ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করার নির্দেশনা জারি করা হয়। একই দামে সরকারও ৫০ হাজার টন আলু কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। যা হিমাগারে সংরক্ষণ এবং আগামী অক্টোবর-নভেম্বর মাসে বাজারে বিক্রি করা হবে। এদিকে আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে হিমাগার থেকে আলু উত্তোলন না করলে সেই আলু নিয়ে বিপাকে পড়বেন হিমাগার কর্তৃপক্ষ, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।
জানা যায়, কৃষকের লোকসান ঠেকানো ও বীজের দাম বাড়ানোর জন্যই সরকার হিমাগার গেটে কেজি প্রতি আলু ২২ টাকা নির্ধারণ করেছে। কেননা আলুর দাম বেঁধে না দিলে বীজ আলুর দামও কম হবে। এতে কৃষক সহ মৌসুমী ব্যবসায়ীদের অনেক টাকা লোকসান হবে। তাদের লোকসানের হাত থেকে বাঁচাতে এ দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। অথচ চলতি বছর ১ কেজি আলু উৎপাদনে কৃষকের ১৪ থেকে ১৬ টাকা খরচ পড়েছে। আর হিমাগার পর্যন্ত আলু নেওয়ার জন্য পরিবহন ও শ্রমিকের পারিশ্রমিকের সাথে হিমাগার ভাড়া যোগ করলে তা দাঁড়াবে অন্তত ২৩ টাকা থেকে ২৪ টাকায়।
এ অবস্থায় দেশে চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি আলু উৎপাদন করা হয়েছে। হিমাগারের বাইরে এখনো যে পরিমাণ আলু বাজারে রয়েছে তা খেয়ে শেষ করতে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত লাগতে পারে বলে জানা গেছে। আর আগামী মার্চে এসে পড়বে আবার নতুন আলু। কাজেই আলুতে কৃষকের লোকসান পোষাতে হলে চলতি বছর আলু বিদেশে রপ্তানির বিকল্প নেই।
সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা যায়, জয়পুরহাটের পাঁচ উপজেলায় ২০২৩-২৪ মৌসুমে ৩৮ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছিল। আবার ২০২৪-২৫ মৌসুমে হয়েছে ৪৩ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমিতে। যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৫ হাজার হেক্টর বেশি। এতে আলু উৎপাদন হয়েছে ১০ লাখ ৬১ হাজার ৭৪ মেট্রিক টন। এছাড়া এ জেলায় মোট ২১টি হিমাগার রয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র কালাই উপজেলায় ১৩টি হিমাগার অবস্থিত। জেলার পাঁচ উপজেলায় হিমাগারে রাখা আলু নিয়ে চরম বিপাকে কৃষক-ব্যবসায়ীরা।
জয়পুরহাট সদর উপজেলার ধারকী সোটাহার গ্রামের কৃষক খালেক হোসেন বলেন, প্রায় ৬০ কেজির এক বস্তা আলু উৎপাদন খরচ ও ভাড়া সহ খরচ পরেছে প্রায় দেড় হাজার টাকা। অথচ বর্তমানে সেই আলু বিক্রি হচ্ছে ৭৮০ থেকে ৭৯০ টাকায়। ফলে প্রতি বস্তায় লোকসান গুণতে হচ্ছে কমপক্ষে ৬৮০ থেকে ৭০০ টাকা। ক্ষেতলাল উপজেলার তিলাবুদুল গ্রামের মামুন হোসেন বলেন, আমরা যারা অন্যের জমি বর্গা নিয়ে আলুচাষ করেছিলাম, তাদের এ বছর প্রতি বিঘাতে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুণতে হবে। এ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছি আমরা।
কালাই উপজেলার আর বি স্পেসালাইজড কোল্ড স্টোরেজের আলুর পাইকার আজিজার রহমান বলেন, আমি প্রতিদিন আলু কিনে ঢাকায় নিয়ে বিক্রি করি। কিন্তু সরকার দাম নির্ধারণ করার পরও বাস্তবে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। খোলাবাজারে প্রচুর আলু রয়েছে, তাই পাইকাররা বেশি দামে আলু কিনতে আগ্রহী নন। যদি আলু রপ্তানির সুযোগ থাকত, তাহলে খোলা বাজারে চাপ কমত এবং কৃষকরাও লাভবান হতেন।
কালাই পৌরসভা এলাকায় অবস্থিত এম ইসরাত হিমাগারের ব্যবস্থাপক রায়হান আলম বলেন, আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে আমাদের হিমাগারগুলো থেকে আলু উত্তোলনের যে সিদ্ধান্ত দেওয়া আছে সেই অনুযায়ী এখন পর্যন্ত আলু উত্তোলন হচ্ছে না। কালাইয়ের পুনট কোল্ড স্টোরেজের হিসাব রক্ষক এনামুল হক বলেন, আলুর বাজার এই মৌসুমে তেমন বাড়তে পারে এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আর সরকার যে হিমাগার থেকে ২২ টাকা কেজি দরে আলু কেনার নির্দেশনা দিয়েছে তা এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি।
কয়েকজন আলু ব্যবসায়ী জানালেন, গত বছর আলু চাষী ও সংরক্ষণকারী কৃষক, মৌসুমী ব্যবসায়ীরা বীজ আলু এবং খাবার আলু সংরক্ষণ করে অধিক বেশি লাভবান হয়েছিল। গতবছর আলু ক্রয় থেকে শুরু করে পরিবহন, পারিশ্রমিক, সংরক্ষণ ভাড়া সহ কৃষক-ব্যবসায়ীদের মোট খরচের দ্বিগুন এবং কেউ কেউ তিনগুন বেশি দামে বিক্রয় করতে পেরেছিলেন। ফলে চলতি বছর ওইসব কৃষক-ব্যবসায়ীরা আরও অধিক পরিমানে আলু চাষ ও সংরক্ষণ করেছেন। আর চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি পরিমানে আলু চাষ ও সংরক্ষণ হওয়ায় এ বছর দাম এত কম হচ্ছে। এর ফলে ওইসব কৃষক-ব্যবসায়ীরা পড়তে যাচ্ছেন মোটা অংকের লোকসানের মুখে।
জয়পুরহাট জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, হিমাগার গেট থেকে সরকারের বেঁধে দেওয়া ২২ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রির নির্দেশনা আমরা দিয়েছি। কিন্তু হিমাগার পর্যায়ে এখনো সেই দামে আলু বিক্রি হচ্ছে না। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে। নির্দেশনা পেলেই বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।