, , ।
সানশাইন ডেস্ক: ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে (ডাকসু) অভাবনীয় জয় পেয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর এই সহযোগী সংগঠন অতীতে কখনও ডাকসু নির্বাচনে প্রকাশ্যে প্যানেল দিতে পারেনি, কেন্দ্রীয় সংসদের কোনো পদে কখনো জয় পায়নি, সেখানে এবার ভিপি ও জিএস সহ ডাকসুর ১২টি সম্পাদকীয় পদের মধ্যে নয়টি জিতে নিয়েছে।
ছয় বছর পর মঙ্গলবার ডাকসু নির্বাচনে ভোট হয়েছে উৎসবের আমেজে, শান্তিপূর্ণভাবে; যেখানে প্রায় ৪০ হাজার ভোটারের মধ্যে ৭০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী ভোট দিয়েছেন। প্রায় সবকটি হলের ভোটাররা কেন্দ্রীয় ভিপি ও জিএস পদে শিবিরের দুই প্রার্থীকে বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে মেয়েদের হলগুলোতে শিবিরের প্রার্থীরা পেয়েছেন নজিরবিহীন সমর্থন।
ভোটের লড়াইয়ে শিবিরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রার্থীরা। তবে কোনো পদেই তারা জয়ের মুখ দেখেননি। সম্পাদকীয় যে তিনটি পদ শিবিরের হাতছাড়া হয়েছে সেগুলোতে বিজয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। ডাকসুর ভিপি পদে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সাবেক সভাপতি আবু সাদিক কায়েম। নুরুল হক নুরের উত্তরসূরী হিসেবে দেশের বৃহত্তম এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নেতৃত্ব দেবেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই শিক্ষার্থী।
ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের প্রার্থী সাদিক কায়েম পেয়েছেন ১৪,০৪২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের আবিদুল ইসলাম খান ৫,৭০৮ ভোট পেয়েছেন। জিএস পদে ছাত্রশিবিরের এসএম ফরহাদ ১০,৭৯৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের শেখ তানভীর বারী হামিম পেয়েছেন ৫,২৮৩ ভোট। এজিএস পদে জয়ী হয়েছেন শিবিরের মুহা. মহিউদ্দীন খান। তিনি পেয়েছেন ১১,৭৭২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের তানভীর আল হাদী মায়েদ পেয়েছেন ৫,০৬৪ ভোট।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে সকাল থেকে বিপুল সংখ্যক আবাসিক-অনাবাসিক শিক্ষার্থীর স্বতঃস্ফুর্ত উপস্থিতি দেখা গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে সকাল থেকে বিপুল সংখ্যক আবাসিক-অনাবাসিক শিক্ষার্থীর স্বতঃস্ফুর্ত উপস্থিতি দেখা গেছে। মঙ্গলবার রাত পৌণে ১টার দিকে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ফল ঘোষণা শুরুর পর থেকেই শিবির সমর্থিত প্যানেলের বড় জয়ের আভাস মেলে।
নানা ধরনের গুঞ্জনের মধ্যে ক্যাম্পাসের প্রবেশ পথগুলোতে জড়ো হন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী। উত্তেজনার আভাসে ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা কড়াকড়ি বাড়ানো হয়। রাত ৩টার দিকেই ক্যাম্পাসের কয়েক জায়গায় ছাত্রশিবিরের কর্মীদের বিজয় মিছিল শুরু হয়ে যায়। অন্যদিকে কারচুপির অভিযোগ তুলে ভোটের ফল প্রত্যাখ্যান করেন ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান এবং স্বতন্ত্র জোটের ভিপি প্রার্থী উমামা ফাতেমা।
১৮ হলের ফল জড়ো করে সমন্বিত ফল প্রস্তুত করতে রাত প্রায় পেরিয়ে যায়। বুধবার সকাল ৮টার পর নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা করেন ডাকসু নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক জসীম উদ্দিন। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের অনুপস্থিতিতে এবারই প্রত্যক্ষভাবে প্রথম সরকারি দল সমর্থিত ছাত্র সংগঠন ছাড়া ডাকসু নির্বাচন দেখল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
এ নির্বাচনে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির সহ রাজনৈতিক সংগঠন ও স্বতন্ত্র হিসেবে অন্তত ১০ প্যানেল অংশ নিলেও ছাত্রশিবির একচেটিয়া জয় পেয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকায় থাকা শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) নির্বাচনে খুব একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে পারেনি। ছাত্রশিবির তাদের ৪৮ বছরের ইতিহাসে এবারের মত এতটা প্রকাশ্যে, অবাধে, চাঙ্গাভাব নিয়ে নির্বাচনকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ আর কখনো পায়নি।
নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের প্রকাশ্যে রাজনীতি বন্ধ ছিল। ওই সময় শিবিরের সঙ্গে জাতীয় পার্টির ছাত্র সংগঠন ‘জাতীয় ছাত্র সমাজের’ রাজনীতি বন্ধের বিষয়ে জোটবদ্ধ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সংগঠন।
ছাত্রশিবিরের কর্মীরা এবার নিজেদের সাংগঠনিক পরিচয় নিয়েই অবাধে ডাকসু নির্বাচনে নিজেদের হাজির করেছেন; শেষে তারাই হাসলেন জয়ের হাসি। সিনেট ভবনে ডাকসু নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক জসীম উদ্দিন যখন বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করছিলেন, তখন সেখানে ভিপিপ্রার্থী সাদিক কায়েম সহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন রাত জাগার ক্লান্তি উপেক্ষা করে বিজয় উৎসব করতে থাকা কর্মী-সমর্থকরা। ভিপি পদে বিজয়ীর নাম ঘোষণার আবার স্লোগানে মেতে ওঠেন ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা।
ফল ঘোষণার পর সিনেট ভবনের সামনে তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে এসে ভিপি পদে নির্বাচিত সাদিক কায়েম বলেন, ‘জয় অথবা পরাজয়ের কিছু নেই। ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে জুলাইয়ের প্রজন্ম বিজয়ী হয়েছে। ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিজয়ী হয়েছে। এবং এই নির্বাচনের মাধ্যমে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা, শহীদদের আকাঙ্খা বিজয়ী হয়েছে।’
শিক্ষার্থীদের তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, ‘ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আমাদের উপর নেতৃত্বে আমানত রেখেছে আমরা দৃঢ়কণ্ঠে বলতে চাই, সাদিক কায়েম, এস এম ফরহাদ, মহিউদ্দিন খান সহ ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের আমাদের প্যানেলের উপর যে আমানত রেখেছে আমরা তার হক আদায় করব।’ প্যানেল ঘোষণার সময় সংগঠনের বাইরে থেকে একজন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর, একজন আহত জুলাই যোদ্ধা এবং অন্য সংগঠনের একজন নারী কর্মীকে প্রার্থী করে ‘অন্তর্ভুক্তির’ চমক দেখিয়েছিল শিবির। ভোটে জয়ের পরও সেই সুর পাওয়া গেল সাদিক কায়েমের কথায়।
তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ধর্মের যে পথের যে মতে যে আদর্শের লোক না হোক না কেন আমরা সবাই একসাথে কাজ করব। আমরা এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটা মাল্টিকালচার হিসাবে আমরা নির্মাণ করব এবং আমাদের প্রতিজ্ঞা, আমাদের এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক ইনস্টিটিউট হিসাবে আমরা পরিণত করব।’
এদিকে রাত আড়াইটার দিকে ফল ঘোষণার প্রাথমিক পর্যায়েই তা প্রত্যাখ্যান করেন ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদ। নিজের ফেইসবুক পেইজে এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘পরিকল্পিত কারচুপির এই ফলাফল দুপুরের পরপরই অনুমান করেছি। নিজেদের মতো করে সংখ্যা বসিয়ে নিন। এই পরিকল্পিত প্রহসন প্রত্যাখ্যান করলাম।’ তবে তার ‘রানিং মেট’ জিএস প্রার্থী শেখ তানভীর বারী হামিম শিক্ষার্থীদের রায়কে সম্মান জানানোর কথা বলেন।
রাত সোয়া ২টার দিকে নিজের ফেইসবুক পেইজে এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যদি মনে করেন- এটিই তাদের রায়, তবে এই রায়কে আমি সম্মান জানাই। আমি শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষমাণ।’ গভীর রাতে ফল বর্জনের ঘোষণা দেন ভিপি পদের স্বতন্ত্র প্রার্থী উমামা ফাতেমাও। পরে ভোরের দিকে এক ফেইসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘অভিনব পন্থায় নির্বাচন কারচুপি হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের কালো রাত হয়ে থাকবে।’
জুলাই গণঅভ্যুথানে সক্রিয় ভূমিকা রাখা উমামা বলেন, ‘কারচুপির নির্বাচনের জন্য ১৪০০ মানুষ মরছে! একি ইতিহাস, একি ব্যবস্থা। মাঝে দিয়ে এতগুলা পরিবার নিঃস্ব হল। ‘নিজেদের হীনস্বার্থের জন্য ইসলামি ছাত্রশিবির কি পরিমাণ বেঈমানি করেছে জাতির সাথে তা ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে।’